ইসলামের ইতিহাসে কিছু ঘটনা আছে, যা কেবল ইতিহাস হয়ে থাকে না; বরং মানুষের বিবেক, অনুভূতি ও চেতনার অংশ হয়ে যায়। কারবালার ঘটনা তেমনই এক অধ্যায়। এটি শুধু একটি যুদ্ধের বিবরণ নয়, কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের গল্পও নয়; বরং নীতি, সত্য, আত্মমর্যাদা ও দায়িত্ববোধের প্রশ্নে এক মহান আত্মত্যাগের ইতিহাস। ৬০ হিজরি।

মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। নেতৃত্ব ও দায়িত্বের প্রশ্নে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এ সময় রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.) সময়ের ঘটনাকে কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন হিসেবে দেখেননি; বরং তিনি এটিকে উম্মাহর নৈতিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ চেতনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায়, বিশেষত ইমাম তাবারি, ইবন কাসির ও ইবনুল আছিরের সূত্রে কারবালার ঘটনাপ্রবাহ সেই সময়ের জটিল বাস্তবতার মধ্যেই বিকশিত হয়েছিল।

সূর্য তখন ধীরে ধীরে পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়ছে। মরুর উত্তপ্ত বাতাস বয়ে যাচ্ছে কারবালার বিস্তীর্ণ প্রান্তরে। চারদিকে ধুলোর ঝড়, নিস্তব্ধতা আর অদৃশ্য এক অশ্রুর ভার। কিন্তু সেই মরুভূমিতে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন মানুষ, যার পরিচয় শুধু একজন যোদ্ধা নয়, একজন বিদ্রোহীও নয়; তিনি ছিলেন নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অতি প্রিয় দৌহিত্র, ফাতিমার আদরের সন্তান, আলীর সাহসের উত্তরাধিকার- ইমাম হোসাইন ইবনে আলী (রা.)।

মানুষের বিবেক, অনুভূতিএ যেন ইতিহাসের এক কঠিন মুহূর্ত। ক্ষমতার সামনে মাথা নত করবেন, নাকি সত্যের জন্য সবকিছু বিসর্জন দেবেন? তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন। মদিনার নরম মাটি থেকে শুরু হয়েছিল সেই যাত্রা। সামনে কী আছে, তিনি জানতেন না; কিন্তু বুঝেছিলেন পথটি সহজ নয়। ইরাকের কুফা থেকে একের পর এক আহ্বান এসেছিল, ‘এসে নেতৃত্ব দিন, আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’ তিনি তাড়াহুড়ো করেননি। আগে পরিস্থিতি যাচাই করলেন। তাঁর বিশ্বস্ত প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিল (রা.)-কে পাঠালেন। প্রথমে আশার আলো দেখা গেলেও অল্প সময়েই পরিস্থিতি বদলে যায়। ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়, কুফার রাজনৈতিক পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং বাস্তবতা কঠিন হয়ে ওঠে। তবু যাত্রা থামেনি। ৮ জিলহজ ৬০ হিজরিতে যেদিন বহু মানুষ হজের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সেদিন ইমাম হোসাইন (রা.) পরিবার, সন্তান, স্বজন ও অল্প কয়েকজন বিশ্বস্ত সাথীকে নিয়ে মক্কা থেকে যাত্রা করলেন। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে কেন? কারণ কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন নিজের জন্য, আর কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন একটি আদর্শের জন্য। দীর্ঘ যাত্রার পর ২ মহররম ৬১ হিজরিতে তাঁর কাফেলা কারবালার প্রান্তরে পৌঁছে। কারবালার মাটিতে পৌঁছে বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে গেল। সামনে বিশাল বাহিনী। পেছনে ফিরে যাওয়ার পথও প্রায় বন্ধ। তবু তাঁর কণ্ঠে ভয় ছিল না। ছিল স্থিরতা। দিন কেটে যাচ্ছিল। পানি সংগ্রহের পথ সীমিত হয়ে এলো। শিশুদের কান্না, মায়েদের উদ্বেগ, দীর্ঘ অবরুদ্ধ পরিস্থিতি, সব মিলিয়ে এক কঠিন পরীক্ষা নেমে এলো। মরুভূমির গরম বাতাস যেন প্রতিটি মুহূর্তে পরীক্ষা নিচ্ছিল ধৈর্য, বিশ্বাস আর দৃঢ়তার।

সেই রাত, আশুরার আগের রাত। ইমাম হোসাইন (রা.) তাঁর সাথীদের ডেকে বললেন, তোমরা চাইলে চলে যেতে পারো।

অন্ধকার তোমাদের আড়াল করবে। তারা আমাকে চায়। কিন্তু কেউ গেল না। কেউ বলল না, আমরা জীবন চাই। বরং তারা বলল, আপনাকে রেখে আমরা কোথায় যাব? এ ছিল শুধু আনুগত্য নয়, এ ছিল ভালোবাসা। এ ছিল সত্যের পাশে থাকার অঙ্গীকার। ১০ মহররম ৬১ হিজরি। সকাল হলো। সূর্য উঠল। ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাময় এক সকাল। সংঘর্ষ শুরু হলো। এক এক করে সাথীরা বিদায় নিতে লাগলেন। পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে গেলেন। প্রত্যেকে যেন বলছিলেন, ‘আজ জীবন নয়, সত্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।’

♦ লেখক : পরিচালক, চরপাথালিয়া সালমান ফারসি (রা.) মাদ্রাসা, মুন্সিগঞ্জ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews