মানুষের মুখের অভিব্যক্তি দেখেই তার মনের অবস্থা বুঝতে পারে কুকুর। নতুন এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কুকুরের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে এমন প্রমাণ পেয়েছেন। তাদের মতে, মানুষ খুশি, দুঃখিত, রাগান্বিত বা ভীত—কুকুর এসব আবেগের পার্থক্য বুঝতে পারে।
‘আইসায়েন্স’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক কুকুরের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে দেখেছেন, মানুষের মুখের ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তির সময় তাদের মস্তিষ্কে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে।
গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক লরা কুয়া বলেন, মানুষের সঙ্গে অন্য প্রাণীর তুলনা করলে কিছু সামাজিক দক্ষতার উৎস একই পূর্বপুরুষের কাছ থেকে এসেছে বলে ধারণা করা যায়। কিন্তু কুকুরের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। মানুষের সঙ্গে তাদের বিবর্তনের পথ আলাদা হলেও গৃহপালিত হওয়ার প্রক্রিয়ায় কুকুর এমন কিছু সামাজিক দক্ষতা অর্জন করেছে, যা তাদের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা করতে সাহায্য করে।
প্রথম ধাপে আটটি কুকুরের মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হয়। এর মধ্যে ছিল ছয়টি বর্ডার কলি, একটি ল্যাব্রাডর ও একটি গোল্ডেন রিট্রিভার। তাদের অপরিচিত মানুষের খুশি ও স্বাভাবিক মুখের ছবি দেখানো হয়।
গবেষকেরা দেখতে পান, খুশি মুখের ছবি দেখানোর সময় কুকুরের মস্তিষ্কের টেম্পোরাল কর্টেক্স ও কডেট নিউক্লিয়াসে বেশি সক্রিয়তা দেখা যায়। মস্তিষ্কের এসব অংশ উচ্চতর চিন্তা ও পুরস্কার বা আনন্দের অনুভূতি প্রক্রিয়াজাত করার সঙ্গে যুক্ত।
লরা কুয়া বলেন, এর অর্থ হতে পারে অপরিচিত মানুষের হাসিমুখও কুকুরের কাছে আবেগগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী ধাপে ১২টি কুকুরকে খুশি, রাগান্বিত, ভীত ও দুঃখী মানুষের ছবি দেখানো হয়। এরপর মেশিন লার্নিংয়ের মাধ্যমে তাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, খুশি মুখের ক্ষেত্রে কুকুরের মস্তিষ্ক যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, রাগ, ভয় বা দুঃখের মুখের ক্ষেত্রে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে পুরো মস্তিষ্ক বিশ্লেষণে নেতিবাচক আবেগ প্রকাশ করা মুখগুলোর জন্য আলাদা ধরনের কার্যক্রমের ধরন শনাক্ত করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক রাউল হার্নান্দেজ-পেরেজ বলেন, মানুষের মতো কুকুরও মুখের ছোট ছোট পরিবর্তন খুব ভালোভাবে বুঝতে পারে। এ কারণেই মানুষের সামাজিক ও আবেগগত আচরণ বোঝার ক্ষেত্রে কুকুরকে নিয়ে গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন হোয়াটসঅ্যাপে প্রেমিকার মুছে ফেলা মেসেজ দেখবেন যেভাবে
-6a8579f7a89b3.jpg)
গবেষকেরা জানান, শুধু মুখের অভিব্যক্তি দেখেই কুকুর মানুষের আবেগ বোঝে—বিষয়টি এত সরল নয়। মানুষের শরীরের ভঙ্গি, কণ্ঠস্বর ও গন্ধও কুকুরের আচরণ বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে গবেষণাটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। গবেষণায় কুকুরের সংখ্যা ছিল কম এবং বেশির ভাগই ছিল বর্ডার কলি জাতের। এই জাতটি বুদ্ধিমান এবং মানুষের সামাজিক সংকেত অনুসরণে দক্ষ হিসেবে পরিচিত। ফলে অন্য জাতের কুকুর একইভাবে মানুষের মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে পারে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকেরা জানান, গবেষণায় অংশ নেওয়া কুকুরগুলো ছিল ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা। মালিকবিহীন বেড়ে উঠা কুকুর মানুষের আচরণ ও আবেগের সংকেত সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রক্রিয়া করতে পারে।
এ গবেষণায় অংশ নেওয়া কুকুরগুলোকে আগে থেকেই বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এমআরআই মেশিনের ভেতরে স্থির হয়ে থাকার প্রশিক্ষণ ধীরে ধীরে দেওয়া হয়। গবেষকেরা জানান, কুকুরগুলো স্বেচ্ছায় গবেষণায় অংশ নিয়েছে এবং চাইলে যেকোনো সময় সেখান থেকে চলে যেতে পারত।
ভবিষ্যতে কুকুর কীভাবে মানুষের আবেগের সংকেত ব্যবহার করে আমাদের বোঝার চেষ্টা করে, তা আরও গভীরভাবে জানতে চান গবেষকেরা। তাদের মতে, কুকুর মানুষের আবেগের প্রতি কতটা মনোযোগী, তা বোঝার পাশাপাশি মানুষও কুকুরের নিজেদের আবেগ প্রকাশের ধরন আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করতে পারে। কারণ আবেগ এমন এক শক্তিশালী যোগাযোগের মাধ্যম, যা ভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকেও একে অপরের কাছাকাছি আনতে পারে।
সূত্র: সিএনএন