বিদায়ের শহর গ্লাসগো ধীরে ধীরে খালি হয়ে যাচ্ছে। অ্যাথলেট ভিলেজের করিডরে এখন শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। কোথাও স্যুটকেসের চাকা গড়ানোর শব্দ, কোথাও জাতীয় দলের ব্যাগ গুছিয়ে নেওয়ার তাড়া। কয়েক দিন আগেও যারা একসঙ্গে এসেছিলেন, আজ তারা একে একে হাঁটছেন আলাদা পথে।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স ও বক্সিং দল আগামীকাল সোমবার ফিরছে দেশে। এর আগে সাঁতার ও জিমন্যাস্টিক্স দলও ফিরে গেছে। কিন্তু গ্লাসগো থেকে বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের ফেরার চিত্র ভিন্ন। যাদের দায়িত্ব ছিল দলের সঙ্গে থাকা, খেলোয়াড়দের পাশে থাকা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সমন্বয় করা তাদের কেউ কেউ আগেই চলে গেছেন, কেউ আবার দলের সঙ্গে না থেকে থাকছেন অন্যত্র।

একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর শুধু মাঠের কয়েক সেকেন্ডের দৌড়, তিন রাউন্ডের বক্সিং কিংবা কয়েক মিনিটের পারফরম্যান্সে শেষ হয় না। একজন অ্যাথলেট যখন ট্র্যাকে নামেন বা রিংয়ে লড়াই করেন, তার পেছনে থাকে বিশাল একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো। সেই কাঠামোর কেন্দ্রে থাকেন কর্মকর্তারা। গ্লাসগোতে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থাপনা নিয়েই এখন উঠছে প্রশ্ন।

অ্যাথলেটিক্স দলের ম্যানেজার শাহ আলম ছিলেন মাত্র দুই দিন। এরপরই তিনি গ্লাসগো ছেড়ে চলে যান। তার আগেভাগে চলে যাওয়া নিয়ে দলের ভেতরে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। কারণ তখনও শেষ হয়নি গেমস, শেষ হয়নি দলের সব দায়িত্ব। সেই দায়িত্বের মাঝপথেই তার বিদায় নেওয়া নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

আরও বিস্ময়কর হলো, দেশে ফিরেই একজন অ্যাথলেটকে সঙ্গে নিয়ে তাকে উড়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রে, বিশ্ব জুনিয়র অ্যাথলেটিক্সে যোগ দিতে। যেন আধুনিক যুগের ইবনে বতুতা।

দলনেতা সাইফুল ইসলামের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। একটি দলের দলনেতার দায়িত্ব শুধু তালিকায় নাম থাকা নয়। তিনি দলের শেষ অভিভাবক। গেমসের সমাপনী অনুষ্ঠানের আগেই তিনি চলে গেছেন।

একটি দলের বিদায়ের শেষ মুহূর্তে, সবাইকে নিয়ে দাঁড়ানোর সময়ে দলনেতার অনুপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাঁতার দলের ম্যানেজার আতিকুর রহমানও গ্লাসগোয় রয়ে গেছেন। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাথলেট অ্যাটাশে ও মহাপরিচালক শেফাউল কবিরের দায়িত্ব ছিল দলের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং খেলোয়াড়দের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। তিনিও অ্যাথলেটদের সঙ্গে ফিরছেন না। আরও কয়েক দিন তিনি ইংল্যান্ডে থাকবেন।

দলের অন্য কর্মকর্তারাও ছড়িয়ে পড়েছেন ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তে। কেউ লন্ডনে, কেউ ম্যানচেস্টারে, কেউ বার্মিংহামে। কেউ ফিরবেন তিন দিন পর, কেউ চার দিন পর, কেউ আবার পাঁচ দিন পর।

গ্লাসগো সবার জন্য এক নয়। কারও কাছে এটি শেষ গন্তব্য, কারও কাছে এটি কেবল আরেকটি স্টেশন। অ্যাথলেট ভিলেজের বাংলাদেশ অংশে গত রাতেও ছিল ব্যাগ গোছানোর ব্যস্ততা। জাতীয় দলের জার্সি যত্ন করে ভাঁজ করে রাখা, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড গুছিয়ে নেওয়া, শেষবারের মতো সতীর্থদের সঙ্গে ছবি তোলা—সবকিছুতেই ছিল এক ধরনের নীরব আবেগ। কয়েক সপ্তাহ আগে যে মুখগুলো একসঙ্গে এসেছিল, আজ তারা একে একে আলাদা হয়ে যাচ্ছে।

কারও গন্তব্য ঢাকা। কারও নিউইয়র্ক। কারও লন্ডন। কারও আবার অন্য কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা অবশ্য নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ ব্যক্তিগত সেরা করেছেন, কেউ কঠিন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়েছেন, কেউ পদকের কাছাকাছি গিয়েও থেমেছেন। তাদের চোখে এখনও আগামী দিনের স্বপ্ন। ক্রীড়াবিদদের স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে শুধু মাঠের লড়াই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সঠিক ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজন দায়িত্বশীল নেতৃত্ব।

গ্লাসগোর আলো নিভে গেছে। স্টেডিয়ামের দরজা বন্ধ হয়েছে। অ্যাথলেটরা ফিরছেন ঘরে। এবার সময় এসেছে আরেকটি হিসাবের শুধু পদকের নয়, দায়িত্বেরও। শেষ পর্যন্ত মাঠে খেলেন অ্যাথলেটরা। তাদের পথটা মসৃণ করার দায়িত্ব থাকে কর্মকর্তাদের।

গ্লাসগো তাই একটি প্রশ্ন রেখে গেল দল ফিরল, কিন্তু দায়িত্ব কি ফিরল সঙ্গে?



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews