নব্বই থেকে দুই হাজার দশ সাল পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ কোরবানি দেয়া হতো তার প্রতিটি চামড়া দুই থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা হতো। ওই দুই দশকে চামড়ার বাজার এতটাই চাহিদাসম্পন্ন ছিল যার ফলে দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ছিল চামড়া শিল্পে। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে বৃহত্তম এই শিল্পে ধস নামতে শুরু করে।

দেশের এই সম্ভাবনাময় ‘মাল্টি-বিলিয়ন ডলার’ খাতটিকে বাঁচাতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কেবল ফাঁকা আশ্বাস নয়, বরং নীতিগত সংস্কার এবং সাভার ট্যানারিপল্লীর পরিবেশগত সঙ্কট দূর করা আবশ্যক। এই খাতের পুনর্জাগরণ সম্ভব হলে তা দেশের অর্থনীতিতে পোশাক খাতের মতোই বড় চালিকাশক্তি হিসেবে অবদান রাখবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের নির্ভরযোগ্য ক্ষেত্র চামড়া শিল্প গভীর সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে। প্রতি বছর কোরবানির ঈদের পর কাঁচা চামড়ার বাজারে যে মরণদশা তৈরি হয়, তা মূলত পুরো চামড়া শিল্পের অভ্যন্তরীণ ও নীতিগত ধসেরই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত ট্যানারি স্থানান্তর, পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স অর্জনে ব্যর্থতা এবং বাজার সিন্ডিকেটের কারণেই এই জাতীয় সম্পদ বর্জ্যে পরিণত হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দেশে বিপুল পরিমাণ পশু কোরবানির পর চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেকে। মাদরাসার শিক্ষকরা দিনভর চামড়া সংগ্রহ করে তা বিক্রি করতে গিয়ে যানবাহন ভাড়াও তুলে আনতে পারেনি। অনেক স্থানে রাস্তায় চামড়া পড়ে থাকতে দেখা গেছে। চামড়া শিল্পে এই ছন্দপতনের দায় সরকারের উপরই চাপাচ্ছে ভুক্তভোগীরা।

সঙ্কটের মূল উৎস বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে ২০১৭ সালে পুরান ঢাকার হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্পকে সাভারের হরিণধরায় স্থানান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সাভার চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সম্পূর্ণ কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। সিইটিপির দৈনিক বর্জ্য শোধন ক্ষমতা যেখানে ২৫ হাজার কিউবিক মিটার, সেখানে কোরবানির পিক সিজনে বর্জ্যরে পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৫ হাজার কিউবিক মিটারে। ফলে অতিরিক্ত অপরিশোধিত ক্ষতিকর রাসায়নিক ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে এবং পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও স্বীকার করা হয়েছে যে, হাজারীবাগ থেকে সাভারে চামড়া শিল্প স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক থাকলেও এর প্রক্রিয়াটি ত্রুটিপূর্ণ ও দূরদর্শিতাহীন ছিল, যা এই শিল্পকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে।

পরিবেশবান্ধব ও কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে না পারায় বাংলাদেশ বৈশ্বিক মানদণ্ড ‘লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (এলডব্লিউজি) সনদ পাচ্ছে না। এই সনদের অভাবে ইউরোপ ও আমেরিকার বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে সরাসরি প্রক্রিয়াজাত চামড়া (ফিনিশড লেদার) কিনতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। ফলে দেশের ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে ৬০-৭০ শতাংশ কম মূল্যে চীনের মতো নির্দিষ্ট কিছু দেশের কাছে চামড়া রফতানি করতে হচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক বাজার হারানোর ধাক্কাই এসে পড়ছে তৃণমূলের কাঁচা চামড়ার বাজারে। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে অর্জিত অর্থ দেশের কওমি মাদরাসা, এতিমখানা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হকের অংশ। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে কাঁচা চামড়ার দামে অবিশ্বাস্য পতন দেখা যাচ্ছে। যেখানে গরুর গোশতের দাম ও গবাদিপশুর মূল্য দ্বিগুণ হয়েছে, সেখানে চামড়ার দাম নেমে এসেছে এক-চতুর্থাংশে। মাঠপর্যায়ে উপযুক্ত দাম না পেয়ে ক্ষুব্ধ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেক স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছেন কিংবা নদীতে ফেলে দিচ্ছেন। এর অন্যতম বড় কারণ সঠিক সময়ে চামড়া সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় লবণের উচ্চ মূল্য ও মাঠপর্যায়ে লবণের অব্যবস্থাপনা। লবণ দেয়ার ক্ষেত্রে সামান্য দেরি হলেই চামড়া পচে যায় এবং আড়তদাররা তা কিনতে চান না।

কাঁচা চামড়ায় বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অভিযোগ তীর ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের সিন্ডিকেটের ওপর। চামড়ার বাজার ধসের পেছনে ট্যানারি মালিক ও বড় আড়তদারদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট কাজ করছে। সরকার প্রতি বছর কাঁচা চামড়ার ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করে দিলেও মাঠপর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে বকেয়া টাকা না পাওয়ার অজুহাতে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কেনেন। নগদ টাকার তীব্র সঙ্কট এবং ব্যাংক ঋণের অপর্যাপ্ততার কারণেও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন।

সিইটিপি আধুনিকীকরণ : সাভারের সিইটিপির সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে। প্রয়োজনে সক্ষম ট্যানারিগুলোকে নিজস্ব বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনে সরকারি ও কারিগরি সহায়তা দিতে হবে। এলডব্লিউজি সনদ অর্জন, পরিবেশ ও কমপ্লায়েন্সের শর্তগুলো পূরণ করে দ্রুত এলডব্লিউজি (এলডব্লিউজি) সনদ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ইউরোপ-আমেরিকার মূল বাজারে সরাসরি প্রবেশ করা যায়।

সংরক্ষণাগার ও কোল্ড স্টোরেজ : সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দেশের প্রধান প্রধান চামড়ার মোকামগুলোতে আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও কোল্ড স্টোরেজ গড়ে তুলতে হবে। সহজ শর্তে ঋণের ট্যানারি মালিক ও প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীদের জন্য ব্যাংকিং সুবিধা সহজ করতে হবে, যাতে তারা মৌসুমের শুরুতেই কাঁচা চামড়া কেনার পর্যাপ্ত তহবিল পান।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews