মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তু ব্ল্যাকহোল সম্বন্ধে বহু দশক আগে দুই কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও স্টিফেন হকিং এক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যা এবার প্রায় নিখুঁতভাবে সত্য প্রমাণিত হলো। যুক্তরাষ্ট্রের LIGO যন্ত্রে ধরা পড়া এই ব্ল্যাকহোল সংঘর্ষ শুধু মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণকেই আরও নিখুঁত করল না; বরং বৈজ্ঞানিকভাবে বহু বছরের অপেক্ষাকেও পরিণত করল এক ঐতিহাসিক সত্যতায়। ঘটনার নাম ‘GW250114’। সময়ের হিসাবে সাম্প্রতিক, তবে বৈজ্ঞানিক গুরুত্বের বিচারে মহাজাগতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়। গবেষকরা জানান, প্রায় ১ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে দুটি বিশাল ব্ল্যাকহোল একে অপরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে এমন তীব্রভাবে ধসে পড়ে যে, স্থানকাল নিজেই কাঁপতে থাকে। সেই কাঁপনই পৌঁছে আসে পৃথিবীর LIGO ডিটেক্টরগুলোর কাছে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের আকারে। এ তরঙ্গ ধরার প্রযুক্তি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিজ্ঞানীরা শুধু সংঘর্ষকেই নয়, সংঘর্ষ-পরবর্তী ব্ল্যাকহোলের ‘কম্পন’, অর্থাৎ তার wiwss বা ‘দ্বিস্বরী ধ্বনি’ও শুনতে পাচ্ছেন। আর এ দুটোই আইনস্টাইন ও হকিংয়ের পুরোনো তত্ত্ব প্রমাণ করল, যেভাবে আগে কখনো সম্ভব হয়নি।
দুটি ব্ল্যাকহোল ও তাদের মহাজাগতিক নৃত্য
GW250114 -এ শনাক্ত হওয়া ব্ল্যাকহোল দুটি ছিল সূর্যের ভরের ৩০-৩৫ গুণ। তারা প্রায় নিখুঁত বৃত্তাকারে প্রদক্ষিণ করছিল এতটাই নির্ভুল যে, গবেষকরা একে ‘মহাবিশ্বের সবচেয়ে পরিষ্কার ব্ল্যাকহোল সংঘর্ষের রেকর্ড’ হিসেবে দেখছেন। গবেষণা নেতৃত্ব দিয়েছেন ফ্ল্যাটিরন ইনস্টিটিউট ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতিঃপদার্থবিদ ম্যাক্সিমিলিয়ানো ইসি। তাঁর ভাষায়-‘এত স্পষ্ট সংকেত আমরা আগে পাইনি। এটি এমন যেন মহাবিশ্ব আমাদের আরও কাছে এসে জানাচ্ছে; দেখ, এভাবেই স্থান ও কাল কাজ করে।’ সংঘর্ষ শেষে যে ব্ল্যাকহোল সৃষ্টি হলো তার ভর দাঁড়াল সূর্যের ভরের ৬৩ গুণ, আর এটি প্রতি সেকেন্ডে ১০০ বার ঘুরছিল। এই ঘূর্ণনই তৈরি করেছে পরবর্তী অধ্যায়ের নাটকীয়তা-ব্ল্যাকহোলের ঘণ্টাধ্বনি।
‘সরলতার সমীকরণ’ অবশেষে প্রমাণিত
ষাটের দশকে গণিতবিদ ‘রয় কের’ আইনস্টাইনের সমীকরণ ব্যাখ্যা করে দেখান, ব্ল্যাকহোলের সব বৈশিষ্ট্য মাত্র দুটি সংখ্যা দ্বারা নির্ধারিত হওয়া উচিত-ভর ও ঘূর্ণন। এটিকে ব্ল্যাকহোলের No-Hair Theorem বলা হয়, অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের আর কোনো জটিল বৈশিষ্ট্য নেই। GW250114 প্রথমবারের মতো এই তত্ত্বকে নির্ভুলভাবে প্রমাণ করেছে। কারণ LIGO যে কম্পন বা ringdown ধরেছে তাতে ছিল দুটি স্বর-একটি মৌলিক স্বর, আরেকটি ওভারটোন। এই দুটি স্বর বিশ্লেষণ করেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন : চূড়ান্ত ব্ল্যাকহোলের সব বৈশিষ্ট্য সত্যিই শুধু ভর ও ঘূর্ণনের ওপর নির্ভর করছে। এটি এমন এক মাইলফলক, যা আগে শুধু তাত্ত্বিক বইয়ের পাতায় ছিল। এবার সেটি মহাবিশ্ব নিজের হাতে লিখে দেখাল।
GW250114, দুটি ব্ল্যাকহোলের মধ্যে শক্তিশালী সংঘর্ষ ঘটেছে, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পর্যবেক্ষণ করেছেন...‘হকিংয়ের পৃষ্ঠক্ষেত্র উপপাদ্য’ এবার আরও শক্তভাবে প্রমাণিত
১৯৭১ সালে স্টিফেন হকিং ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, দুটি ব্ল্যাকহোল মিললে তাদের মোট পৃষ্ঠক্ষেত্র কখনোই কমবে না। GW250114 -এর ডেটা বিজ্ঞানীদের প্রথমবারের মতো সংঘর্ষের শুরু এবং শেষ দুই পর্যায় থেকেই পৃষ্ঠক্ষেত্র মাপার সুযোগ দিয়েছে। ফলাফল, হকিংয়ের কথাই সত্য। চূড়ান্ত ব্ল্যাকহোলের পৃষ্ঠক্ষেত্র পূর্বের তুলনায় বড়। কিপ থর্ন বলেন, হকিং বেঁচে থাকলে এই পর্যবেক্ষণ শুনে ‘অত্যন্ত আনন্দিত’ হতেন।
LIGO: মহাবিশ্বের শ্রবণযন্ত্র
মাধ্যাকর্ষীয় তরঙ্গ এতই দুর্বল যে, সেগুলো শনাক্ত করতে হয় এমন যন্ত্র দিয়ে যা পরমাণুর নিউক্লিয়াসের থেকেও ১,০০০ গুণ ছোট দূরত্বের পরিবর্তন পরিমাপ করতে পারে। গত ১০ বছরে LIGO-Virgo-KAGRA সহযোগিতার আপগ্রেড প্রযুক্তিটিকে আগের তুলনায় তিন গুণ বেশি নির্ভুল করেছে। ফলাফল ৩০০টিরও বেশি ব্ল্যাকহোল একত্রীকরণ শনাক্ত এবং এবার সর্বকালের সবচেয়ে বিশদ তথ্য। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমানুয়েল বার্টি এই সাফল্যকে বলেছেন, ‘মাধ্যাকর্ষণের মৌলিক নিয়ম পরীক্ষা করার জন্য এমন সুযোগ, যা আগে কখনো দেখা যায়নি বা ছিল না।’
মহাজাগতিক বিজ্ঞানের সামনে নতুন দরজা
GW250114 শুধু অতীতের ভবিষ্যদ্বাণী সত্য করেছে তা নয়, এটি ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক সংকটও স্পষ্ট করেছে। ম্যাকারোনা লাগোসের মতে, ‘এই সিগন্যাল ভবিষ্যতের আরও সূক্ষ্ম শনাক্তকরণের ভিত্তি তৈরি করেছে। মহাকর্ষ ও স্থানকালের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের বোঝা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।’ এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অসামঞ্জস্য সাধারণ আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মিল। সম্ভবত ব্ল্যাকহোলের আচরণ থেকেই সূত্র পাবে।
তথ্যসূত্র : সিএনএন