দিন কয়েক ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ‘নির্মূল’ শব্দটি নিয়ে সরগরম। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্প্রতি জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের কথা বলেন। এ নিয়ে পাল্টা ঝাঁঝালো বিবৃতি দিয়েছে বিরোধী দল।
দেশের চলমান প্রেক্ষাপটে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতে ইসলামীকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের কথা উল্লেখ করেছেন, যার মানে আমরা ধরে নিতে চাই— নির্বাচনের মাধ্যমে বা রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের জনভিত্তি ধসিয়ে দেয়া; কিন্তু রাজনীতি তো আর সরলপথে চলে না। চলে নদীর মতো এঁকেবেঁকে। তাই প্রকাশ্যে একরকম হলেও বাতেনে থাকে সম্পূর্ণ উল্টো বাস্তবতা। প্রশ্ন জাগে, কোনো দলকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূল বা অপ্রাসঙ্গিক করতে হলে তা ঘোষণা দেয়া কি স্বাভাবিক? তা যে অস্বাভাবিক তা খোদ ডেপুটি স্পিকার সংসদে বললেন, নির্মূল শব্দটি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহন করে না।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন সজ্জন ব্যক্তি; কিন্তু সেই তিনি যখন প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের কথা বলেন; তখন বিস্ময় জাগে বৈকি। তার এমন বক্তব্য বর্তমান সরকারের অস্থিরতার বহিঃপ্রকাশ কি না তা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন উত্থাপন করছেন।
নির্বাচনে ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এমন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানাতে গিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলটিকে রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের আহ্বান জানান। এটি নিশ্চয় তার বয়সজনিত মতিভ্রম নয়। তীব্র মনোবাসনা। তিনি বলেন, জামায়াত কখনোই সুষ্ঠুভাবে চিন্তা করে না, তা প্রমাণ হয়েছে। গত ২৫ এপ্রিল নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে যৌথসভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে এই কথা বলেন তিনি।
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে মির্জা ফখরুল আরো বলেন, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করতে একটি পক্ষ প্রথম থেকে অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনের আগে থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে অফুরন্ত মিথ্যাচার, অপপ্রচার, সোশ্যাল মিডিয়াকে অন্যায় ও অনৈতিকভাবে ব্যবহার করে জনগণের কাছ থেকে দলকে সরিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা করেছে; কিন্তু তারা সফল হয়নি। তারা ফ্যাসিস্ট শাসনের পাঁয়তারা করছে কি না, সেটি চিন্তা করতে হবে। ভিন্নভাবে দেশকে আবার স্বৈরাচারের মধ্যে নিতে চায় কি না, সেটিও ভাবতে হবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমি আজকে এক পত্রিকায় একটি সংবাদ দেখলাম, যে সংবাদটি আমাকে অত্যন্ত আহত করেছে। সেখানে জামায়াতে ইসলামীর আমির বলছেন, বিএনপি ইঞ্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় এসেছে। আমি এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি, প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং তিনি বা তার দল যে কখনোই সুস্থভাবে চিন্তা করেন না, তা প্রমাণিত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সব দেশ এবং দেশের সব পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম একবাক্যে স্বীকার করেছে— এই নির্বাচন বাংলাদেশের সবচেয়ে নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। সেই সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনপ্রিয়তার মাধ্যমে ২১৩টি আসন পেয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছে। সুতরাং, জামায়াতের আমিরের এ বক্তব্য আমি প্রত্যাখ্যান করছি শুধু নয়; নিন্দা জানাচ্ছি এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছি।’ মির্জা ফখরুলের এমন দাবির প্রতি সম্মান জানিয়েও বলতে হয়, ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়েও দেশী-বিদেশী সব পক্ষ একবাক্যে বলেছিল— শতভাগ নিরপেক্ষ হয়েছে; কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের জিজ্ঞাসাবাদে তারা বলছেন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে কারচুপি করেছিলেন তারা।
বিএনপি মহাসচিব বলেছেন, ৫ আগস্টের পর গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার যে সুযোগ পাওয়া গেছে, সেই প্রচেষ্টা নষ্ট করে দিতে আবার ফ্যাসিস্ট শাসনের পাঁয়তারা তারা করছে কি না, সেটি চিন্তা করতে হবে। তিনি বলেন, ‘তাদের যে অতীত ইতিহাস, আমরা সবাই ভালো করে জানি। সমগ্র জাতি সচেতনভাবে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। আগামীতে যেন রাজনৈতিকভাবে তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা যায়, সেভাবে আমাদের কাজ করতে হবে।’
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। গণমাধ্যমে পাঠানো প্রতিবাদলিপিতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার ওই দিন রাতেই বলেন, ‘বিএনপি মহাসচিব বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে পুরোপুরি রাজনৈতিকভাবে নির্মূল করার হুমকি দিয়ে যে অসাংবিধানিক, অনাকাঙ্ক্ষিত এবং অশোভন বক্তব্য দিয়েছেন আমি তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।... বিএনপি মহাসচিবের এমন বক্তব্য গণতন্ত্রের ভাষা নয়। তিনি পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদীদের ভাষায় কথা বলেছেন।’
মির্জা ফখরুল ইসলামের বক্তব্য হালকাভাবে নেয়ার অবকাশ নেই। সঙ্গত কারণে আমরা নির্মূলের রাজনীতি নিয়ে আলাপ তুলতে সচেষ্ট হয়েছি।
রাজনৈতিকভাবে নির্মূল বলতে আসলে কী বোঝায়? রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল, মতাদর্শ বা ব্যক্তিকে গণতান্ত্রিক, সাংবিধানিক বা সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় জনসমর্থন থেকে বিচ্ছিন্ন করা; কিংবা নির্বাচনে পরাজিত করে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে সরিয়ে দেয়াকে রাজনৈতিক নির্মূল বোঝায়। এটি কোনো ভৌত বা সহিংস হত্যাযজ্ঞ নয়; বরং গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিপক্ষকে অকার্যকর করে দেয়া। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার দেশে রাজনৈতিক নির্মূল উল্লিখিত সংজ্ঞায় শতভাগ সত্য; কিন্তু আমাদের দেশের রাজনীতি কি সংজ্ঞা দিয়ে পরিমাপ করা যায়?
সাবেক পূর্ব পাকিস্তান পর্ব থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, শাসকশ্রেণী অনেক রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করতে বিভিন্ন সময় দমন-নিপীড়ন চালিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল পায়নি। বাস্তবতা হলো, রাজনৈতিক দলকে নির্মূল বা অপ্রাসঙ্গিক করতে হলে নিশানা করা সংগঠনকে সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলা করতে হয়, যাতে জনগণ আপনা আপনি ওই দলের আদর্শ বর্জন করে। তাতে জনপরিসরে দলটির আর আবেদন থাকে না। অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এ জন্য চাই দীর্ঘ প্রক্রিয়া; কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে কোনো দল নির্মূলের প্রকল্প হাতে নিলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশে পূর্ব পাকিস্তানে আমরা কমিউনিস্ট পার্টিকে দৃষ্টান্ত হিসেবে নিতে পারি। দলটি পাকিস্তান আমলে চরম দমন-নিপীড়নের শিকার হয়েছিল; কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্মূল হয়নি। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলাদেশে প্রতাপের সাথেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এদের প্রভাববলয় লক্ষণীয় মাত্রায় হ্রাস পেয়েছে। মানে এদের প্রতিভা ফিকে হয়ে এসেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিশ্চিয় ভুলে যাওয়ার কথা নয়; স্মরণে আছে, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আবার ইসলামপন্থীরা রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পায়। সেই থেকে টানা চব্বিশের ৩ আগস্টের আগ পর্যন্ত তাদের রাজনীতিতে কোনো ছেদ পড়েনি। ওই বছর ৩ আগস্ট রাতে জামায়াতে ইসলামীকে পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকার নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে; কিন্তু শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে এখন আশ্রিত। আর জামায়াত আবার প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে আসে। আর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘রাখে আল্লাহ মারে কে’।
