১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস বিশ্বজুড়ে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অনন্য স্মারক। ১৮৮৬ সালের শিকাগোর হে মার্কেটের রক্তঝরা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে অধিকারের সূচনা হয়েছিল, তার প্রাসঙ্গিকতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আজও অপরিসীম। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তার প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই শ্রমিক শ্রেণির অধিকার, মর্যাদা এবং জাতীয় উৎপাদনে তাদের ভূমিকাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়ার আইনী সংস্কার এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফার রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচি- সবক্ষেত্রেই ১ মে দিবসের মূল চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে।
বিএনপির রাজনৈতিক দর্শনে ১ মে কেবল একটি বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি শ্রমিক-মালিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা এবং শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়নের অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচিত। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মনে করেন, শিকাগোর হে মার্কেটের দাবি আজও বাংলাদেশের অনেক শিল্প খাতে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে, যেখানে আট ঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ আজও বিনা মজুরিতে বা নামমাত্র মজুরিতে সম্পন্ন হয়। বিএনপি তার রাজনৈতিক কর্মকা-কে তৃণমূল ও শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে সহযোগী সংগঠন হিসেবে ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল’ প্রতিষ্ঠা করে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ৩ মে (মতান্তরে ২ মে) এই সংগঠনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। জিয়াউর রহমানের লক্ষ্য ছিল শ্রমিকদের কেবল আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা এবং জাতীয় উৎপাদনে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা। শ্রমিক দলের মূলনীতিসমূহ শহীদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং উৎপাদনের মাধ্যমে স্বনির্ভরতা অর্জন অন্যতম। সংগঠনটি বিশ্বাস করে যে, শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক না থাকলে শিল্পায়ন সম্ভব নয়, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে বাধা সৃষ্টি করে।
১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার পর জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল ভঙ্গুর এবং শিল্প উৎপাদন ছিল নি¤œমুখী। তিনি ‘উৎপাদনের রাজনীতি’ (Politics of Production)) স্লোগান নিয়ে দেশের প্রতিটি স্তরে কর্মোদ্দীপনা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। তার শ্রমনীতির মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যবস্থার বদলে একটি বাজারমুখী অর্থনীতির দিকে যাত্রা শুরু করা, যেখানে বেসরকারি খাত বিকশিত হবে এবং শ্রমিকের মর্যাদা সুরক্ষিত থাকবে। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা কর্মসূচির আলোকে শ্রমিকদের জন্য গৃহীত উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপসমূহ ছিল: ১. কল-কারখানায় শ্রমিকের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করা। ২. জনশক্তি রপ্তানির সূচনা করা, যা বর্তমানে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স অর্থনীতির অন্যতম প্রধান উৎস। ৩. শিল্পক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং ধর্মঘটের সংস্কৃতি কমিয়ে উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেওয়া। ৪. বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংগঠন করার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার সুসংহত করা। জিয়াউর রহমানের এই দর্শন শ্রমিকদের মাঝে এমন এক শ্রেণি চেতনার জন্ম দেয়, যা কেবল দাবি আদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে রাষ্ট্র গঠনের কারিগর হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি সরকার যখন ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসে, তখন তারা মুক্তবাজার অর্থনীতি বিকাশের পথে সাহসী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তার সরকারের সময়েই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প প্রধান রপ্তানি খাতে পরিণত হতে শুরু করে এবং এই খাতের বিকাশে শুল্ক ও কর ছাড়ের মতো ব্যাপক নীতি সহায়তা প্রদান করা হয়। বিএনপি সরকারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন হলো ‘বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬’ প্রণয়ন। ব্রিটিশ আমল থেকে প্রচলিত অসংখ্য অস্পষ্ট এবং পরস্পরবিরোধী শ্রম আইনকে বাতিল করে একটি আধুনিক ও সমন্বিত ‘লেবার কোড’ তৈরি করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা হয়। বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ২০০৬ সালে তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৯৩০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬৬২.৫০ টাকা করা হয়, যা দীর্ঘ ১২ বছর পর একটি বড় ধরনের সমন্বয় ছিল। যদিও এই বৃদ্ধি নিয়ে সমালোচনা ছিল, তবুও বিএনপি দাবি করে যে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় এটি ছিল শ্রমিকদের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
২০২৩ সালে বিএনপি দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে আমূল সংস্কারের লক্ষ্যে ‘৩১ দফা রূপরেখা’ ঘোষণা করেছে। এই রূপরেখাটি মূলত শহীদ জিয়ার ১৯ দফা এবং বেগম জিয়ার ভিশন ২০৩০-এর একটি আধুনিক ও বর্ধিত রূপ। ৩১ দফার ১৬ নম্বর দফায় শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও আধুনিক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় এবং তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। দীর্ঘ ১৮ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর ক্ষমতায় ফিরে বিএনপি তাদের ৩১ দফা বাস্তবায়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারেক রহমান তার প্রথম ভাষণে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ এবং ‘জবাবদিহিমূলক সরকার’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছেন।
২০২৬ সালের ১ মে দিবসকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টনে বিএনপির যে বিশাল সমাবেশের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তা মূলত সরকারের প্রথম দুই মাসের কার্যক্রমের একটি শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তারেক রহমানের সরকার আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয় করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে, যেখানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ১ মে দিবসের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রমিকদের জন্য ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি কমিশন’ এবং নতুন শ্রমনীতি ঘোষণা করতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
বাংলাদেশের শ্রমিক রাজনীতিতে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণ। বিএনপির সহযোগী সংগঠন শ্রমিক দলও এই অভিযোগের বাইরে নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬৫টি নিবন্ধিত ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন থাকলেও মাত্র ২.২৫ শতাংশ শ্রমিক ইউনিয়নভুক্ত, যা এশিয়ার মধ্যে সর্বনি¤œ। বিএনপির শ্রমিক দল বর্তমানে ২৭৯টি ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছে, যার আওতায় প্রায় ২ লক্ষ ৪৭ হাজার শ্রমিক রয়েছে। এই বিশাল জনশক্তিকে কেবল রাজনৈতিক আন্দোলনের কাজে ব্যবহার না করে তাদের পেশাগত অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত করা বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ৩১ দফায় প্রস্তাবিত ‘গণতান্ত্রিক ট্রেড ইউনিয়ন’ অধিকার নিশ্চিত করা গেলে এই রাজনৈতিক আধিপত্য কিছুটা কমতে পারে এবং প্রকৃত শ্রমিক নেতাদের উত্থান সম্ভব হতে পারে। এছাড়াও গার্মেন্ট মালিকদের রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা করে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হবে।
মে দিবস এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের রাজনৈতিক সম্পর্কটি ঐতিহাসিক সংগ্রাম, আইনী সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার এক দীর্ঘ পথপরিক্রমা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে যে শ্রমনীতির যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৩১ দফার মধ্য দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করেছে। বর্তমান ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলায় বিএনপিকে কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ আজ কেবল আশ্বাস নয়, বরং তাদের ঘামের মর্যাদা এবং জীবনের নিরাপত্তা চায়, যা অর্জনে রাজনৈতিক সদিচ্ছাই প্রধান হাতিয়ার।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।