নিউইয়র্ক এমন এক শহর, যেখানে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের মানুষ এসে নিজেদের জন্য একটি ছোট্ট স্বদেশ বানিয়ে নিয়েছে। ম্যানহাটনের আকাশছোঁয়া ভবনের নিচে, কুইন্সের জ্যাকসন হাইটসের ফুটপাথে, জ্যামাইকা, ওজোন পার্ক, উডসাইড, এল্মহার্স্ট কিংবা লং আইল্যান্ডের পরিবারকেন্দ্রিক জীবনে ছড়িয়ে আছে অভিবাসীদের অসংখ্য গল্প। কেউ এসেছেন উচ্চশিক্ষার টানে, কেউ পেশার সন্ধানে, কেউ নিরাপদ জীবনের আশায়, কেউ আবার সন্তানদের ভবিষ্যৎকে একটু আলোর দিকে নিয়ে যেতে। এই শহরের ভিড়ে বাংলাদেশিরাও প্রথমে ছিলেন অল্পসংখ্যক, বিচ্ছিন্ন, পরস্পরের খোঁজে থাকা কিছু মানুষ। সময়ের সঙ্গে সেই বিচ্ছিন্নতা বদলে গেছে কমিউনিটিতে, কমিউনিটি বদলে গেছে প্রতিষ্ঠানে, আর সেই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম বড় নাম হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ সোসাইটি।
মানুষ দেশ ছাড়ে, কিন্তু দেশ মানুষকে সহজে ছাড়ে না। পাসপোর্ট বদলায়, ঠিকানা বদলায়, ভাষার পরিবেশ বদলায়, কিন্তু জন্মভূমির স্মৃতি, গ্রামের বাড়ির উঠোন, নদীর ঘাট, স্কুলের মাঠ, পরিবারের স্মৃতি মানুষের ভেতরে থেকে যায়। সেই স্মৃতিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রবাসে দরকার হয় একটি ছাতার। দরকার হয় এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু নিজের জেলার মানুষকে নয়, নিজের দেশের মানুষকে খুঁজে পায়। বাংলাদেশ সোসাইটির জন্ম সেই প্রয়োজন থেকেই।
১৯৭৫ সালের ২৩ নভেম্বর নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির আর্ল হলে এক সভার মধ্য দিয়ে সংগঠনটির সূচনা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন অ্যাডহক কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন ড. আবদুল হক। ১৯৭৬ সালের আগস্টে প্রথম আনুষ্ঠানিক কমিটি নির্বাচিত হয়। সেই কমিটিতে সভাপতি ছিলেন ড. মোহাম্মদ ইউসুফ, সহ-সভাপতি ছিলেন প্রয়াত মোহাম্মদ কাজী জাকারিয়া, সাধারণ সম্পাদক ছিলেন প্রয়াত ইঞ্জিনিয়ার আসাদুল হক, কোষাধ্যক্ষ ছিলেন আবদুল আউয়াল মিন্টু এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন মমতাজ হাসান।
এই নামগুলো শুধু একটি কমিটির তালিকা নয়। এগুলো নিউইয়র্কে বাংলাদেশি সমাজ গঠনের প্রাথমিক অধ্যায়ের নাম। স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স তখন খুব বেশি নয়। দেশ তখন যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে। অন্যদিকে আমেরিকায় থাকা বাংলাদেশিরা সংখ্যায় সীমিত, সংগঠিত শক্তি হিসেবে তেমন দৃশ্যমান নন। সেই সময় কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি বুঝতে পেরেছিলেন, ব্যক্তিগত সাফল্য যথেষ্ট নয়; প্রবাসে জাতিগত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার সম্মিলিত প্রতিষ্ঠান। সেই ভাবনারই ফল বাংলাদেশ সোসাইটি।
শুরু থেকেই বাংলাদেশ সোসাইটি নিজেকে একটি ছাতা সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। সংগঠনের নিজস্ব পরিচিতিতে একে অরাজনৈতিক, অলাভজনক, ধর্মীয় পক্ষপাতমুক্ত ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সকল ধর্মের, সকল মতের, সকল জেলার মানুষ এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন। এখানে বড় পরিচয় একটাই, আর তা হলো বাংলাদেশি।
সংগঠনটির ওয়েবসাইটে বর্তমান সম্পদের মধ্যে নিজস্ব অফিস ভবনের কথা উল্লেখ আছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সোসাইটি নিউইয়র্কের Washington Memorial Park-এ ২১০টি কবরস্থান কিনেছে এবং অলাভজনক ভিত্তিতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে থাকে। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অসচ্ছল সদস্যদেরও সহায়তার কথা সেখানে উল্লেখ আছে। প্রবাস জীবনে মৃত্যুর পর মর্যাদাপূর্ণ শেষ ঠিকানার ব্যবস্থা একটি গভীর মানবিক বিষয়। এই দিক থেকে সোসাইটির কাজ শুধু সাংগঠনিক নয়, আবেগের গভীর জায়গায় স্পর্শ করে।
আগামী ১৮ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আগামী তিন বছরের জন্য নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হবে। গত ৩০ জুন ছিল নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং সদস্যপদ নবায়ন বা নিবন্ধন সম্পন্ন করার শেষ দিন। সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আজীবন সদস্যসহ সংগঠনের মোট সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩২১ জনে। এই হিসাবে বাংলাদেশ সোসাইটি বর্তমানে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশিদের সর্ববৃহৎ সংগঠন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নতুন সদস্য নিবন্ধন ও সদস্যপদ নবায়নের মাধ্যমে সংগঠনের তহবিলে প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার ডলার যুক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন কমিউনিটি সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবারের বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচনে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। নির্বাচনকে ঘিরে নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সরব প্রচারণা চলছে। প্রতিদিনই প্রার্থীরা ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন। রেস্টুরেন্ট, অডিটোরিয়াম, কমিউনিটি হল ও পরিচিত মিলনস্থানে চলছে সভা, মতবিনিময়, পরিচিতি পর্ব এবং আপ্যায়ন। কোথাও প্রার্থীরা নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরছেন, কোথাও ভোটাররা প্রশ্ন করছেন, কোথাও আবার পুরোনো সম্পর্ক, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা নির্বাচনী হিসাবের অংশ হয়ে উঠছে। সভা, সমর্থন আদায় ও আপ্যায়নের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও নির্বাচনী প্রচারণার দৃশ্যমান অংশ। কমিউনিটির বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই প্যানেলের সম্মিলিত নির্বাচনী ব্যয় মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ সোসাইটির নির্বাচন এখন নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটির অন্যতম আলোচিত বিষয়।
নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিও চলছে জোরেশোরে। ভোটার তালিকা, ভোটকেন্দ্র, নিরাপত্তা, ভোটগ্রহণ পদ্ধতি, প্রার্থীদের আচরণবিধি এবং ফলাফল ঘোষণার প্রক্রিয়া নিয়ে কমিশন কাজ করছে। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে পাঁচটি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে এবং ভোট প্রদান ও গণনা, দুটিই EVM বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের মাধ্যমে একই দিনে সম্পন্ন করা হবে। ফলাফলও সেদিনই ঘোষণা করার প্রস্তুতি রয়েছে। ফলে নির্বাচন ঘিরে আগ্রহ যেমন বেড়েছে, তেমনি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি এবং ফলাফল ঘোষণার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও কমিউনিটির প্রত্যাশা অনেক বেশি।
নির্বাচনের উত্তাপের মধ্যেই বাংলাদেশ সোসাইটির সামনে দীর্ঘদিনের আরেকটি বড় প্রশ্ন নতুন করে সামনে আসছে। সেটি হলো নিজস্ব কমিউনিটি সেন্টার। সংগঠনের ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যেই বাংলাদেশ সোসাইটির মালিকানাধীন কমিউনিটি সেন্টার প্রতিষ্ঠা, নিউইয়র্কে স্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ এবং বাংলাদেশ ডে প্যারেড আয়োজনের কথা আছে। প্রবাসে একটি নিজস্ব কেন্দ্র মানে শুধু একটি ভবন নয়; সেখানে থাকবে ভাষা, সংস্কৃতি, প্রজন্ম, নাগরিক অধিকার, সামাজিক সহায়তা এবং কমিউনিটির সম্মিলিত স্মৃতির ঠিকানা। এত বড় সদস্যভিত্তি ও নির্বাচনী আগ্রহের পর নতুন নেতৃত্বের কাছে তাই বড় প্রশ্ন থাকবে, এই দীর্ঘদিনের স্বপ্ন কি এবার বাস্তব পরিকল্পনায় রূপ নেবে?
তবে কমিউনিটি সেন্টার কিংবা নির্বাচনের বাইরেও বাংলাদেশ সোসাইটির একটি বৃহত্তর দায়িত্ব রয়েছে। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন আর শুধু প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের সমাজ নয়। এখানে দীর্ঘদিনের পরিশ্রমী প্রবাসী যেমন আছেন, তেমনি আছেন দ্বিতীয় প্রজন্মের শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, উদ্যোক্তা, শিল্পী, সাংবাদিক, নির্বাচিত প্রতিনিধি, আইনজীবী, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ নানা পেশার মানুষ। পাশাপাশি রয়েছে জেলা সমিতি, উপজেলা সমিতি, পেশাজীবী সংগঠনসহ অসংখ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। একটি ছাতা সংগঠনের মূল কাজ হলো এই বিচিত্র শক্তিগুলোকে এক সুতোয় গেঁথে কমিউনিটির অভিন্ন কণ্ঠে রূপ দেওয়া। সেই কণ্ঠের মাধ্যমেই বাংলাদেশি কমিউনিটি মূলধারার সমাজে আরও দৃশ্যমান, মর্যাদাবান ও প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে।