যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্পে আওয়ামী লীগ আমলে শত শত কোটি টাকা দুর্নীতির অভিযোগ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অদৃশ্য জাদুর ছোঁয়ায় এখনও ২১ কোটি টাকার এআই প্রশিক্ষণ কার্যাদেশ পেয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড।
অভিযোগ রয়েছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের যুব ও ক্রীড়ামন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ক্যাশিয়ার এবং শরীয়তপুরের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের অনুসারীও ছিলেন ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের এমডি মাসুদ আলম। আওয়ামী লীগ সমর্থিত সাবেক ও বর্তমান আমলা সিন্ডিকেটের তদবিরে মাসুদ আলম এখনও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন।
জানা যায়, গত ১৯ জুলাই যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্পে প্যাকেজ ১ ও ৩ (ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের) কাজ পেয়েছে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেড। প্রকল্পের লিড এজেন্সি হিসেবেও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রকল্পে নানা দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কমিশন বাণিজ্য এবং আওয়ামী লীগপন্থী সাবেক ও বর্তমান আমলা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি এসব কাজ বাগিয়ে নিচ্ছেন। ভুয়া প্রশিক্ষণার্থী সাজিয়ে টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তৎকালীন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং লিমিটেডকে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম দেওয়ার সুপারিশ করলেও শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার কারণে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তিনিই কাজটি পান বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের বদৌলতে শত শত কোটি টাকার মালিক হলেও শুরু থেকেই তার প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
মাসুদ আলমের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা
মাসুদ আলমের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ঘনিষ্ঠ ক্যাশিয়ার ছিলেন মাসুদ। সেসময়ই মন্ত্রণালয়ের বেশ কিছু প্রকল্প সরাসরি পেয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর ডানহাত বলে পরিচিতি পেয়েছিল মাসুদ আলম।
বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাক্ষাৎকারে মাসুদ বলেছিলেন, ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসলে আমরা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হই। আমার বাবা আজাহার উদ্দিন আওয়ামী লীগ করতেন বলে তখন তিনি পালিয়ে যান। তখন আমি সংসারের হাল ধরি। ফলে প্রাইমারি স্কুলের পড়াশোনাও শেষ করতে পারিনি।
মাসুদ আলম ২০২৩ সালে জাতীয় যুব কাউন্সিলের সভাপতি নির্বাচিত হন মাসুদ আলম। সেই সময়কার তার প্যানেলের নির্বাচনী পোস্টার ও ব্যানারের ছবি এসেছে এই প্রতিবেদকের কাছে। সেখানে দেখা যায়, শেখ হাসিনা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের ছবি রয়েছে ওই নির্বাচনী ব্যানার পোস্টারে। সেটি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল ছিল।
এছাড়াও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হওয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন মাসুদ আলম। সেই নির্বাচনী পোস্টারেও ছিল শরীয়তপুরের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের ছবি। নির্বাচনের সময় করা বিভিন্ন সংবাদে মাসুদ আলম নিজের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে লিখেছেন, ‘তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত একজন সৈনিক। তিনি কখনও পদ পদবীর পিছনে ছুটেননি। পিছন থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছেন। জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রীর নামে ‘শেখ হাসিনাতেই আস্থা’ নামক সোশ্যাল মিডিয়াতে পেজ (এমএসপিএম) সামরিক সচিব এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পরিচালনা করে থাকেন।
এসব কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি বেসরকারিভাবে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে ‘স্মার্ট বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড’ ২০২৩ পদক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে গ্রহণ করেছেন। সারা বাংলাদেশে প্রায় ৩০ হাজারের ও অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখায় এবং স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখায় জাতীয় পর্যায়ে ‘শেখ হাসিনা ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড’ ২০২২ পদক লাভ করেছেন, যা প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে গ্রহণ করেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অসাধারণ অবদানের জন্য ‘জাতীয় যুব পুরস্কার ২০২৩’ লাভ করেছেন। যুব সমাজে উদ্যোক্তা তৈরিতে অবদান রাখায় ২০২২ সালে ঢাকা বিভাগে ‘শ্রেষ্ঠ আত্মকর্মী’ হিসেবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পদক পেয়েছেন। তার বাবা আজাহার উদ্দিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। তার ছোট ভাই রাসেল আলম বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন একনিষ্ঠ কর্মী। মাসুদ আলম আসন্ন গোসাইরহাট উপজেলা পরিষদের নির্বাচনে স্থানীয় সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের আশীর্বাদ নিয়ে জনগণকে সাথে নিয়ে ভোটের মাঠে লড়াই করতে চান।’
বস্তাভর্তি টাকাসহ আটক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মাসুদ আলম ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট উত্তরার হাউসবিল্ডিং এলাকায় সিগন্যালে একটি প্রাইভেট কার (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৫-১৫৮১) আটক করে ছাত্র-জনতা। গাড়িতে পাওয়া যায় এক বস্তা নগদ টাকা (প্রায় দেড় কোটি টাকা)। সেসময় শিক্ষার্থীরা জানিয়েছিল, গাজীপুরের সাবেক মন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলের লোকজনকে দেওয়ার জন্য টাকাগুলো নেওয়া হচ্ছিল, এমন অভিযোগ পেয়ে তারা গাড়িটি আটক করেছে। পরবর্তীতে জানা যায়, গাড়িটিতে ছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্টিকার। সেদিন গাড়িতে ছিলেন মাসুদ আলম নিজেই। নিজেকে ‘প্রমিজ গ্রুপ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিচয় দেন। পরে তাকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। তবে সেসময় তার দাবি ছিল, “ওটা অফিসের স্টাফদের বেতনের টাকা। ১৬ জেলায় ৬ লাখ করে দিতে হয়। অফিস ভাড়াই ৩২ লাখ টাকা।”
দুদকের জালে মাসুদ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনার পলায়নের পর বস্তাভর্তি টাকাসহ আটক হলে ধীরে ধীরে দুদকের জালে আসেন মাসুদ আলম। দুদক সূত্র জানায়, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের দায়ে ই-লার্নিংয়ের হিসাবসহ তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলো জব্দ হয়। মাসুদ এবং তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকার দেশ ছেড়ে বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও আসে নিষেধাজ্ঞা। তবে পরবর্তীতে নানা দেনদরবারের মাধ্যমে কোম্পানির শত কোটি টাকার অ্যাকাউন্ট জব্দ তালিকা থেকে সরাতে পারলেও তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট এখনও জব্দ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ই-লার্নিং অ্যান্ড আর্নিংয়ের এমডি মাসুদ আলম বলেন, এসব অভিযোগের কোনো সত্যতা নেই। আমি বড় ব্যবসায়ী নই, তবুও আমার প্রতিপক্ষ কেন এসব তথ্য ছড়াচ্ছে আমি বুঝতে পারছি না। ব্যবসায়িক কোম্পানির অ্যাকাউন্ট দুদক আটকে রাখতে পারে না, সেজন্য জব্দ থেকে মুক্ত হয়েছে; তবে আমার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট এখনও জব্দ রয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো: আমিনুল হক বলেন, এ বিষয়গুলো আমার জানা ছিল না। নোট করা হলো। যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।