ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ২০২৫ এ সালের শেষভাগ থেকে দেশ জুড়ে যে অজানা শঙ্কা, গুজব ও অস্থিরতা বিরাজ করছিল, তা দূর করে একটি উৎসবমুখর ও সংঘাতহীন নির্বাচন উপহার দেওয়া ছিল যেন এক অসাধ্য সাধন। তবে সব জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মর্যাদাকে নিয়ে গেছে এক নতুন উচ্চতায়।

বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস মানেই দীর্ঘকাল ধরে পেশিশক্তি, ভোটকেন্দ্র বা বুথ দখল আর সংঘাতের প্রতিচ্ছবি। এই কলঙ্কিত অধ্যায় মুছে ফেলাই ছিল বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একটি অবাধ ও সু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের সমন্বয়ে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ সাজানো হয়েছিল, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘সমরে আমরা, শান্তিতে আমরা, সর্বত্রই আমরা দেশের তরে’-এই মূলমন্ত্রে দীক্ষিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ বিভিন্ন বাহিনীর মোট ৮ লাখ ৯৭ হাজার ১১৭ জন সদস্য মোতায়েন ছিলেন। এর মধ্যে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সেনাবহিনীর ১ লাখ সদস্যের উপস্থিতি সাধারণ ভোটারের মনে এক বিশাল আস্থার জায়গা তৈরি করে। এছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার এবং বিমানবাহিনীর ৩ হাজার ৭৩০ জন সদস্য দুর্গম এলাকায় মোতায়েন থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন।

নির্বাচনের অনেক আগেই সেনাসদর থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যা যা প্রয়োজন, সেনাবাহিনী তার সবটুকুই করবে। এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পেলাম ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালট যুদ্ধে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে ৪১১টি উপজেলায় ৫৪৯টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে সেনাবাহিনী যে নজরদারি চালিয়েছে, তা ছিল নজিরবিহীন। খোদ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকর-উজ-জামান নিজে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম পরিদর্শন করে অসামরিক প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা এ বাহিনীকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেবে। এই বলিষ্ঠ নেতৃত্বই সাধারণ মানুষকে নির্ভয়ে এ ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করেছে।

নির্বাচনের আগের ১৪ দিনে সারা দেশে এক - বিশাল চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা হয়। তথা অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার ১৫২টি অবৈধ অস্ত্র এবং ২ লাখ ৯১ হাজার গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, প্রায় ২২ হাজার ২৮২ জন চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতকারীকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের মাধ্যমে নির্বাচনের মাঠকে শান্তিপূর্ণ রাখা হয়েছে।

সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এই নির্বাচনে পুলিশ (১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৪৩), বিজিবি (৩৭ হাজার ৪৫৩), র‍্যাব (৭ হাজার ৭০০) এবং কোস্ট গার্ড একযোগে কাজ করেছে। তবে সংখ্যার বিচারে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। প্রায় ৫ লাখ ৭৬ হাজার ৩১৪ জন আনসার সদস্য সরাসরি মাঠ পর্যায়ে সম্পৃক্ত থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন।

একটি সফল কাজের পেছনে সব সময়ই কিছু ষড়যন্ত্র থাকে। এবারের নির্বাচনেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা তথ্য ও অপতথ্য ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে সেনা সদর এবং সংশ্লিষ্ট বাহিনীর বলিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব সেই অপপ্রচারকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে যেখানে নির্বাচনের দিন মারামারি-খুনোখুনির মতো রক্তপাত ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার, সেখানে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল বিস্ময়করভাবে শান্তিপূর্ণ।

পরিশেষে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক জয় নয়, এটি ছিল শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং আস্থার জয়। একটি ‘ফ্যাসিবাদমুক্ত’ বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এই নতুন পথচলায় সেনাবাহিনী যে মাইলফলক স্থাপন করল, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। সর্বোপরি, এমন একটি নির্বচন উপহার দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews