সমস্যা মশারির মতো চারদিক থেকে মানুষকে ঘিরে রাখে। সে সামনে-পেছনে-দুই পাশে-ওপরে-নিচে সর্বত্র বিরাজমান। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মিজানুর রহমান বলেন, সমস্যার মতো দুর্ভাগা বস্তু আর হয় না। সবাই চায় তার যেন জন্ম না হয়। হলেও ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্রই মরে যাক। শকুনের দোয়ায় গরু মরে না, মানুষের দোয়ায় মরে না সমস্যা। মরলে কিন্তু ভয়ানক সমস্যায় নিপতিত হতো পৃথিবী।

সেটা কী রকম? উত্তরে তিনি বলেন, সমস্যা না থাকলে শৃঙ্খলা থাকত না। নিজের দেহটাই প্রথমে দেখ। দেহের একটা অংশ পেট। পেট আছে তাই খিদে আছে। খিদে একটা সমস্যা। ওটা বিদেয় করতে খাবার লাগে। খাদ্য কিনতে লাগে টাকা। উপার্জন বিনা টাকা হাতে আসে না। উপার্জন করতে হয় শর্ত মেনে। শর্ত মেনে চলা মানে শৃঙ্খলার মধ্যে থাকা। শৃঙ্খলা আছে বলেই কেজো লোকদের হাতে আছে এই ভুবনের ভার। পেট না থাকলে কেউই কারও নতিস্বীকার করত না। এটা মিজানুর রহমানের দৃঢ় বিশ্বাস। পেটের অনুপস্থিতিতে সবাই নিজেকে মনে করত ‘আমিই রাজা। আমার হুকুমে হবে তেড়িয়া আদমির সাজা।’ খুনাখুনি, মারামারি, হইহট্টগোল দুনিয়াটাকে বানিয়ে ফেলত দোজখ। শুধু এ অবস্থাটা বিবেচনা করেই মানবজাতির উচিত আল্লাহর দরবারে অবিরাম শোকর আদায় করা।

তবে জগৎসংসারে এমন মানুষের সংখ্যাই বেশি যাঁরা সমস্যামুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে চব্বিশ ঘণ্টা তদবির করতে প্রস্তুত। যখন আমার ছাত্রত্ব চলছে তখন এরকম তিন চরিত্রের দেখা পেয়েছিলাম। তিনের এক সৈয়দ শাহনাজ শফিক। তার দাদির আগ্রহ, দাদির ভাশুরের নাতনিকে সে বিয়ে করুক। শাহনাজ অন্য কন্যাকে বউ বানানোয় আগ্রহী। ওই আগ্রহ আর এই আগ্রহের মধ্যে লেগে গেল টক্কর। মানসিক যুদ্ধ তীব্র থেকে তীব্রতর হলো। যুদ্ধ যে ধরনেরই হোক ওটা অবশ্যই এক সমস্যা। শান্তির জন্য লাগবে তাবিজকবচ। চিন্তা কেন? ওগুলো দিতে একপায়ে খাড়া গুনিন।

গুনিন জানায়, অষ্টধাতু দিয়ে তৈরি খোলসে মন্ত্রপূত সর্ষে দানা পুরে দিয়ে একটা তাবিজ বানাবে সে। তাবিজটা অমাবস্যা বা পূর্ণিমার রাতে চুপিসারে দাদির মাথায় ছেঁাঁয়ালে নাতির ইচ্ছাই হয়ে যাবে দাদির ইচ্ছা। খরচ পড়বে কেমন? খরচ তেমন নয়। সাকল্যে সাত শ সত্তর টাকা। শাহনাজ বলে, মাথা খারাপ! এমপিএর (মেম্বার অব প্রভিন্সিয়াল অ্যাসেম্বলি) বেতন পাঁচ শ টাকা। এর চেয়ে দুই শ সত্তর টাকা বেশি খরচ করে দাদিবশের তাবিজ কিনব আমি? অসম্ভব!

তাইলে এক কাম করেন মার্চাব (মানে মাস্টার সাব, মানে ছাত্র সাহেব)। প্রস্তাব দেয় গুনিন, এলেমের মামলায় কিপ্টামি না কইরা হেই (ওই) দুই শ সত্তর টিঁয়াই (টাকাই) দিয়েন। সৈয়দ শাহনাজ বলে, না। সত্তর দিমু। রাজি? প্রশ্ন শুনে গুনিন স্তম্ভিত এবং ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যেই সম্মত।

২. তাবিজ প্রয়োগের দিন সাতেক পরেই নাতির আগ্রহের সমর্থনে দাদি তাঁর আগ্রহ প্রত্যাহার করেন। শাহনাজ জানায়, তাবিজ ছোঁয়ানোয় নয়, বর্জনে উপকার মিলেছে। সে নাওয়াখাওয়া আর বাড়ি ছেড়ে দেওয়ায় দাদি কাবু হয়ে গেলেন। তবু সমস্যা গেল না। নতুন সমস্যা সামনে এলো। কীভাবে?

জনকের গর্জন, সৈয়দ বংশের পোলা কোন আক্কেলে বিয়া করতে চায় কাঠুইররার মাইয়ারে? শাহনাজ বলে, কাঠের ব্যবসারে টিটকারি করতেছেন? স’ মিলের মালিক উনি। জঙ্গলে গিয়ে কাঠ কাটন উনার পেশা না। উচ্চ বংশগিরি দেখানো ক্ষ্যামা দেন আব্বা! আমনের দাদার আব্বারে সবাই কইত ‘নুরু মিয়া মুহুরি’। উনার নামের আগে সৈয়দ ছিল না। আমনের দাদায় ইংরেজ কুঠিতে মুদি মাল সাপ্লাই দিয়া টাকাঅলা হইছেন। ব্যস, সঙ্গে সঙ্গে উনি হইয়া গেলেন ‘সৈয়দ আদিলুজ্জামান’।

শাহনাজকে বাড়ি থেকে বহিষ্কার করলেন তার বাবা। ঘোষণা করলেন, তাঁর লাশ দেখার জন্যও যেন সে না আসে। বন্ধুরা জানতে চায়, কেন সে পিতৃবংশ নিয়ে পিতাকে খোঁচা দিল। শাহনাজ বলে, মনে করেছি আগুনে পানি ঢালছি। অহংকার অভিমান ক্রোধ নিভে যাবে। যাকে মনে করেছি পানি, তা আসলে ঘি। ভাইরে মন জিনিসটাই বিরাট সমস্যা!

মনে হওয়ার খেসারতনিজের চোখে দেখাজনিত যে প্রত্যয় ধারণ তা-ও পয়দা করে মন। চাঁদনি রাতে মেঠো পথে শুয়ে থাকা সাপ দেখে ভয়ার্ত মানুষ হাঁক দেয়-‘লাঠি নিয়ে আয়/জলদি আয়।’ আশপাশের বাড়িঘর থেকে ছুটে আসা লাঠিসজ্জিত মানুষ মনোযোগ দিয়ে তাকায় এবং বিস্মিত হয়ে বলে, ওরে আল্লা এটা তো আস্ত একটা দড়ি। এই দড়িকে সাপ মনে করা হয়েছে। উল্টোটাও হতে পারত। জোসনা রাতে রাস্তায় শুয়ে গায়ে শীতল বাতাস লাগানোয় মগ্ন সাপকে দড়ি মনে করে যদি পায়ে দলতে যাই, তবে? এ ক্ষেত্রে সর্প দংশনে পথিকের অকালমৃত্যুর সম্ভাবনা প্রবল।

সাপের কামড়ভিত্তিক দারুণ এক গল্প শুনেছি ভারতের বিখ্যাত স্ট্যান্ডিং কমেডিয়ান এহসান কোরেশির মুখে। হিন্দি অণুকবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে বর্ণিত ওই গল্পে আছে : বিষধর একটা সাপ এক নেতাকে কামড় দেয়। মাটিতে চিতপাত নেতা ছটফটাতে থাকেন। সাপও ছটফটায়। কিছুক্ষণ পর নেতা আর সাপের ছটফটানি থেমে যায়। কয়েক সেকেন্ড পর নেতা উঠে দাঁড়ালেন। সাপ নড়ে না। নড়বে কী করে? সে তো মরে পড়ে আছে। নেতার বিষ সাপের বিষের চাইতেও মারাত্মক।

অনেক বছর পরে, মনে হয় ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে, কক্সবাজার সাগরসৈকতে সৈয়দ মাহফুজুর রফিক অর্থাৎ সৈয়দ শাহনাজ শফিকের বাবার সঙ্গে দেখা। আগে দাড়ি ছিল না, এখন দাড়ির জন্য তাঁর ঠোঁট দেখা যায় না। তাই প্রথমে চিনতে পারিনি। ‘আব্বা ভালো আছনি’ শুনে চমকে উঠি। দেখি, তাঁর সঙ্গে বছর সাত বয়সি এক মেয়ে। সহাস্যে বললেন, ‘মিট মাই গার্লফ্রেন্ড শাকিলা।’ বললাম, শাহনাজের মেয়ে?

মৃদু চোখ বুজে মাথা কাত করে তিনি বোঝালেন, হ্যাঁ। জানতে চাইলাম, কীভাবে আপস হলো খালুজান। তিনি জানান, দিন যত যায় ততই মন বদলায়। মনে হলো, হবু শ্বশুরের পক্ষ নিয়ে ছেলে যা যা বলেছে তার কোনোটিই মিথ্যে নয়। আমার বংশ গরিমার বিরুদ্ধে যা যা বলেছে সবই সত্য। তা সত্ত্বেও মনে মনে চেয়েছি শাহনাজ এসে ‘স্যরি’ বলুক। ও এলো না। যখন দেখলাম, ওর পথ চাইতে চাইতে নাতনির বয়স চার বছর হয়ে গেল, তখন গাধাটাকে কান ধরে নিয়ে আসতে বাধ্য হলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে শাহনাজও সস্ত্রীক হাজির হয় সৈকতে। তার কাছ থেকে জানা গেল, কান ধরে নয়, নাতনি আর নাতনির বাবা-মাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে সৈয়দ মাহফুজুর রফিক বলেছিলেন, ‘এখনই বাড়ি চল। না গেলে আমায় গুলি করে মার।’

৩. মফস্বল শহরে আমাদের এলাকা থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মাইল চারেক দূরে হায়দর রশিদ খানের বাড়ি। শহরে প্রতিদিনই আসেন বাইসাইকেল হাঁকিয়ে। নাদুসনুদুস সুঠামদেহী সত্তরোর্ধ্ব রশিদ খান মনে করতেন, ওয়ার্লডের সেরা সোলজার হচ্ছে পাকিস্তানি সোলজার। তিনি কাকে উত্তম বা অধম মনে করবেন সেটা তাঁর ব্যাপার। সমস্যা হলো, ১৯৭১ সালে বিশ্বসেরা সোলজারের বিরুদ্ধে লড়াইরত মুক্তিসেনাদের তিনি জারজ সন্তান মনে করতেন।

মনের কথা মনে ধরে রাখা নিরাপত্তার জন্য বেশ উপাদেয়। রশিদ খানকে এই হিতকথা মনে হয় কেউ কখনো বলেনি। এমতাবস্থায় তিনি বড়শিতে মাছ শিকার করতে গেলেন পরানপুর দিঘিতে। জলাশয়টির চারদিকে বড়শি ফেলে বসে আছে প্রায় চব্বিশ ব্যক্তি। খানের পাশে বসে নিজের বড়শির ফাতনার দিকে তাকিয়ে আছেন প্রাক্তন ফুটবলার সেরাজুল হক। তাঁর দেহখানা এতই হালকাপাতলা যে মনে হয় সামান্য ঝোড়ো বাতাস বইলেই তুলোর মতো শূন্যে ভাসতে ভাসতে উত্তরের জেলা কুমিল্লায় গিয়ে অবতরণ করবেন। সেজন্য ফাজিল ছেলেরা তাঁকে বলে ‘চিকনা সেরাজ।’

শুনলাম মুক্তিযোদ্ধাগোরে আমনে জাউরা মনে করেন? খানের কাছে জানতে চাইলেন চিকনা সেরাজ। জবাবে রশিদ খান বলেন, হ্যাঁ, মনে করি। মুক্তিযুদ্ধরে যারা সাপোর্ট করে, আমি মনে করি তারাও জারজ। সেরাজ বলেন, সাপোর্ট তো আমিও করি। আমারেও জাউরা মনে হয় আমনের?

হ্যাঁ। মনে করি, মনে করি, মনে করি, হইছে? যে-ই বললেন রশিদ খান অমনি নিজের বড়শিটারে ভেঙে দুই ভাগ করে, হুইলসমেত ভাঙা অংশটা দিয়ে খানের সর্বাঙ্গে বাড়ি মারতে থাকেন চিকনা সেরাজ। হুইলের আঘাতে খানের শরীরের এগারো জায়গা রক্তাক্ত। তিনি মনে করেছেন চিকনাদেহী লোকটার চিমটি কাটার শক্তিও নেই। কিন্তু বাধা না দিলে তিনি হয়তো তাঁর গর্দানটাই ফাঁক করে দিতেন।

হাসপাতালের বিছানায় শোয়া হায়দর রশিদ খানকে ওষুধ খাওয়াতে আসা তরুণী নার্স বলেন, কার অ্যাকসিডেন্ট কোথায় করলেন আংক্ল? ইস্! কত জখম! খান বলেন, অ্যাকসিডেন্ট না। আগুনরে বরফ মনে করার খেসারত দিতেছিরে বইন।

খেসারত ব্যাপারটা বেদনাবহ অবশ্যই। তবে কোনো কোনো সময় এরকম বেদনার সঙ্গে বিনোদনও দেখা যায়। পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের (১৯৭৭-১৯৮৮) শাসনকালের গোড়ার দিকে মিলিটারি ট্রাইব্যুনালে চার নাগরিকের বিচার চলছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ : তিনজন মিলিটারি অফিসারকে তারা পিটুনি দিয়েছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে একজন ঠেলাগাড়িতে করে কাটা ফল বিক্রেতা। বাকি তিনজন একটি বাড়ির বাসিন্দা।

মাঝদুপুরে ওই বাড়িতে অবৈধ অস্ত্র সন্ধানের জন্য ঢুকেছিল সৈন্যরা। গৃহকর্তা ট্রাইব্যুনালকে বলেন, গৃহতল্লাশির নামে ওরা বাড়ির মহিলাদের দেহতল্লাশি শুরু করলে আপত্তি জানাই। তবু তারা থামে না। তখন আমরা ওদের ধাওয়া দিলাম। আমি আর আমার দুই ছেলে মিলে তিন অফিসারকে পাকড়াও করি। কিল চড় ঘুসি মারি।

তুমি কেন মারলে? প্রশ্নের জবাবে ট্রাইব্যুনালকে ফলবিক্রেতা বলে, বাড়ির উল্টো দিকের ফুটপাত ঘেঁষে ঠেলায় দোকান বসিয়েছিলাম হুজুর। দেখি, তিনটা লোক তিনটা মিলিটারিকে পিটোচ্ছে। মনে হলো, নিশ্চয়ই মার্শাল ল’ উঠে গেছে। নইলে এমন সাহস হয়? নিজেকে নিজে বললাম, যা বেটা। তুইও দুই ঘা দিয়ে আয়।

♦ লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews