রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের রমজান এসে গেছে। ইসরাইলি আগ্রাসনে ধ্বসস্তুপের মধ্যে থেকেও পবিত্র এ মাসকে স্বাগত জানাতে হয়েছে ফিলিস্তিনিদের। তাদের একজন মধ্য গাজার বুরেজ শরণার্থী শিবিরের মাইসুন আল-বারবারাউই। তিনি তার তাঁবুতে ইসলামের রমজানকে স্বাগত জানিয়েছেন। জীর্ণ ছাদ থেকে ঝুলছে সাধারণ কিছু সাজসজ্জা, আর কাপড়ের দেয়ালে রঙিন সব আঁকিবুকি—পবিত্র মাসের আগমন উপলক্ষে শিবিরের বাসিন্দারাই এসব তৈরি করেছেন।
আরও পড়ুন
আরও পড়ুন বিহারে প্রকাশ্যে মাছ-মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ

মাইসুন তার ৯ বছর বয়সী ছেলে হাসানকে হাসিমুখে বলেন, ‘আমি তোমার জন্য সাজসজ্জার সরঞ্জাম আর ছোট্ট একটা ফানুস এনেছি’। তবে সেই হাসিতে লেগে ছিল ক্লান্তি, আর ছেলেকে একটি রমজানের ফানুস কিনে দিতে পারার আনন্দ।
পঞ্চাশোর্ধ্ব মাইসুন বলেন বলেন, ‘আমার সামর্থ্য সীমিত, কিন্তু দিনশেষে সন্তানদের হাসিটাই বড় কথা। গত দুই বছর যুদ্ধের কারণে আমাদের মধ্যে যে শোক আর বিষণ্ণতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, আমি চেয়েছি এই সাজসজ্জার মাধ্যমে তা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে।’
৫২ বছর বয়সী মাইসুন সবার কাছে ‘উম্মে মোহাম্মদ’ নামে পরিচিত; তিনি দুই সন্তানের জননী। তিনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলের বয়স ১৫, আর ছোটটির ৯ বছর। ওরাই আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। প্রতিটি দিন যখন ওরা নিরাপদে থাকে, তখন আমি কৃতজ্ঞতা আর আনন্দ অনুভব করি।’
মাইসুন গর্ব মেশানো কণ্ঠে কথাগুলো বললেও তার কথায় ভয়ও লুকিয়ে ছিল—যুদ্ধের সময় সন্তানদের হারানোর আশঙ্কায় যে আতঙ্ক তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করেছে, সে কথাই তিনি বলছিলেন।
গাজার অন্যান্য ফিলিস্তিনিদের মতো মাইসুনের কাছে এবারের রমজান কিছুটা ভিন্ন, কারণ বর্তমানে একটি তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বা যুদ্ধবিরতি চলছে। গত দুই বছরের তুলনায় পরিস্থিতি এখন কিছুটা আলাদা, যখন গাজায় ইসরাইলের ভয়াবহ হামলায় ৭০ সহস্রাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ চরম পর্যায়ে ছিল।
মাইসুন ব্যাখ্যা করেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত নয়। সবাই জানে যুদ্ধ আসলে থামেনি; মাঝে মধ্যেই গোলাবর্ষণ হয়। তবে যুদ্ধের ভয়াবহ সময়ের তুলনায় এখন তীব্রতা কিছুটা কম।
রমজানের প্রথম দিনে আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে রুটি তৈরি এবং খেজুর ও পানি বিতরণের ব্যবস্থায় সাহায্য করার মাধ্যমে মাইসুন শিবিরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নেন।
তিনি বলেন, ‘উদ্বাস্তু অবস্থায় এটি আমাদের কাটানো তৃতীয় রমজান। আমরা আমাদের ঘরবাড়ি, পরিবার এবং অনেক প্রিয়জনকে হারিয়েছি। কিন্তু এই শিবিরে আমাদের প্রতিবেশী ও বন্ধুরা আছে যারা একই ব্যথা ও কষ্টের ভাগীদার। আমরা সবাই সামাজিকভাবে একে অপরকে সাহায্য করতে চাই ‘
যুদ্ধের শুরুতে দক্ষিণ-পূর্ব গাজায় নিজের বাড়ি হারিয়েছিলেন মাইসুন। স্বামী হাসুনা এবং সন্তানদের নিয়ে পালিয়ে এসে বিভিন্ন শিবিরে ঘোরার পর অবশেষে বুরেজে থিতু হন তিনি, যাকে তিনি খুবই শোচনীয় অবস্থা বলে বর্ণনা করেছেন তিনি।
কিছুটা বিরতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা শূন্য থেকে জীবন ও আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছি। রমজান আর ঈদ আসে-যায়, কিন্তু আমাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না।’
সূত্র: আলজাজিরা।