ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধাটি আয় বা অংকের হিসাব নয়, বরং আমাদের অবদমিত আবেগ এবং তাৎক্ষণিক তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা। খরচের ব্যাপারে আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করা একটি দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যেখানে জয়ী হতে হলে প্রথমেই বুঝতে হবে কেন আমরা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা করি। বিজ্ঞাপনের চাকচিক্য আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম জীবনযাত্রার প্রদর্শন আমাদের অবচেতনে এক ধরণের অভাববোধ তৈরি করে, যা মেটানোর জন্য আমরা কেনাকাটাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করি। একে অনেক সময় রিটেইল থেরাপি বলা হয়, যেখানে মন খারাপ থাকলে বা একঘেয়েমি অনুভব করলে মানুষ নতুন কিছু কিনে সাময়িক আনন্দ খোঁজে। কিন্তু এই আনন্দ স্থায়ী হয় না, বরং মাসের শেষে যখন ক্রেডিট কার্ডের বিল বা খালি মানিব্যাগ সামনে আসে, তখন সেই আনন্দ তীব্র দুশ্চিন্তায় রূপ নেয়। আবেগকে জয় করার প্রথম ধাপ হলো কেনাকাটার আগে নিজেকে অন্তত চব্বিশ ঘণ্টা সময় দেওয়া। কোনো একটি পণ্য দেখে খুব পছন্দ হলে বা সেটি ছাড়া জীবন চলবে না মনে হলে তখনই সেটি না কিনে একদিন অপেক্ষা করলে দেখা যায় সেই তীব্র আকর্ষণ অনেকটা কমে গেছে। একে বলা হয় কুলিং অফ পিরিয়ড, যা মস্তিষ্কের লজিক্যাল অংশকে কাজ করার সুযোগ দেয় এবং তাৎক্ষণিক আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে রক্ষা করে।

আমাদের কেনাকাটার অভ্যাসের পেছনে অনেক সময় একাকীত্ব, রাগ বা হীনম্মন্যতা কাজ করে। যখন আমরা দেখি আমাদের চারপাশের মানুষ দামী গ্যাজেট বা পোশাক ব্যবহার করছে, তখন আমাদের মনে এক ধরণের ভয় কাজ করে যে আমরা হয়তো পিছিয়ে পড়ছি। এই ভয় বা ফোমো (FOMO) আমাদের পকেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অন্যের জীবনের সাথে নিজের তুলনা করা বন্ধ করা জরুরি। মনে রাখতে হবে যে প্রতিটি মানুষের আর্থিক সক্ষমতা এবং জীবনের লক্ষ্য আলাদা। অন্যের দেখানো পথে চলতে গিয়ে নিজের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তায় ফেলা কোনো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হতে পারে না। কেনাকাটা করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে যে এই জিনিসটি কি আমার সত্যিই প্রয়োজন নাকি আমি কেবল অন্যকে দেখানোর জন্য বা সাময়িক উত্তেজনার জন্য এটি কিনছি। যদি উত্তরটি হয় কেবল ভালো লাগা, তবে বুঝতে হবে এটি একটি আবেগীয় খরচ যা এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। বর্তমানের এই যুদ্ধকালীন বা মন্দার বাজারে প্রতিটি পয়সা যেখানে গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে আবেগের বশবর্তী হয়ে সঞ্চয় বিসর্জন দেওয়া হবে এক ধরণের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

যখন আপনি আপনার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তখন অর্থ আপনার দাসে পরিণত হয়। বর্তমানের এই অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেখানে তেলের দাম থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিসের মূল্য ক্রমবর্ধমান, সেখানে নিজেকে সংযত রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি খরচ করার আগে ভাবুন আপনি আপনার পরিশ্রমের সময়টি ব্যয় করছেন, কেবল কাগজ বা টাকা নয়। নিজের আবেগকে জয় করে মিতব্যয়ী হওয়ার মাধ্যমেই আপনি আপনার পরিবারকে যেকোনো আর্থিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদ রাখতে পারবেন।

আবেগ নিয়ন্ত্রণের আরেকটি বড় কৌশল হলো কেনাকাটার সময় সরাসরি নগদ টাকা ব্যবহার করা। যখন আমরা ডিজিটাল পেমেন্ট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করি, তখন টাকা খরচ হওয়ার বাস্তব অনুভূতি আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছায় না। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক খেলা যেখানে কার্ড সোয়াইপ করাকে কেবল একটি প্লাস্টিক ব্যবহারের মতো মনে হয়। কিন্তু যখন হাত থেকে সরাসরি নোট বেরিয়ে যায়, তখন আমাদের মস্তিষ্ক ক্ষতির একটি সংকেত পায় যা আমাদের অতিরিক্ত খরচ করা থেকে বিরত রাখে। মাসের শুরুতেই যদি খরচের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া যায় এবং সেই টাকাটি আলাদা খামে ভরে রাখা যায়, তবে আবেগের চাপে পড়ে সীমার বাইরে যাওয়ার সুযোগ কমে আসে। এছাড়া বিপণিবিতান বা অনলাইন শপিং অ্যাপগুলোতে অকারণে ঘোরাঘুরি করা বন্ধ করতে হবে। আমরা অনেক সময় কেবল সময় কাটানোর জন্য এসব সাইটে যাই এবং কোনো একটি আকর্ষণীয় অফার বা ডিসকাউন্ট দেখে প্রলুব্ধ হই। মনে রাখতে হবে যে ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্টে কোনো অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা মানে ৫০ শতাংশ সাশ্রয় নয়, বরং ১০০ শতাংশ অপচয়। কারণ সেই জিনিসটি না কিনলে আপনার পুরো টাকাটাই বেঁচে যেত।

মানসিক প্রশান্তির জন্য কেনাকাটার বিকল্প খুঁজতে হবে। যদি মন খারাপ থাকলে কিছু কিনতে ইচ্ছে করে, তবে সেই সময়টুকু হাঁটাহাঁটি করা, বই পড়া বা প্রিয়জনের সাথে কথা বলে কাটানো যেতে পারে। আবেগীয় শূন্যতা পূরণ করার জন্য জড় পদার্থের আশ্রয় নেওয়া একটি ভুল অভ্যাস যা কেবল আর্থিক ক্ষতিই বাড়ায় না, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বড় কোনো উৎসব বা সামাজিক অনুষ্ঠানে খরচের ক্ষেত্রেও আবেগ কাজ করে। আমরা অনেক সময় কেবল আভিজাত্য বজায় রাখতে গিয়ে সাধ্যের অতিরিক্ত খরচ করি। সামাজিকতা রক্ষা করা প্রয়োজন ঠিকই, কিন্তু তা যদি আপনার আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়, তবে সেই সামাজিকতা আপনাকে বিপদে ফেলবে। নিজের আর্থিক সীমানা বা বাউন্ডারি নির্ধারণ করা শিখতে হবে এবং প্রয়োজনে মানুষকে 'না' বলার সাহস অর্জন করতে হবে। বিনয় ও দৃঢ়তার সাথে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নেওয়া কোনো লজ্জার বিষয় নয়, বরং এটি চরম আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।

দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বা স্বপ্নকে সবসময় চোখের সামনে রাখা আবেগকে বশ করার অন্যতম সেরা উপায়। আপনার যদি একটি সুন্দর বাড়ি করার, সন্তানদের উন্নত শিক্ষার বা অবসরের পর নিশ্চিত জীবনের স্বপ্ন থাকে, তবে সেই স্বপ্নগুলো আপনাকে বর্তমানের ছোট ছোট প্রলোভন থেকে দূরে রাখবে। যখনই কোনো অপ্রয়োজনীয় খরচের ইচ্ছা জাগবে, তখন ভাবুন এই টাকাটি জমিয়ে রাখলে আপনি আপনার বড় স্বপ্নের কতটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবেন। আর্থিক স্বাধীনতা কেবল অনেক টাকা থাকার নাম নয়, বরং নিজের খরচের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকার নাম। আবেগ যখন আপনার মানিব্যাগ নিয়ন্ত্রণ করে, তখন আপনি অর্থের দাস হয়ে পড়েন। আর যখন আপনি আপনার আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তখন অর্থ আপনার দাসে পরিণত হয়। বর্তমানের এই অস্থিতিশীল বিশ্ব পরিস্থিতিতে যেখানে তেলের দাম থেকে শুরু করে প্রতিটি জিনিসের মূল্য ক্রমবর্ধমান, সেখানে নিজেকে সংযত রাখা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। প্রতিটি খরচ করার আগে ভাবুন আপনি আপনার পরিশ্রমের সময়টি ব্যয় করছেন, কেবল কাগজ বা টাকা নয়। নিজের আবেগকে জয় করে মিতব্যয়ী হওয়ার মাধ্যমেই আপনি আপনার পরিবারকে যেকোনো আর্থিক দুর্যোগ থেকে নিরাপদ রাখতে পারবেন। ধৈর্য এবং আত্মসংযমই হবে আপনার আর্থিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

লেখক : কর্পোরেট ট্রেইনার,ফাইন্যান্স অ্যান্ড বিজনেস স্ট্রাটেজিস্ট, প্রফেসর অব প্র্যাকটিস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

এইচআর/এএসএম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews