ডিএমপির ব্যস্ত সদরদপ্তরের ভেতরে প্রতিদিনই চলে নথি, বদলি আর সিদ্ধান্তের অদৃশ্য এক প্রবাহ। সেই প্রবাহের মাঝেই নীরবে কাজ করে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিস যেখানে একটি স্বাক্ষর বদলে দিতে পারে একজন পুলিশ সদস্যের কর্মস্থল, কখনো পুরো জীবনযাত্রাও। আর এই দপ্তরের এক কোণেই দীর্ঘদিন ধরে বসে আছেন ফ্যাসিস্ট ডিএমপির পলাতক পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমানের ঘনিষ্ট বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে অন্যতম এসআই (নিরস্ত্র) মো. খবীর হোসেন ও এসআই মাহফুজা।
আশ্চর্য্য হলেও সত্য আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর খবীর হোসেন হয়ে গেছে ‘খবীরুল ইসলাম’; নিজের বুকের নেমপ্লেট ঝুলছে ‘খবীরুল’ নামটি। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমল থেকেই অদৃশ্য শক্তিবলে এই দপ্তরে নিজের চেয়ার স্থায়ী করে নিয়েছেন পুলিশের এই কর্মকর্তা। অভিযোগ রয়েছে এখানে বসেই তারা তথ্য পাচার করেন পলঅতক পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে। এ ব্যপারে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ আছে, পুলিশের যেসব শীর্ষ কর্মকর্তা আত্মগোপনে গেছেন তাদের আস্থাভাজনদের (সিন্ডিকেট) অন্যতম এসআই খবীর। ডিএমপির গুরুত্বপূর্ণ চেয়ারটিতে বসে কৌশলে পুলিশের ‘গোপন তথ্য’ পলাতক কর্তাদের কাছে পাচার করছে বলে অভিযোগ আছে। অতীতে তাকে নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কেউ তাকে চেয়ার থেকে সরাতে পারেনি।
জানা গেছে, হাবিবুর রহমান (সর্বশেষ ডিএমপি কমিশনার) যখন ডিসি হেডকোয়ার্টার তখন থেকে ডিএমপির রিজার্ভ অফিসে কর্মরত খবীর হোসেন। তার সঙ্গে রয়েছে একই সময়ের এসআই মাহফুজা। যারা পুলিশে একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে।
সূত্র বলছে, যেকোনো পুলিশ সদস্য বদলি হলে টাকা দিতে হয় রিজার্ভ অফিসকে। এই টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে আছে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিসে কর্মরত এসআই খবীরুল ওরফে খবীর হোসেন ও এসআই মাহফুজা বেগম। ফ্যাসিস্ট আমলেও তারা ডিএমপিতে অবৈধ কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিল।
পুলিশের নথি অনুযায়ী, খবীর হোসেন ২০০৬ সালের অক্টোবরে কনস্টেবল হিসেবে ডিএমপিতে যোগ দেন। ২০০৯ সালের ২১ জুলাই পর্যন্ত ডিএমপির পিওএম উত্তর বিভাগে কনস্টেবল হিসেবে কর্মরত থেকেছে। একইবছরের ২২ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডিএমপির ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড ফোর্স বিভাগের হেডকোয়ার্টার্সে পদায়ন ছিল।
২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি খবীর সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) পদে পদোন্নতি পেয়ে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব-১১, নারায়ণগঞ্জ) সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে তিনি ২০১৬ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের মার্চে আবার ডিএমপিতে যোগ দিয়ে প্রশাসন বিভাগের অধীনে বিভিন্ন ইউনিটে কাজ শুরু করে।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এএসআই (নিরস্ত্র) হিসেবে কেন্দ্রীয় শাখায় কর্মরত ছিলেন। ২০১৯ সালের শেষ দিকে স্বল্প সময়ের জন্য পুলিশ লাইনে দায়িত্ব পালন করার পর ২০১৯ সালের ৩ ডিসেম্বর থেকে বর্তমান পর্যন্ত ডিএমপির হেডকোয়ার্টার্স ও প্রশাসন বিভাগের অধীনে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ অফিসে এসআই (নিরস্ত্র) হিসেবে কর্মরত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ সদস্য দাবি করেন, রিজার্ভ অফিসে বদলির কাজ করতে গেলে অনানুষ্ঠানিকভাবে টাকা দিতে হয় এটা অনেকদিনের প্রচলন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, পুলিশের ভাবমূর্তি ও জনআস্থা রক্ষায় এ ধরনের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
ডিএমপির ডিসি সদর দফতর মো: আমির খসরু ইনকিলাবকে বলেন, ওই দুই কর্মকর্তার বিষয়ে কোন অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তাছাড়া তারা কত দিন যাবত ডিএমপিতে আছেন সেটিও খতিয়ে দেখা হবে। তথ্য পাচার বা অন্য কোন অভিযোগ প্রমানিত হলে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।