বিজেপি সরকার কলকাতার একটি পুরোনো মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ করে দিয়েছে। বিষয়টি গোটা পশ্চিমবঙ্গের ও পুরো ভারতীয় মুসলিমদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভেতরেই নীরবে দাঁড়িয়ে আছে এক শতাধিক বছরের পুরোনো মসজিদÑ গৌরীপুর জামে মসজিদ, যা স্থানীয় মানুষের কাছে ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেই অধিক পরিচিত। সম্প্রতি এই মসজিদকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে নয়; বরং উন্নয়ন, নিরাপত্তা, সাংবিধানিক অধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং রাজনীতির পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মসজিদে সাধারণ মানুষের প্রবেশ এবং জামাতে নামাজ আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনায় বিষয়টি দ্রুত সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে আসে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এটি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনে নেওয়া একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ। অন্যদিকে মসজিদ পরিচালনা কমিটি অভিযোগ করেছে, যথাযথ আলোচনা বা পূর্ব নোটিশ ছাড়াই প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয়েছে। এই দুই ভিন্ন অবস্থানের মধ্যেই বিতর্কটি ধর্মীয় অনুভূতি ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যার নতুন মাত্রা পায়।
গৌরীপুর জামে মসজিদের ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নানা স্মৃতি ও কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকের শেষভাগে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ বিমানবন্দর নির্মাণের বহু আগের। তখন চারপাশে ছিল গ্রামীণ জনপদ, কৃষিজমি এবং ছোট ছোট বসতি। সময়ের সঙ্গে কলকাতা বিস্তৃত হয়েছে, বিমান চলাচল বেড়েছে, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে উঠেছে, কিন্তু মসজিদটি তার পুরোনো অবস্থানেই থেকে গেছে। ফলে এটি কেবল একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়; স্থানীয় ইতিহাস ও সামাজিক স্মৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে। এই ইতিহাসই আজকের বিতর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। কারণ, উন্নয়নের স্বার্থে কোনো স্থাপনা স্থানান্তরের প্রশ্ন উঠলে বিষয়টি শুধু জমি বা নির্মাণের সীমায় আবদ্ধ থাকে না; মানুষের বিশ্বাস, আবেগ এবং পরিচয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে, উপাসনালয়ের ক্ষেত্রে সেই সংবেদনশীলতা আরও গভীর। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ যে যুক্তি সামনে আনছে, তার কেন্দ্রবিন্দু নিরাপত্তা। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় রানওয়ের নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নির্ধারিত নিরাপত্তা মান পূরণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্ট ল্যান্ডিং সিস্টেম স্থাপন এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই যুক্তি নতুন নয়। গত কয়েক দশক ধরেই বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গে মসজিদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে বিষয়টি কখনো চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সাম্প্রতিক পদক্ষেপের পর সেই পুরোনো বিতর্ক আবারও সামনে এসেছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা মসজিদ কমিটিকে বিমানবন্দরের বাইরে বিকল্প স্থানে আরও বড় ও আধুনিক মসজিদ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে এবং আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। কিন্তু মসজিদ পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, আলোচনার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রবেশাধিকার সীমিত করার সিদ্ধান্ত মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ তৈরি করেছে। এই ঘটনায় ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি আরেকটি বিষয় সামনে এসেছেÑ রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন। প্রশাসনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আইনসম্মত হলেও তা যদি পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা, অংশগ্রহণ এবং আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রশাসনের যোগাযোগের ধরন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে আইনের পাশাপাশি মানুষের আবেগও সমানভাবে কাজ করে। বিতর্কটি দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছড়িয়ে পড়েছে। এক পক্ষের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আপস করা যায় না। অন্য পক্ষ প্রশ্ন তুলছে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়, পদ্ধতি এবং যোগাযোগের স্বচ্ছতা নিয়ে। ফলে একটি প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক বিষয় ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে।
ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুসাংস্কৃতিক সমাজে এমন বিতর্ক নতুন নয়। সড়ক, রেলপথ, মেট্রো কিংবা বিমানবন্দর নির্মাণের সময় অতীতেও বহু ধর্মীয় স্থাপনা স্থানান্তরের প্রশ্ন উঠেছে। কোথাও আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান হয়েছে, কোথাও আবার দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। তাই গৌরীপুর জামে মসজিদকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার অংশ, যেখানে উন্নয়ন এবং ঐতিহ্যকে একই সঙ্গে ধারণ করার চ্যালেঞ্জ সামনে আসে। এই ঘটনায় আপাতত দুটি সমান্তরাল বাস্তবতা স্পষ্ট। প্রশাসন বলছে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অন্যদিকে মসজিদ কমিটি বলছে, নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা মানলেও শতাধিক বছরের একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত অবশ্যই আলোচনার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। এই দুই অবস্থানের মধ্যেই এখন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছেÑ সমাধান কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সম্ভব, নাকি তার জন্য প্রয়োজন আরও বিস্তৃত সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং রাজনৈতিক সংযম?
সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, আলোচনার দরজা এখনো বন্ধ হয়নি এবং গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তবে এই ব্যাখ্যা বিতর্ক পুরোপুরি থামাতে পারেনি। কারণ, ঘটনাটির সময় এবং বাস্তবায়নের ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্যরা। মসজিদ কমিটির সভাপতি মাওলানা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী অভিযোগ করেছেন, যথাযথ পূর্ব নোটিশ ছাড়া নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একটি শতাধিক বছরের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আলোচনাই হওয়া উচিত প্রধান পথ। তিনি আরও বলেছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সংগঠন, আলেম সমাজ এবং স্থানীয় মুসল্লিদের সঙ্গে অর্থবহ সংলাপ ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মসজিদ কমিটির এই অবস্থানকে সমর্থন করে কয়েকটি মুসলিম সংগঠনও বিবৃতি দিয়েছে। তাদের বক্তব্য, নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে রেখে কোনো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে তারা এ-ও বলেছে, যদি সত্যিই স্থানান্তর অনিবার্য হয়, তবে তা হতে হবে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা, লিখিত সমঝোতা এবং ধর্মীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার নিশ্চয়তার ভিত্তিতে। তাদের মতে, আস্থার পরিবেশ তৈরি না করে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিলে মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় সন্দেহ ও উদ্বেগ জন্ম নেয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটনাটি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। ক্ষমতাসীনদের বক্তব্য, একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। উন্নয়ন ও জননিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের বক্তব্য, বিষয়টিকে অযথা সাম্প্রদায়িক রং দেওয়া উচিত নয়; বরং প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনায় দেখা প্রয়োজন। অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে। তাদের দাবি, এত দিন ধরে আলোচনায় থাকা একটি বিষয়ে হঠাৎ করে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে আরও দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ তৈরি করা যেত। যদিও এই বিষয়ে সব বিরোধী দলের অবস্থান এক নয়, তবু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতেও আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
এই বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভারতের সংবিধান। সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে ধর্ম পালন ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার দিয়েছে। একই সঙ্গে ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার স্বাধীনতাও স্বীকৃতি দেয়। তবে এই অধিকার জনশৃঙ্খলা, জনস্বাস্থ্য এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে যুক্তিসংগত সীমাবদ্ধতার অধীন। অর্থাৎ রাষ্ট্র যদি বিশ্বাসযোগ্য ও প্রমাণনির্ভরভাবে দেখাতে পারে যে কোনো স্থাপনা জননিরাপত্তার জন্য বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করছে, তবে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইনবিদদের মতে, এখানেই মূল প্রশ্নটি আইনি নয়, বরং প্রক্রিয়াগত। সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট পক্ষকে পর্যাপ্ত শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে কি না, বিকল্প ব্যবস্থা কতটা গ্রহণযোগ্য, ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের প্রস্তাব কতটা স্পষ্টÑ এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত বিচারিক মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতার পাশাপাশি তার গ্রহণযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমানবন্দর সম্প্রসারণ, দ্রুতগতির রেলপথ কিংবা মহাসড়ক নির্মাণের সময় ধর্মীয় স্থাপনা স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই সরকার সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেছে, বিকল্প স্থানে নতুন উপাসনালয় নির্মাণ করেছে এবং পুরোনো স্থাপনার ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়, উন্নয়ন ও ঐতিহ্য পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; সঠিক পরিকল্পনা ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে তাদের মধ্যে সমন্বয় সম্ভব।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক, ওএআর ইন্ডিয়া,
মির্জা গালিব স্ট্রিট, কলকাতা