সমাজবাস্তবতায় কোনো রাজনৈতিক দলের উপযোগিতা হারিয়ে গেলে সেই দলের আবেদন নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে লোপ পায়। এতে এমনিতেই ওই দল হারিয়ে যায়। যেমন, আমাদের আর্থসামাজিক বাস্তবতায় বামপন্থী দলগুলোর এখন আর প্রাসঙ্গিকতা নেই। শুধু গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে এরা নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়। মির্জা ফখরুলের সাবেক দল হিসেবে তার এ বিষয়ে ভালোই জানাশোনা আছে। বাম আদর্শের উপযোগিতা থাকলে মির্জা ফখরুলের দল পাল্টানোর আদৌ দরকার হতো না।
আসলে কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্মূল বা নিষিদ্ধ করে সেই দলের প্রাসঙ্গিকতা লোপ করা যায় না। জামায়াতে ইসলামীকে অপ্রাসঙ্গিক করতে হলে দলটিকে সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবেলা করতে হবে; কিন্তু এটি কি আদৌ সম্ভব? এ সংশয়ের কারণ, যে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ ইসলামে বিশ্বাসী, সেই দেশে তাদের বিশ্বাস ধারণ করে যে দল রাজনীতি করে, তাদের অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা কি এতই সহজ! এর প্রমাণ তো আমরা হাতেনাতে পেয়েছি। শত প্রতিকূলতার পরও জামায়াত এ দেশের রাজনীতিতে টিকে আছে বহাল তবিয়তে। শুধু টিকে আছে বললে ভুল হবে, প্রবলভাবে ফিরে এসেছে। গণমানুষের মাঝে তুমুল সাড়া জাগিয়েছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুলই আন্ডার এস্টিমেট করে বলেছিলেন, জামায়াত তাদের কাছে আসন ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েছিল। দলটিকে ৩০টি আসন নিয়ে সমঝোতা করতে বলা হয়েছিল; কিন্তু দেখা গেল, এবারের নির্বাচনে ভোটের মাঠে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছে। শুধু তাই নয়, সারা দেশে বিএনপির মতো জনপ্রিয় একটি দলের সাথে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন বোধ করছি যে, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ভোরের কাগজে মরহুম আহমদ ছফা এবং ফরহাদ মজহারের সাথে একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক বাহাস হয়েছিল। সেখানে ছফা কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে নয়, আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক উপযোগিতা নিঃশেষ করে দেশ-সমাজ থেকে অপ্রাসঙ্গিক করার পক্ষে মত দেন। অন্য দিকে ফরহাদ মজহার আইন করে নিষিদ্ধের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেন। পরে মজহার অবশ্য তার সেই মত থেকে সরে আসেন।
মির্জা ফখরুল রাজনৈতিকভাবে নির্মূলের কথা বলে প্রকৃতপক্ষে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা বোধগম্য নয়। ধোঁয়াশাপূর্ণ। কারণ একদা সমাজতন্ত্রে আস্থাশীল মির্জা ফখরুলের সাবেক আদর্শ কমিউনিজমে ভিন্নমতের কোনো অবস্থান নেই। একদলীয় শ্রমিকরাজ কায়েমই যেখানে শেষ কথা।
মির্জা ফখরুলের মুখে নির্মূলের কথা শুনে শুভবুদ্ধির যে কেউ চিন্তিত না হয়ে পারেন না। যখন কথাটি দেশের প্রধান বিরোধী দলকে উদ্দেশ করে বলা হয়, তখন রাজনীতিসচেতন নাগরিকদের মনে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা জাগা স্বাভাবিক। এর আলামতই কি শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রশিবিরের ওপর প্রতিপক্ষ ছাত্রসংগঠনের সাঁড়াশি হামলার রিহার্সেল চলছে? আর নির্মূলের প্রাথমিক নমুনা হিসেবে প্রতিপক্ষের পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন করা দিয়ে কি শুরু?
লেখক : সহকারী সম্পাদক, নয়া দিগন্ত