ত্রয়োদশ সাধারণ নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই নির্বাচনি লড়াইয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসে এত বড় জয় কখনো আসেনি। তবে এটিকে নিছক কোনো ব্যক্তি বা দলের জয় ভাবলে ভুল হবে। প্রকারান্তরে এ নির্বাচনের মাধ্যমে জিতেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতাবিরোধী অশুভ চক্রের থাবা থেকে রক্ষা পেয়েছে ১৮ কোটি মানুষের এই মহান জাতি।
সবারই জানা, বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র অবিভাজ্য। গণতন্ত্রের পথ ধরেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের গণরায় ঠেকানোর চেষ্টা করেছিল। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে গণহত্যার আশ্রয় নিয়েছিল। সে প্রেক্ষাপটে ঘোষিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তরুণ মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করেন দেশের স্বাধীনতা।
পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধও শুরু হয়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। জুলাই গণ অভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য দেশবাসীর দেড় দশকের চলমান আন্দোলন-সংগ্রামের চূড়ান্ত অধ্যায়। দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির শত শত কর্মী হত্যা গুমের শিকার হয়েছে। লাখ লাখ মামলার শিকার হয়েছে বিএনপির নেতা-কর্মীরা। জুলাই আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন বিএনপির অবিসংবাদিত নেতা তারেক রহমান। কিন্তু শেখ হাসিনার পৌনে ষোলো বছরে যারা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কোলে আশ্রয় নিয়ে অপকর্ম করে বেড়িয়েছে, তারা জুলাই গণ অভ্যুত্থানের ফসল হাইজাক করার অপচেষ্টায় মেতে ওঠে। গণমানুষের দল বিএনপির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ অপপ্রচার চালিয়ে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালায়। সদ্য সমাপ্ত সংসদ নির্বাচনের রায়ে দেশবাসী তাদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে।
জুলাই গণ অভ্যুত্থানের দীর্ঘ ১৬ মাস পর গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান দেশে ফিরে আসেন। দীর্ঘ ১৮ বছর যাঁকে ঘিরে অপেক্ষা, আকুতি, অভিমান আর প্রত্যাশা, অবশেষে সেই নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রাজনীতিকে পাল্টে দেয়। তার স্বদেশে আগমন উপলক্ষে অর্ধ কোটি মানুষ সমবেত হয় প্রিয় নেতাকে দেখার জন্য। ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিছক কোনো ব্যক্তিগত বা দলীয় ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক আবেগঘন, অর্থবহ অধ্যায়। নেতার আগমনে। বিএনপির সারা দেশের নেতা-কর্মীদের মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়। তাঁর প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়েই বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি সুসংহত হয় জোরালোভাবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের লড়াইয়ে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় বিএনপি। তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান। কিন্তু তিনি কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে নেতা হননি। রাজনীতির প্রতিটি ধাপে তিনি এগিয়েছেন অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও সাংগঠনিক দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে।
বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ১৯৮৯ সালে। নব্বইয়ের গণ অভ্যুত্থানে এরশাদের পতন হয়। স্বৈরাচারের কবল থেকে গণতন্ত্র মুক্তি পায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয় শহীদ জিয়ার দল। বিএনপি সরকার গঠন করলে মায়ের পাশে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তারেক রহমান। দেশজুড়ে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপিকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তিনি অসামান্য অবদান রাখেন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির বিশাল জয়ের পেছনে তাঁর সাংগঠনিক ভূমিকা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত হয়। জাতীয়তাবাদী শক্তির রাজনীতিতে তারেক রহমানের উত্থান তাঁকে অশুভ মহলের ষড়যন্ত্রের টার্গেটে পরিণত করে। ২০০৭ সালের এক-এগারো-পরবর্তী সেনাসমর্থিত সরকারের সময় ভিত্তিহীন অভিযোগ এনে মামলা সাজিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিমান্ডের নামে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। মেরুদণ্ড, পাঁজর ও হাঁটুতে গুরুতর আঘাতে তিনি প্রায় পঙ্গুত্বের পর্যায়ে পৌঁছান। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাঁর মমতাময়ী মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোকে। তারেক রহমান ১৮ বছর প্রবাস জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু তিনি কখনো হার মানেনি। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল জয় সে দৃঢ়চেতা মনোভাবেরই ফসল।
জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। তাদের প্রতি দেশবাসীর প্রত্যাশা আকাশছোঁয়া। নতুন সরকার এমন একসময় দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে যখন দেশের অর্থনীতি আইসিইউতে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের প্রথম এবং প্রধান কর্তব্য হবে দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন করা। দেশে ব্যবসাবাণিজ্যের পরিবেশ সৃষ্টি করা। মব সন্ত্রাসীদের হাতে ১৮ মাস ধরে জিম্মি থাকা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের পাশে দাঁড়ানো।
তাদের জন্য সাহস জোগানো। যাতে তারা নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ নিতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আভাস দেওয়া হয়েছে, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে পারলে বিনিয়োগের দুয়ার উন্মোচিত হবে। তবে নতুন বন্দোবস্তে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না এলে অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়বে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় প্রায় দুই বছর ধরে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নির্বাচনের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরলে সে দুরবস্থার ইতি ঘটবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে গ্যাস, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে জরুরিভাবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে বিনিয়োগের সহজ সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। নতুন সরকারের জন্য স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করাও জরুরি। সেজন্য গণতন্ত্রের পথে তাদের হাঁটতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার পথ থেকে দূরে থাকতে হবে সচেতনভাবে। রাজনীতি ও অর্থনীতি একে অপরের পরিপূরক। অসুস্থ রাজনীতি অর্থনীতিকেও পর্যুদস্ত করে। সে বিষয়টি মনে রেখে সাচ্চা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে বিএনপি সরকারকে। অনুসরণ করতে হবে শহীদ জিয়া ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুসৃত নীতিমালা।
পাদটিকা : লেখাটি শেষ করছি ফেসবুকে কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশের একজন সাবেক ছাত্রনেতা মঞ্জুরে খোদা টরিকের স্ট্যাটাস উল্লেখ করে। টরিক বাম ছাত্রসংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি। তিনি লিখেছেন, নির্বাচন নিয়ে আমার অনেক কথা আছে। তার মধ্যে প্রধান বিষয় ছিল এই নির্বাচন যদি অন্তর্ভুক্তমূলক হতো তাহলে তা আরও বেশি গ্রহণযোগ্য হতো। এমন আরও অনেক বিষয় আছে কিন্তু এবারের নির্বাচনে আমার যে বিষয়টি সবচেয়ে ভালো লেগেছে, সেটা হচ্ছে তারেক রহমান তাঁর পুরো পরিবার নিয়ে মাঠে থেকেছেন। বিশেষ করে তাঁর একমাত্র কন্যা জাইমা রহমানের সক্রিয় অংশগ্রহণ আমার দৃষ্টি কেড়েছে।
আমাদের দেশে একটি বিষয় প্রচলিত আছে তা হচ্ছে, নেতারা তাঁদের সন্তানদের ‘সরাসরি’ রাজনীতিতে নিয়ে আসেন না, তাঁদের কোনো উন্নত দেশে নিরাপদে রাখেন, বিলাসবহুল জীবনের ব্যবস্থা করেন। সেদিক থেকে তারেক রহমানের পরিবারের বিষয়টি ব্যতিক্রম।
লেখক : বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক