দিন দিন আমাদের দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা কমছে কিন্তু পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নির্মাতার সংখ্যা। বিশেষ করে গত পনেরো-বিশ বছরে নির্মাতার এই সংখ্যাটা অন্তত পঞ্চাশ গুন হয়ে গেছে। অনেক মেধাবী নতুন মুখ চোখে পড়ে অহরহ, কোনো কোনো কাজের এক ঝলক দেখলেই প্রতিভা টের পাওয়া যায়। এদিকে চলচ্চিত্রের টেকনিক্যাল কাজেও তৈরি হয়ে উঠেছে দক্ষ জনবল। টিভি নাটক, ওয়েব সিরিজ বা বিজ্ঞাপনে কাজ করছেন তারা, এমনকি ইউটিউব কন্টেন্টও বানাচ্ছেন কেউ কেউ। অথচ এরা সবাই সিনেমা বানানোর স্বপ্ন নিয়েই এ জগতে পা রেখেছিলেন। কেউ কেউ সাহসের অভাবে, কেউ সুযোগ না পেয়ে স্বপ্ন থেকে ছিটকে পড়েছেন অনেক দূরে। কিন্তু বড় পর্দার মোহ থেকে আদৌ তারা মুক্ত হয়েছেন বলে মনে হয় না।
আবার যারা অনেক সাধ্য সাধনা করে সিনেমা বানিয়ে ফেলেছেন, সিনেমা মুক্তি দিতে গিয়ে তারাও পড়েছেন বিপাকে। ফর্মুলার বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে নির্মিত সিনেমার ক্ষেত্রে সমস্যাটা সবচেয়ে প্রকট। একে তো বিশ কোটি মানুষের এই দেশে বছরব্যাপী চালু থাকে এমন সিনেমাহলের সংখ্যা এখন ষাটের বেশি নয় তার ওপর বাণিজ্যিক উপাদান নেই এমন সিনেমার ব্যাপারে স্বাভাবিকভাবেই হল মালিকদের আগ্রহ থাকে না। কেউ কেউ দয়া পরবশ হয়ে চালাতে রাজী হলেও এই সিনেমাগুলো মুক্তির পর দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত আর গড়ায় না। তাই একটা সিনেমার প্রতি দর্শকের আগ্রহ তৈরি হতে না হতেই হল থেকে তা বিদায় হয়ে যায়। ফলে স্বাধীন চলচ্চিত্র যেমন বাণিজ্যিকভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে আবার একটা বড় সংখ্যক দর্শকও কাঙ্ক্ষিত সিনেমা থেকে বঞ্চিত হয়। দিনশেষে নতুন রুচির চলচ্চিত্র এবং তার উপযোগী দর্শক তৈরির প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এ কারণে সিনেমা নির্মাণ যতটা জরুরি সিনেমা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করাটাও ততটাই গুরুত্বের দাবীদার।
আজকের দুনিয়ায় সিনেমা দেখার বা দেখানোর হাজারটা উপায় আছে। তবে প্রেক্ষাগৃহের অন্ধকারে অনেক মানুষের সাথে বসে সিনেমা দেখার প্রাচীনতম উপায়ের সাথে অন্যগুলোর তুলনা টানার মানে হয় না। চলচ্চিত্র বানানোই হয় প্রেক্ষাগৃহের জন্য, তা না হলে ঘরে বসে একা একা বিনোদন উপভোগের চরম উৎকর্ষের সময়ে এসেও ক্রিস্টোফার নোলান কেনো আইম্যাক্স-আইম্যাক্স করে হন্যে হন? অথবা প্রতিবেশী দেশের জনগণের হাতে কি স্মার্ট ফোন নেই? সেখানে কেনো সিনেমাহলগুলো এখনও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে না? সিনেমার লার্জার দ্যান লাইফ হয়ে ওঠার জাদুটাই লুকিয়ে আছে অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহ আর সেখানে বসে থাকা সারি সারি সহ-দর্শকের রহস্যের মাঝে। বাহান্ন ইঞ্চি টিভি পর্দা কিংবা মোবাইল ফোনের সাত ইঞ্চি স্ক্রিন তার কতটাই আর ধরতে পারে?
যে কোনো সিনেমারই একটা নির্দিষ্ট দর্শকশ্রেণি আছে, সেই সঠিক দর্শকের কাছে পৌঁছানোটাই মূল চ্যালেঞ্জ। ইন্ডাস্ট্রি হিসাবে যারা ফিল্মকে বিবেচনা করেন তারা একটা প্রতিষ্ঠিত ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্কের সহায়তা নিতে পারেন কিন্তু একজন নবীন ও স্বাধীন নির্মাতা সেখানে পৌঁছাতেই হিমশিম খেয়ে যান। আবার প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্ককেও নিজস্ব ব্যবসায়িক মডেলে চলতে হয় বলে চাইলেই তারা ঝুঁকি নিতে পারেন না। সব মিলিয়ে স্বাধীন চলচ্চিত্র আর তার দর্শকের মাঝের এই সংযোগহীনতা অমীমাংসিতই থেকে যায়। এই সমস্যা যে কেবল বাংলাদেশেই তা নয় বরং দুনিয়ার তাবৎ স্বাধীন নির্মাতার চিরন্তন সমস্যা এটা। দর্শকের সাথে তাদের সংযোগের সবচেয়ে প্রচলিত পথ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। কিন্তু দেশের দর্শকের বেলায় কী হবে? সারা দুনিয়া কাঁপিয়ে এসে নিজের দেশে অজ্ঞাতনামা হয়ে থাকতে চান কয়জন নির্মাতা?
মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল বা তারেক মাসুদের মতো আমাদের পূর্বসূরী স্বাধীন নির্মাতারা একসময় নিজেরাই নিজেদের চলচ্চিত্র ফেরী করে বেড়িয়েছেন জেলায় জেলায়। বলা চলে তারা সফলও হয়েছিলেন। দর্শক তৈরি করতে পেরেছিলেন, নতুন প্রজন্মকে চলচ্চিত্রে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। কিন্ত এই মহাযজ্ঞের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিক হচ্ছে তারা নিজেদের মেধা এবং সময়ের অনেকটাই ব্যয় করেছিলেন এমন কিছুর পেছেনে যা তাদের মূল কাজ নয়। তবে বিকল্প প্রদর্শনী ছাড়া স্বাধীন নির্মাতাদের নিজেদের দর্শকশ্রেণি তৈরি করার ভিন্ন কোন পথ আপাতত খোলা দেখছি না। আবার এই দায়িত্বটা নির্মাতাকে সরাসরি নিজের কাঁধে নিতে না হলে কিন্তু পরীক্ষিত এইপথে হাঁটাই যায়।
নতুন নতুন সিনেমাহল তৈরি করা যেমন সহজসাধ্য নয় আবার স্বাধীন চলচ্চিত্রের সেখানে ঠাঁই পাওয়াটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং। বরং দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা সরকারি-বেসরকারি অডিটোরিয়াম বা হলরুমকে বিকল্প প্রদর্শনীর নিয়মিত কেন্দ্র হিসাবে ব্যবহারের চিন্তা করছিলাম আমার প্রথম চলচ্চিত্র “আম-কাঁঠালের ছুটি” মুক্তি দেওয়ার আগে থেকেই। এ যাবত এই পদ্ধতিতে সিনেমাটির অনেকগুলো প্রদর্শনী হয়েছে এবং ব্যবসায়িক বিবেচনায়ও এই প্রকল্প ছিল যথেষ্ট সফল। কিন্তু সমস্যা হলো এর আগে বা পরে এই জায়গাগুলোতে আর কোন চলচ্চিত্র প্রদর্শনী না হওয়ায় সেগুলো আর ঠিক সিনেমা প্রদর্শনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারেনি। আবার ধারাবাহিকতার অভাবে বিচ্ছিন্নভাবে হলেও প্রদর্শনী ব্যবস্থাপনার যে দল আমি তৈরি করেছিলাম তাও ভেঙে গেছে অল্পসময়ের মধ্যে।
নিজের কোনো দায়-দায়িত্ব ছাড়াই সিনেমাটির বেশ কয়েকটি শো হয়েছে এবং কাকতালীয়ভাবে সবগুলোর সাথেই কোনো না কোনোভাবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির যোগাযোগ আছে। দর্শকসংখ্যা হিসেব করলে প্রতিটি শো ছিল মন ভালো করে দেওয়ার মতো। ‘আম-কাঁঠালের ছুটি’র প্রিমিয়ার হয়েছিল জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে। তারপর হল থেকে চলে যাওয়ার পর প্রথম শো-টিও ছিল “আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উৎসব বাংলাদেশ”-এর উদ্বোধনী চলচ্চিত্র হিসাবে একই মিলনায়তনে। শেষেরটি ছিল বন্যার্তদের জন্য তহবিল গঠনের লক্ষ্যে “ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারস কমিউনিটি” আয়োজিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে সোহারাওয়ার্দী উদ্যান মুক্ত মঞ্চে। মাঝে দেশের ৬৪টি জেলার শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে একযোগে সিনেমাটি প্রদর্শিত হয় একাডেমির আয়োজনে “গণজাগরণের চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৩”-এর অংশ হিসাবে। এই উৎসবেরকল্যাণেই বুঝতে পারি আমি এতদিন বিকল্প প্রদর্শনীর যে নেটওয়ার্কের কথা ভাবছিলাম বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তার পাটাতন তৈরি করেই রেখেছে, কেবল এটাকে নিয়মিত করতে হবে। একটু উদ্যোগ নিলেই শিল্পকলা একাডেমির দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা এই মিলনায়তনগুলো হয়ে উঠতে পারে এক একটি বিকল্প সিনেমা হল।
তবে উৎসব চলাকালীন কিছুটা হোঁচট খেলাম। আর দশটা সরকারি আয়োজনের মতোই এখানে সবকিছুই হয়েছে যান্ত্রিকভাবে, স্রেফ করার জন্য করা, কোন প্রাণ ছিল না। ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর অবস্থা ছিল আরও খারাপ। উৎসব চলছিল উৎসবের মতো কিন্তু অনেক জায়গাতেই কোন দর্শক ছিল না, তা নিয়ে আবার কারও মাথাব্যথাও ছিল না। তবে মোটের ওপর আমি আশাবাদী ছিলাম, একাডেমি দায়িত্ব নিয়ে আর একটু গুছিয়ে কিছু উদ্যোগ নিলে এটা একটা চমৎকার উৎসব হতেই পারত। এমনকি বছরব্যাপী সারাদেশে এই আয়োজনটা চালু রাখা যায় কি না এমন একটা প্রস্তাবও করতে চেয়েছিলাম। বিভিন্ন ব্যস্ততায় শেষ পর্যন্ত আর তা হয়ে ওঠেনি।
উম্মুক্ত মঞ্চের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর পর পুরানো চিন্তা আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কাকতালীয়ভাবে কিছুদিনের মধ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত মহাপরিচালক নিজেই চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের সাথে একটা মতবিনিময় সভা ডাকেন। একাডেমি কীভাবে চলচ্চিত্রের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করতে পারে তা ছিল সভার বিষয়। সেখানেই জানলাম চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমিতে আলাদা বিভাগ তৈরির পরিকল্পনা আছে। সভা শেষে যার যার প্রস্তাবনা লিখিতভাবে জানাতে বলা হলো। শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনগুলোকে বিকল্প সিনেমাহল হিসাবে ব্যবহার করার ব্যাপারে আমার ভাসাভাসা চিন্তাগুলো একটু গুছিয়ে নেওয়ার একটা উপলক্ষ্য পাওয়া গেল এই সুবাদে।
খুব উচ্চাভিলাষী কোন প্রস্তাব নয় বরং চাইলেই খুব সীমিত আয়োজনে যখন-তখন শুরু করা যায় এমন একটা প্রস্তাব, পরীক্ষামূলকভাবে কিছুদিন চালিয়ে গেলে উত্তরোত্তর এর শ্রী এবং ব্যাপ্তি বাড়ানোও এমন কঠিন কোন কাজ নয়।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি দেশের ৬৪টি জেলায় তার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বহু বছর ধরে। একাডেমির প্রায় প্রতিটি শাখারই আছে নিজস্ব অডিটোরিয়াম বা উম্মুক্ত মঞ্চ। ন্যুনতম একটা মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর এবং কাজ চালানোর মতো সাউন্ড সিস্টেমও আছে সব শাখায়। দেশব্যাপী চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজনের অভিজ্ঞতা থাকায়, নিয়মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং জনবলও তাদের আছে। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে স্বাধীন চলচ্চিত্রগুলোকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এমন কোন কঠিন কাজ নয়। নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে একটা সাংস্কৃতিক আন্দোলনের জন্ম দেওয়া খুবই সম্ভব যা গণমানুষের সাথে শিল্পের একধরনের সংযোগ তৈরি করবে আর দর্শক রুচিতে তার ছাপ পড়বে নিশ্চিতভাবেই।
গণজাগরণের চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৩-এর অংশ হিসাবে ‘আম কাঁঠালের ছুটি’ প্রদর্শনীর সময় একাডেমির কিছু দুর্বলতা আমার নজরে এসেছে যেগুলোর সমাধান ছাড়া সামনে এগুনো স্রেফ দিবাস্বপ্ন:
১. পাইরেসি সংক্রান্ত উদ্বেগ: উৎসবে অংশ নেওয়া চলচ্চিত্রগুলোর ডিজিটাল কপির পাইরেসি সুরক্ষা সম্পর্কে একাডেমির ন্যূনতম সচেতনতা ছিল না যা একজন প্রযোজকের জন্য যথেষ্ঠই উদ্বেগের ব্যাপার।
২. উৎসাহের অভাব: একাডেমির জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চলচ্চিত্র বা উৎসবের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাননি, তারা কেবল দায়সারাভাবে কেন্দ্রীয় দপ্তরের নির্দেশ অনুসরণ করেছেন।
৩. লক্ষ্যের অভাব: চলচ্চিত্র উৎসবটি আয়োজন করা হয়েছে স্রেফ একাডেমির বাৎসরিক একটা রুটিন কাজ হিসাবে, এর কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে হয়নি।
৪. অপ্রশিক্ষিত জনবল: কার্যকরভাবে উৎসব ব্যবস্থাপনা বা চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর কারিগরি ব্যাপারে জেলা পর্যায়ের কর্মীরা যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত বা প্রণোদিত না থাকায় স্ক্রিনিংয়ের কারিগরি মান সন্তোষজনক ছিল না।
৫. পর্যবেক্ষণের অভাব: চলচ্চিত্র প্রদর্শনী কতটা সফল হলো তা পর্যবেক্ষণ কিংবা দর্শক সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের ব্যাপারে কারও কোন চেষ্টাই ছিল না।
৬. প্রচার বাজেট ঘাটতি: জেলা শাখাগুলোতে স্থানীয়ভাবে প্রচার-প্রচারণা ও দর্শকদের সম্পৃক্ত করার জন্য যথেষ্ট অর্থ বরাদ্দ ছিল না।
৭. স্থানীয় সংগঠনের সম্পৃক্ততা: স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ফিল্ম সোসাইটিগুলোকে সম্পৃক্ত না করায় সম্ভাবনাময় এই উৎসবটি যথেষ্ঠ ফলপ্রসূ হয়নি।
৮. চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অন্তর্ভুক্তি: ঢাকার বাইরের কোনো জেলার প্রদর্শনীতে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উপস্থিতি ছিল না, ফলে তারা আয়োজনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠতে পারেননি।
৯. সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজন: উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসাবে চলচ্চিত্র সংক্রান্ত সেমিনার বা কর্মশালা আয়োজন না করায় প্রান্তিক এলাকাগুলোতে দর্শক রুচি তৈরি এবং সেখান থেকে নতুন নতুন চলচ্চিত্র নির্মাতা উঠে আসার সুযোগ নষ্ট হয়েছে।
১০. প্রকাশনার ঘাটতি: প্রদর্শনীর জন্য বাছাইকৃত চলচ্চিত্রগুলোর পরিচিতিমূলক কোনো ফ্লাইয়ার বা ব্রোশিওর জাতীয় প্রকাশনা ছিল না, পোস্টার বা স্ক্রিনিং শিডিউলের প্রিন্ট কপিও ছিল অপ্রতুল। ঢাকার বাইরে মিডিয়া কভারেজ একেবারেই ছিল না এমনকি সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ব টিভি চ্যানেল “বাংলাদেশ টেলিভিশন”-কে সেই অর্থে ব্যবহার করা হয়নি ।
উল্লেখিত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে এবং একাডেমির সম্ভাবনার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আমার কিছু প্রস্তাব আছে:
১. নিয়মিত প্রদর্শনী শিডিউল: একাডেমির বার্ষিক ক্যালেন্ডারে চলচ্চিত্রের জন্য আলাদা শিডিউল বরাদ্দ করা প্রয়োজন, যেখানে চলচ্চিত্র উৎসব ছাড়াও নিয়মিতভাবে দেশের প্রতিটি শাখায় মাসে অন্তত দুইদিন চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন থাকবে, দর্শক চাহিদার উপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে প্রদর্শনী সংখ্যা বাড়ানো যেতে পারে।
২. কারিগরি প্রশিক্ষণ: একাডেমির জেলা পর্যায়ের জনবলকে সার্বিক ব্যবস্থাপনা, পাইরেসি সুরক্ষা ছাড়াও প্রোজেক্টর, সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদির যথাযথ ব্যবহার সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা দিতে কেন্দ্রীয়ভাবে কারিগরি কর্মশালার আয়োজন করা দরকার।
৩. কন্টেন্ট ব্যাংক তৈরি: সারা বছর প্রদর্শনী চালিয়ে যেতে যথেষ্ঠ সংখ্যক চলচ্চিত্র প্রয়োজন। এক্ষেত্রে স্বাধীন ও নবীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরকে তাদের কাজ প্রদর্শনের জন্য উৎসাহিত করতে হবে, ফলে একটি বৈচিত্র্যময় কন্টেন্ট ব্যাংক তৈরি হবে।
৪. চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অংশগ্রহণ: ঢাকার বাইরের প্রদর্শনীগুলোতে সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতাদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে যাতে দর্শকদের সাথে তারা সরাসরি নিজেদের চিন্তা ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন।
৫. কর্মশালা এবং প্রকাশনা: সিনেমার সাথে গভীরতর বোঝাপড়া সৃষ্টির জন্য প্রত্যন্ত জেলাগুলোতে নিয়মিতভাবে চলচ্চিত্র সম্পর্কিত কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজন করতে হবে। এছাড়া চলচ্চিত্র সংক্রান্ত একটা ত্রৈমাসিক প্রকাশনার দায়িত্বও নিতে পারে একাডেমি।
৬. স্থানীয় সংগঠনের সম্পৃক্ততা: প্রদর্শনী এবং কর্মশালার প্রচার ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং ফিল্ম সোসাইটিগুলোকে প্রকল্পের অংশীদার হিসাবে সম্পৃক্ত করা খুবই জরুরি।
৭. অনলাইন প্রচারণা: কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়ভাবে নিয়মিত প্রদর্শনী সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রচারের জন্য অনলাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, একাডেমির পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৮. খোলা আকাশের নিচে প্রদর্শনী: শুষ্ক মৌসুমে প্রদর্শনীর জন্য খোলা মাঠ বা উম্মুক্ত মঞ্চ ব্যবহার করা যেতে পারে, সাধারণ মানুষের কাছে সহজেই চলচ্চিত্রকে পৌঁছে দিতে তা খুবই ফলপ্রসূ একটা উপায়।
৯. ব্যয় সংকোচন: ব্যবস্থাপনার খরচ কমানোর স্বার্থে সবসময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অডিটোরিয়ামে প্রদর্শনীর আয়োজন না করে সম্ভাব্য দর্শকসংখ্যা ও আবহাওয়া বিবেচনায় রেখে মাঝে মাঝে কোনো সেমিনার কক্ষ এমনকি খোলা স্থানেও চলচ্চিত্র দেখানো যেতে পারে।
১০. টিকিটিং ব্যবস্থা: নিয়মিত আয়োজনের ব্যয় নির্বাহের জন্য ক্রমান্বয়ে ১০-২০ টাকার টোকেন মূল্যের একটি টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করা এবং তাতে দর্শকদের স্বতস্ফূর্ত অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
১১. স্বাধীন প্রদর্শনীর জন্য প্রনোদনা: কোনো চলচ্চিত্র নির্মাতা টিকিটের বিনিময়ে স্বাধীনভাবে প্রদর্শনীর আয়োজন করতে চাইলে, তাদের জন্য একাডেমি ন্যূনতম ভাড়ায় অডিটোরিয়াম বরাদ্দ দিতে পারে, যা প্রান্তিক পর্যায়ের শাখাগুলোর আয়ের একটা উৎস হতে পারে।
১২. স্পন্সরশীপ: চলচ্চিত্র খাতে একাডেমির যথেষ্ঠ বাজেট বরাদ্দ না থাকলে স্পন্সর আহবান করা যেতেপারে। বছরব্যাপী সারাদেশে এমন একটা আয়োজন চালিয়ে যাওয়ার জন্য স্পন্সর পাওয়া বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পক্ষে কোন কঠিন কাজ হবে বলে মনে হয় না।
সবকিছুই বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব ভেবে স্বাধীন নির্মাতারা গা এলিয়ে দিলে এই প্রকল্পের মুখ থুবড়ে পড়তে সময় লাগবে না। নিজেদের স্বার্থেই অংশগ্রহণমূলকভাবে পেছন থেকে একাডেমিকে সহায়তা করে যেতে হবে সবাইকে। সবকিছুর আগে কন্টেন্ট ব্যাংক তৈরিতে নির্মাতাদের বিভিন্ন ফোরামগুলোকে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। কখনও নিজেদের চলচ্চিত্র ভান্ডারে ঘাটতি হলে দেশীয় পুরানো ছবি এমনকি বিদেশি ক্লাসিক ছবি চালিয়ে হলেও প্রদর্শনী নিয়মিত রাখতে হবে। ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই মূল চ্যালেঞ্জ, নিয়মিত আয়োজন সবসময়ই একটা দর্শকশ্রেণি তৈরি করে।
নির্মাতারা নিজের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে যেমন উপস্থিত থাকবেন একইভাবে যার যার নিজের জেলার একাডেমির কার্যক্রমের দেখভালও করবেন। শুরুতে তেমন কোন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা না দেখলেও প্রকল্পটা ঠিকঠাক চালাতে পারলে স্রেফ বছর দুয়েকের মধ্যেই একজন নির্মাতা এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তার চলচ্চিত্র মুক্তির পরিকল্পনা করতে পারবেন, এমন আশা অমূলক নয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমি পাইরেসি সমস্যা মোকাবেলায় এবং হাতে থাকা যন্ত্রপাতির সর্বোত্তম ব্যবহারের কারিগরিজ্ঞান দিয়ে একাডেমিকে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। এছাড়া একজন স্থাপত্য পেশাজীবী হিসেবে জেলা পর্যায়ের শাখাগুলোতে ন্যুনতম খরচে অ্যাক্যুইস্টিকস এবং স্থান বিন্যাসের মাধ্যমে দর্শককে সর্বোত্তম চলচ্চিত্র অভিজ্ঞতা দেওয়ার ব্যাপারে একাডেমিকে বিনামূল্যে পরামর্শ সেবা দিতেও আমি আগ্রহী।
জেলা শিল্পকলা একাডেমিগুলোকে বিকল্প সিনেমা থিয়েটারের একটি নেটওয়ার্কে রূপান্তরিত করতে পারলে একদিন একটি স্বাধীন চলচ্চিত্র ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম তৈরি করে ফেলাও কোন আকাশকুসুম কল্পনা নয়। আবার দীর্ঘ মেয়াদে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের সাথে আমজনতার সরাসরি সংযোগ ঘটতে থাকলে জাতীয় চলচ্চিত্ররুচির বিকাশও কেবল কথার কথা হয়ে থাকবে না। চলচ্চিত্র নির্মাণের শিল্পকে উদযাপন করতে এবং একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তুলতেও এটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলেই বিশ্বাস করি।
যতদূর জানি প্রতিটি জেলা শিল্পকলা একাডেমিতেই চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য বিশেষায়িত প্রেক্ষাগৃহ তৈরির পরিকল্পনা আছে। তবে সেই সুদিনের জন্য অপেক্ষা না করে বর্তমানে মিলনায়তনগুলো যেখানে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থাতেই আর হাতে থাকা যন্ত্রপাতি নিয়েই যত দ্রুত সম্ভব কার্যক্রম শুরু করে দিতে হবে। ক্রমান্বয়ে উন্নত প্রযুক্তি আর মিলনায়তন যুক্ত হয়ে এই প্রকল্পকে দিন দিন কেবল আরও বেগবান করবে।
শুধু শিল্পকলা একাডেমিই নয় দেশব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মিলনায়তনগুলো নিয়েও একটি নেটওয়ার্ক তৈরির চিন্তা করাই যায়। আবার জেলা শহরগুলোতেই এই প্রকল্পকে সীমাবদ্ধ করে রাখলে চলবে না, ক্রমান্বয়ে এই নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে হবে সবগুলো উপজেলা এমনকি বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলকেও। তবে নিশ্চিতভাবেই এই উদ্যোগটি নিয়ে আরও ব্যাপক আলোচনার অবকাশ আছে।