হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব বহু পুরোনো। মূলত দুপক্ষেরই বেঁচে থাকার লড়াই থেকেই এ দ্বন্দ্ব। মানুষের তৈরি ফাঁদ, আবাসস্থল সংকট ও উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে হাতির জীবননাশ ঘটছে। বন্যহাতি প্রায় বিপন্ন হচ্ছে। হাতি নিরীহ প্রাণী হওয়া সত্ত্বেও লোকালয়ে এলে তাদের ‘বন্য’ বা ‘পাগলা’ তকমা দিয়ে আক্রমণ ও হত্যা করা হয়। ফসল রক্ষা বা তুচ্ছ কারণে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পেতে এবং বিষটোপ দিয়ে হাতি হত্যা করা হচ্ছে। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার কঠোর প্রয়োগ না থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই আজ পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক হাতি দিবস। কানাডীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা প্যাট্রিসিয়া সিমস ও থাইল্যান্ডের এলিফ্যান্ট রিইন্ট্রোডাকশন ফাউন্ডেশন যৌথভাবে ২০১২ সালের ১২ আগস্ট প্রথম এই দিবসটি চালু করেন। দিবসটির এ বছরের প্রতিপাদ্য-‘স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে হাতি সংরক্ষণ প্রচেষ্টা প্রসারিত করা।’

জানা যায়, দিন দিন বনাঞ্চলের গাছ কেটে সাবড় করা হচ্ছে। জঙ্গল ছেড়ে পানি ও খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে বেরিয়ে আসছে হাতির দল। এতে বৃদ্ধি পাচ্ছে হাতি ও মানুষের সংঘাত। বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে স্থানীয়, অনাবাসী (ভারত-মিয়ানমার থেকে আসা) ও বন্দি হাতি মিলিয়ে অন্তত ১৪৮টি হাতি মারা গেছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত দেশে অন্তত ছয়টি হাতির মৃত্যু হয়েছে। এতে মৃত হাতির সংখ্যা বেড়ে ১৫৪ হয়েছে।

২০২৪ সালের নভেম্বরে শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে ধানখেতে কৃষকদের দেওয়া জেনারেটরের তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একটি বন্যহাতি মারা যায়। পরের বছর মার্চে শেরপুর গারো পাহাড়ে একই ফাঁদে পড়ে আরও একটি হাতির মৃত্যু হয়। এ বছরের এপ্রিলে রাঙামাটিতে মারা যায় একটি। গ্রামের বাসিন্দারা হাতিটির পা ও শুঁড় কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলে। পরে ১৯ মে বান্দরবানের লামায় ভোররাতে বন্যহাতি মারার বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ যায় এক গৃহবধূর। তথ্য বলছে, লামা উপজেলায় বন্যহাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। বিগত দশকে এই উপজেলায় অবৈধ বৈদ্যুতিক ফাঁদে পড়ে অন্তত ১৯টি বন্যহাতি এবং ছয়জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের চাপ ও স্থাপনায় সংকুচিত হাতির বিচরণ : কয়েক দশক আগেও কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বিশাল এলাকাজুড়ে ছিল হাতির বিচরণক্ষেত্র। খাবার, পানি আর প্রজননের প্রয়োজনে হাতির পাল এক আবাসস্থল থেকে অন্য আবাসস্থলে যাতায়াত করত। দেশে ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গারা এসে বসতি গড়ার ফলে হাতির অবাধ বিচরণে ছেদ পড়ে। উখিয়ায় হাতির মূল আবাস হিসাবে চিহ্নিত প্রায় ১০ হাজার একর বনভূমি দখল করে গড়ে ওঠে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর বসতি। এতে প্রাণীটির আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ে। এছাড়া নতুন স্থাপনা, সীমান্তে কাঁটাতার, পুঁতে রাখা মাইন ও রেল অবকাঠামো নির্মাণেও হাতির চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের তিনটি বনের ভেতর দিয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে চালু হয় দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন। এসব বনে হাতি চলাচলের ১৬টি ক্রসিং পয়েন্ট ও তিনটি করিডরের (পথ) ওপর দিয়ে রেলপথ বানানো হয়েছে। ট্রেনের ধাক্কায় বন্যহাতির মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে রাতে চুনতি এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় একটি হাতি মারা যায়। চট্টগ্রাম বন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, রেললাইনের কারণে হাতি চলাচলের ১২টি করিডর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া হাতির চলার পথে গড়ে উঠেছে শত শত মাছের খামার ও পানবরজ।

শেরপুরের সীমান্ত বাসিন্দা আফজাল খান শিমুল জানান, বর্তমানে হাতির দল দেখলেই সাধারণ মানুষ প্রাণীগুলোকে বিরক্ত করতে উঠেপড়ে লাগে। সেলফি, ছবি তুলতে তুলতে ইট-পাথর নিক্ষেপ করে। আগুন জ্বালিয়েও হাতিকে চরম পর্যায়ে উত্ত্যক্ত করা হয়। এমনকি কোনো কোনো সময় হাতি হত্যার সময় উল্লাসও করে মানুষ।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এমএ আজিজ যুগান্তরকে জানান, হাতি হত্যা হচ্ছে। গ্রামের শত শত মানুষ দল বেঁধে হাতিকে উত্ত্যক্ত করছে। এতে প্রাণীটি বিপন্ন হয়ে পড়ছে। শেরপুর কিংবা বান্দরবান কোথাও হাতির নিরাপত্তা নেই। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে হাতির চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে ভারত। তিনি মনে করেন, হাতি সুরক্ষায় বন বিভাগকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। তাছাড়া হাতি যদি ফসলের ক্ষতি করে, সরকার কৃষককে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews