চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের লিউশেনইউ কয়লাখনিতে ভয়াবহ গ্যাস বিস্ফোরণে অন্তত ৮২ জন শ্রমিক নিহত এবং ১২৮ জনের বেশি আহত হয়েছেন। গত ২২ মে সংঘটিত এই দুর্ঘটনাকে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে প্রাণঘাতী খনি দুর্ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের সময় খনির ভেতরে ২৪৭ জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। প্রাথমিকভাবে নিহতের সংখ্যা ৯০ জন বলা হলেও পরে তদন্ত ও শ্রমিকদের তালিকা যাচাইয়ের পর স্থানীয় প্রশাসন মৃতের সংখ্যা ৮২ জন বলে নিশ্চিত করে।

এই দুর্ঘটনা এমন সময় ঘটল, যখন চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রযুক্তিতে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বিনিয়োগকারী হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে শানসির এই ট্র্যাজেডি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এখনও বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের জন্য ব্যাপকভাবে কয়লার ওপর নির্ভরশীল।

দুর্ঘটনার পর শুরু হওয়া তদন্তে খনিটির পরিচালনাকারী টংঝৌ গ্রুপের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও নিরাপত্তা বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খনির অনুমোদনহীন স্তরে অবৈধভাবে কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছিল। অনেক শ্রমিকের কাছে বাধ্যতামূলক ভূগর্ভস্থ ট্র্যাকিং ডিভাইস ছিল না এবং বিস্ফোরণের দিন মাটির নিচে থাকা বহু শ্রমিকের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধনও ছিল না।

তদন্তে আরও জানা গেছে, খনির ভেতরে এমন কিছু গোপন সুড়ঙ্গ ও বিকল্প পথ ছিল, যেগুলোর তথ্য সরকারি নকশা ও মানচিত্রে উল্লেখ করা হয়নি। এসব গোপন কাঠামোর কারণে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। উদ্ধারকারীরা অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবস্থান নির্ধারণে সমস্যার মুখে পড়েন, ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়।

জিয়াংনান বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্রিন ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হং চেন বলেছেন, বর্তমান প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার যুগে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার কথা নয়। তার মতে, এটি মূলত মানবসৃষ্ট অবহেলা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খনির নিরাপত্তা বিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এত বড় প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব ছিল।

চীনে গত কয়েক দশকে খনি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে ৫ হাজার ৮৫৩ জন শ্রমিক খনি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতেন। ধারাবাহিক সংস্কার, কঠোর তদারকি এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৩৩৩ জনে। তবুও লিউশেনইউ খনির এই বিস্ফোরণ দেখিয়ে দিয়েছে যে কিছু অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অবৈধ কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি।

আঞ্চলিক অর্থনীতি গবেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি শিল্প দুর্ঘটনা নয়; এটি চীনের আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্যেরও প্রতিফলন। বেইজিং, সাংহাই কিংবা শেনঝেনের মতো শহরগুলো যখন উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করছে, তখন শানসির মতো অঞ্চল এখনও কয়লা শিল্পকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। বিকল্প কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতার কারণে বহু শ্রমিক ঝুঁকি জেনেও খনিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন।

শানসি প্রদেশ চীনের মোট কয়লা উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ সরবরাহ করে। দেশটির বিদ্যুৎ খাতের প্রধান জ্বালানি এখনও কয়লা। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার সময়ও কয়লাই চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া সত্ত্বেও কয়লা শিল্প থেকে দ্রুত সরে আসা চীনের জন্য সহজ নয়।

দুর্ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে টংঝৌ গ্রুপের কয়েকজন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে এবং কোম্পানির অন্যান্য খনির কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।

নিহত ও আহত শ্রমিকদের পরিবারের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও দেখা দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও কেন শ্রমিকদের জীবন এখনও অবহেলার শিকার হবে। লিউশেনইউ খনির এই বিস্ফোরণ চীনের শিল্পায়নের সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিক নিরাপত্তাকে সমান গুরুত্ব না দিলে এমন ট্র্যাজেডি ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। এই দুর্ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে, শিল্প নিরাপত্তা, শ্রমিক সুরক্ষা এবং কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা এখন চীনের জন্য একটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ। তথ্যসূত্র : বিবিসি



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews