হাসিনার আমলে দেশ থেকে ২৭ লাখ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে। মেধা পাচারের হিসাব এর সাথে যুক্ত হলে এর মূল্যমান আরো অনেক বেশি। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অর্থনৈতিক সামর্থ্য, ব্যাংকিং সেক্টর ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ রাষ্ট্রের অন্যতম লাইফলাইন। ভারতের বশংবদ শেখ হাসিনা ও তার অলিগার্ক মাফিয়ারা পরিকল্পিতভাবে দেশকে দেউলিয়া করে দিতেই বল্গাহীন লুটপাট চালিয়ে দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিয়েছিল। দেশকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও কেউ এসে দেশ পরিচালনা করতে না পারে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করে ফরেক্স রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছিল। আশা করা হচ্ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের তেমন কোনো সাফল্য নেই। নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ব্যবসায়-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের লক্ষ্য অর্জনে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনাকে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তবে সরকারের ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। তবে ইতোমধ্যে কিছুটা আশার আলো ও সংশয়ের মিশ্রিত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার পর দুর্নীতি দমন কমিশনে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের যোগদানের মধ্য দিয়ে রাঘব বোয়ালদের অর্থপাচারসহ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত কার্যক্রমে গতি আসার প্রত্যাশা বেড়েছে। তবে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে গঠিত টাস্কফোর্স নিয়ে কিছুটা সংশয়ও দানা বেঁধে আছে।
গতকাল ইনকিলাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্টোলেন অ্যাসেট বা পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত টাস্কফোর্সে এমন সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের যুক্ত করা হয়েছে, যারা নিজেরাই বিবগত সময়ে অর্থপাচারের দায় এড়াতে পারেন না। সে সময় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্য, মন্ত্রী, বিভিন্ন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী অলিগার্কদের বল্গাহীন অর্থপাচারের সাথে প্রভাবশালী আমলা, বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন ব্যাংকের যেসব কর্মকর্তা ও পরিচালকরা জড়িত ছিলেন, গঠিত টাস্কফোর্সেও তাদেরকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে। সংগত কারণেই তারা টাস্কফোর্সের কর্মকা-কে ব্যাহত করে এর লক্ষ্য অর্জনকে ব্যর্থ করে দিতে চাইছে। বিগত দুই বছর ধরে শুধুমাত্র বৈঠক ও অহেতুক চিঠি চালাচালির মাধ্যমে সময় ক্ষেপণ ও ইচ্ছাকৃত আইনগত জটিলতা সৃষ্টির চেষ্টাই লক্ষ করা গেছে। এর মধ্য দিয়ে বিপুল অর্থ ফেরত আনার কার্যক্রমকে ঝুলিয়ে দেয়া এবং প্রকারান্তরে দায়মুক্তির অপপ্রয়াসের আলামতও দেখা যাচ্ছে। চব্বিশের ডিসেম্বরে দুদকের নেতৃত্বে গঠিত জয়েন্ট ইনভেস্টিগশেন টিম বা জেআইটি গঠনের পর দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দুদক অকার্যকর হয়ে থাকার নেপথ্য কারণ রহস্যাবৃত। দুদকের নেতৃত্বে জেআইটি গঠিত হওয়ার তিনমাস আগে চব্বিশের ২৯ সেপ্টেম্বর গঠিত হয়েছিল ‘ইন্টার এজেন্সি টাস্কফোর্স অন স্টোলেন অ্যাসেটস রিকভারি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট’ নামক সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনরের নেতৃত্বে পুলিশের সিআইডি, এনবিআরের গোয়েন্দা বিভাগ সিআইসি, কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগ সিআইআইডিসহ মোট ১১টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের কার্যক্রমের পরিধি, পদ্ধতি ও অগ্রগতি পর্যালোচনা করে তা পুনর্গঠনসহ নতুন সিদ্ধান্তে আসা জরুরি হয়ে পড়েছে। শেখ হাসিনার আমলেও অর্থপাচার রোধ করতে লোকদেখানো অনুরূপ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল, সেখানে অর্থপাচারের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদেরই অর্থপাচার রোধ ও অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবে এসব টাস্কফোর্সের ফলাফল শূন্য। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে লুটেরা ফ্যাসিস্টের বিদায়ের পর পাচার হওয়া লাখ লাখ কোটি টাকা ফেরত আনার কার্যক্রম দুই বছরেও কোনো ফলাফল দৃশ্যমান না হওয়া দুঃখজনক।
অর্থপাচারের প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি ও তার সাথে জড়িতদের নাম-ধামসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ও খোঁজখবর সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর অজানা নয়। হাসিনার আমল থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমল এবং এখনো অব্যাহতভাবেই সব ধরনের তথ্য-উপাত্ত বেরিয়ে আসছে। টাকা ফেরত আনতে যত আইনগত প্রতিবন্ধকতাই থাকুক না কেন, ভুয়া এলসি মার্জিন খোলা, ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং, ভুয়া ঘোষণা দিয়ে, হুন্ডি, ক্রিপ্টোকারেন্সি কিংবা পণ্য আমদানি না করেই বিদেশে কোটি কোটি ডলার পাচারের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে খুঁজে বের করা কোনো কঠিন কাজ নয়। শেখ পরিবারসহ হাসিনার দোসর সামরিক-বেসামরিক আমলা, কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্রক্সি হিসেবে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে এখন বিদেশে বসে রাজকীয় জীবন যাপন করেই বসে নেই, তারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, দেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারত, লন্ডন, নিউইয়র্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে দেশবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। তাদের সাথে ঘনিষ্ট ব্যাংকার, আমলা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা এখনো অর্থ পাচারের সাথে জড়িত থাকতে পারে। অপ্রদর্শিত আয় বিদেশে পাচার রোধ এবং দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান অস্বচ্ছতা ও প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করার বাস্তবসম্মত উদ্যোগ প্রয়োজন। একজন প্রথিতযশা সাবেক বিচারপতির নেতৃত্বে নবগঠিত দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে মানুষের অনেক প্রত্যাশা। অতীতের দুর্নীতি দমন ব্যুরো, মাফিয়া সরকারের আমলের দন্ত-নখরহীন ও বিরোধীদল দমনের হাতিয়ার দুদকের পুনরাবৃত্তি জাতি আর দেখতে চায় না। কোটি কোটি কৃষক-শ্রমিক, প্রবাসী কর্মীর শ্রমে-ঘামে অর্জিত লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দেশকে যারা সীমাহীন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে প্রকৃত ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা যেন টাস্কফোর্সের দ্বারা অযথা হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ইতোমধ্যে যেসব বিদেশি ল’ফার্মকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তার সাথে টাস্কফোর্স ও দুর্নীতি দমন কমিশনের যথাযথ সমন্বয় নিশ্চিত করাও জরুরি।