প্রতি বছর স^াড়ম্বরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালিত হয়, রোপণ করা হয় লক্ষ লক্ষ চারা। প্রধানমন্ত্রী, পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রী ছাড়াও বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা এসব চারা রোপণ করে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করে থাকেন। কিন্তু যে চারা গাছটি রোপণ করে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয় অন্ততঃ সে গাছটি পরবর্তী বছর বেঁচে থাকলো কিনা তার খবর কি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা কর্মকর্তারা রাখেন? প্রতি বছরের এ অবস্থা সকল পর্যায়ে, সকল স্থানে। আমাদের দেশে প্রতি বছর রোপণ করা চারার অর্ধেকও যদি বেঁচে থাকতো তাহলে দেশে বনাঞ্চল সৃষ্টি করা কোন কঠিন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু রোপিত চারার যদি যত্ন পরিচর্যা করা না হলে, রোপিত চারা বেঁচে আছে কিনা তা যদি খবরদারি করা না হয়, ঘটা করে অনুষ্ঠানের উদ্বোধরেই কি মানে আছে?
আধ্যাত্মিক রাজধানী নামে খ্যাত সিলেট এক সময় ছিল ছিমছাম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নগরী। আজকের মতো এত বাসাবাড়ি যানবাহন বা লোক কোলাহল ছিল না। শহর এবং শহরতলীতে ছিল ছোট ছোট টিলা, ছিল গাছপালায় ভরপুর। ঘরের জানালা খোলা থাকলে অনেক সময় ফ্যানের দরকারই হতো না। পরিবেশ থাকতো নিরব সুন্দর ও স^চ্ছ। বাতাসে দুলতো গাছের পাতা। গাছগাছালির ছায়া ছিল সর্বত্র- পুকুরে মাছ ছিল, পানিতে পুকুর থাকতো টইটম্বুর। শহরের ভেতরে প্রবাহিত নালানর্দমা ছিল পরিষ্কার, মশা-মাছি, পোকজোকের উপদ্রব ছিল না। কিন্তু দিনের পরিবর্তনে, সময়ের আবর্তনে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। দরজা জানালা খোলা রাখলেও পর্দা উঠালেও নিস্তার নেই। গরম হাওয়া নিঃশ্বাস ভারি গরম হয়ে উঠে। পরিবেশের পরিবর্তন হচ্ছে। টিলা পাহাড় কেটে সাফ করা হচ্ছে, পুকুর ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন তৈরি হচ্ছে। বিনোদনের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বাড়ছে দালান কোঠা।
আমরা পুরুষেরা দিনের বেলা বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থাকি। ওখানেও একই অবস্থা, নিঃশ্বাস ফেলার ঝো নেই। চর্তুদিকে যানঝট, গাড়ি, কলকারখানার কালো বিষাক্ত ধোয়া নালা নর্দমার বিশ্রী পচা গন্ধ, বিড়ি-সিগারেট তথা নেশাদ্রব্য জিনিষপত্রের যত্রতত্র ব্যবহার আমাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। আইন করে যেমন কালো ধোয়ার বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক তেমনি পাহাড় টিলা কাটাও বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের নগর জীবন ধূমপানের বিরুদ্ধে নানা প্রকার সচেতনতা বৃদ্ধির কৌশল অবলম্বনের পরও যানবাহনে চলে ধূমপান। নগরীর অলিগলি ও মোড়ে মোড়ে স্তূপীকৃত হয় ময়লা আবর্জনা।
সবচেয়ে আশ্চর্য ও দুঃখজনক বিষয় এই যে, আমাদের হাসপাতালে পর্যন্ত সুস্থ পরিবেশ নেই। হাসপাতাল মানুষকে সুস্থ করে তোলার কারখানা। পরিচ্ছন্ন, সুস্থ ও সুন্দর থাকার পরামর্শ দেওয়ার কথা ঠিক সেখানে পরিবেশের এত বিপন্নতা আমাদের যেমন চিন্তিত করে, তেমনি করে ক্ষুব্ধ করে। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খুব সম্প্রতি কারো কি পা পড়েছে? যদি পড়ে থাকে তাহলে আমার বক্তব্যের সাথে আপনি একমত না হয়ে পারবেন না। অপরিচ্ছন্ন কাকে বলে- পরিবেশের বিপর্যয় কাকে বলে তার প্রমাণ এ হাসপাতাল। কর্তৃপক্ষ এজন্য হয়ত বিভিন্ন কারণ ও সমস্যার কথা তুলে ধরবেন। থাক-না সমস্যা, কিন্তু সুন্দর পরিবেশ তো রক্ষা করতে হবে। একজন রোগীকে সুস্থ ও উপযুক্ত চিকিৎসা উপহার দেয়া যেমন জরুরি, তেমনি পরিচ্ছন্ন পরিবেশ উপহার দেয়াও জরুরি। কেননা পরিচ্ছন্নতা বা সুস্থ পরিবেশ সুস্থ চিকিৎসারই পরিপূরক।
গাছ পাখিদের শুধু আশ্রয় নয়, ক্লান্ত বা পরিশ্রান্ত কোন পাখির মাথার উপর শুধুছায়া নয়, গাছের সঙ্গে রয়েছে মানুষের গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ স¤পর্ক। গাছ মানুষের জীবনের সহায়ক। একটু এগিয়ে বলা যেতে পারে গাছ মানুষের প্রাণ। মানুষের বাঁচার বা বেঁচে থাকার মৌলিক উপাদান অক্সিজেন ছাড়া জীবন অচল, আর এ অক্সিজেন মিশ্রিত থাকে বাতাসের মাঝে। কিন্তু বাতাস তথা বায়ু মন্ডলের অক্সিজেন তৈরির প্রধান ও প্রাকৃতিক উৎস হচ্ছে গাছ-গাছালি। গাছ ও মানুষ পরস্পর বন্ধু। মানুষ তার অস্তিত্বের প্রয়োজনে পর নির্ভরশীল। মানুষ অক্সিজেন গ্রহণ করে এবং ত্যাগ করে কার্বণ ডাই অক্সাইড। অন্যদিকে গাছ কার্বণ ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে আর উপহার দেয় অক্সিজেন। পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে বায়ু মন্ডলে কার্বণ ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই মানুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গাছ পালার পরিমাণ বৃদ্ধি না পেলে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটবে। আর তাহলে পৃথিবী হয়ে পড়বে বসবাসের অযোগ্য। অর্থাৎ পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বিপর্যয়ও অবশ্যম্ভাবী।
পরিবেশবিদ আব্দুস সোবহান পরিবেশ বিষয়ক এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ইংরেজি বর্ণমালার ‘পি’ যুক্ত তিনটি শব্দ বর্তমানে মানব সভ্যতার অস্তিত্বের সামনে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনটি শব্দ হচ্ছে- Pollution (দূষণ) Poverty (দারিদ্র্য) Population (জনসংখ্যা)। আসলে এ তিনটি শব্দ একত্রে মিলে মিশে গোটা পৃথিবীকে এমন এক অবস্থানে পৌঁছে দিচ্ছে, যেখানে জীবন হয়ে পড়ছে অনিশ্চিত। প্রাণ দুলছে বিপর্যয়ের দোলনায়। এ তিনটি পর্বতপ্রমাণ সমস্যা একে অপরের সঙ্গে স¤পৃক্ত। আমাদের দেশে এরা একা একা থাকতে চায় না, এরা জোট বেঁধে আমাদের দিকে হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ১৮ কোটির ওপর। স্বাধীনতার পূর্বে এ সংখ্যা ছিল মাত্র সাড়ে ৭ কোটি। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বৃদ্ধির হার অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে এ দেশের জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটিতে। অন্যদিকে সম্প্রসারণের পরিবর্তে বনাঞ্চল হচ্ছে সংকুচিত। বলা যায়, বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার চাপে পরিবেশ ধীরে ধীরে বিপন্ন হচ্ছে। যাদের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষার অভাব তাদের পরিবেশজ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে নিয়মিতই পরিবেশের ক্ষতি সাধন করছে এবং সচেতনতার অভাবেই জš§হার বৃদ্ধি পেয়ে সমস্যা প্রকট করে তুলছে। এদিকে গরিবরা শুধু অজ্ঞতার কারণেই পরিবেশ ধ্বংস করে না, তাদের জীবন ও জীবিকার বা অস্তিত্ব রক্ষার জন্যও অনেক সময় বন কেটে জ্বালানি সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, দেশের মোট ভূমির শতকরা ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল থাকা প্রয়োজন কিন্তু আমাদের দেশে হ্রাস পেতে পেতে এসে দাঁড়িয়েছে ৬/৭ শতাংশে। এটা পরিবেশেরে ভারসাম্য রক্ষার জন্য শুধু অপব্যাপ্তিই নয় হুমকি স^রূপ বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। এ বিপন্ন পরিবেশের উন্নয়নও বর্তমান অবস্থান ধরে রাখার জন্য তিনটি উপায় আছে। প্রথমত: বনায়ন, দ্বিতীয়: বনায়ন ও তৃতীয়ত: বনায়নই। দেশের সকল ছোট বড় রাস্তা উপকূলীয় বেড়ি বাঁধ, নদীর দুধারে বাঁধ, গ্রামাঞ্চলের অনাবাদি পতিত জমি, চা বাগানসহ বিভিন্ন কারখানা সংলগ্ন খালি জায়গা, স্কুল কলেজ, মাদরাসা, মসজিদসহ সকল সরকারি-বেসরকারি অফিস আদালতের ও জমিকে বনায়নের আওতায় এনে বর্তমান বনাঞ্চলের সীমানায় বিস্তৃতি ঘটাতে হবে। বৃক্ষায়নের জন্য যতটুকু শ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন এসব রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার। বৃক্ষ চারা রোপণ করলেই লক্ষ্য হাসিল হয় না, এগুলো বেঁচে থেকে পরিপক্ব হলেই পরিবেশের উন্নয়ন সম্ভব।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট।