জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো দেশের গুরুত্বপূর্ণ টেলি স্বাস্থ্যসেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩’ এখন বন্ধের পথে। দুই কোটি ৭০ লাখেরও বেশি মানুষকে মোবাইল ফোনে সেবা দেওয়া এ প্রকল্পে টাকা দিচ্ছে না অন্তর্বর্তী সরকার। এতে চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না সেবা পরিচালন প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অবহেলায় গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

জানা যায়, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে মানুষ স্বাস্থ্য বিষয়ে পরামর্শ পেতে পারেন। এ সেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যের। ১০০ জন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ও ২৫ জন হেলথ ইনফরমেশন কর্মকর্তা পালাক্রমে স্বাস্থ্য বাতায়নে সেবা দেন। তারা বেতন না পেলে এ কাজে থাকবেন না। ফলে সেবাটিও বন্ধ হয়ে যাবে।

স্বাস্থ্য বাতায়ন সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ই-হেলথ কার্যপরিকল্পনার অধীনে ২০১৫ সালে স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ সেবা চালু হয়। চুক্তির মাধ্যমে এ সেবা পরিচালনের দায়িত্ব পায় সিনেসিস আইটি লিমিটেড নামের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সিনেসিস আইটির পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ২৪ লাখ টাকা। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠির কোনো উত্তরও দিচ্ছে না মন্ত্রণালয়, টাকাও পরিশোধ করছে না।

অন্যদিকে এ কার্যক্রম নবায়নের মেয়াদ চলতি বছরের এপ্রিলে শেষ হবে। সেবা চালু রাখতে আগেভাগেই নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া শুরু হয়। তবে তেমন কোনো উদ্যোগ দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বাতায়ন সেবা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সিনেসিস আইটির পরিচালক সোহরাব আহমেদ চৌধুরী। সোহরাব আহমেদ বলেন, মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন আসে। প্রায় ১৭ মাস মন্ত্রণালয় এ অর্থ ছাড় করছে না। চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের ধরে রাখাও যাচ্ছে না। এমনটি চলতে থাকলে আমাদের পক্ষে এ সেবা অব্যাহত রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

এদিকে, দেশের একটি সমন্বিত জাতীয় স্বাস্থ্য অবকাঠামোয় পরিণত হওয়া বিনামূল্যের স্বাস্থ্য পরামর্শসেবা কীভাবে এমন ঝুঁকিতে পড়লো, তা প্রশ্ন উঠেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেবা অব্যাহত রাখতে মন্ত্রণালয়ের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, বড় বড় হাসপাতালে যেসব সমস্যার কথা বলা যায় না, এমন ছোট ছোট সমস্যার সমাধান পাওয়া যায় ১৬২৬৩-তে ফোন করে। শহর এলাকায় এ সেবাটি খুবই জরুরি। কারণ শহরে কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন সাবসেন্টার নেই।

এছাড়া স্বাস্থ্য বাতায়ন থেকে এমন সব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়, যা স্বাস্থ্যের পরিকল্পনা প্রণয়নের সহায়ক। প্রয়োজনে সামান্য টোল নিয়ে হলেও ১৬২৬৩ চালু রাখা দরকার।

বিষয়টি নিয়ে জানতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা নিয়ে একটু ঝামেলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কাজ চলছে। আশা করি, দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে।’

স্বাস্থ্য বাতায়নে কী চিকিৎসা দেওয়া হয়, কীভাবে পাওয়া যায়

স্বাস্থ্য বাতায়নের চিকিৎসাসেবার মধ্যে আছে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা; কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক পরিবর্তন ও মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসা ও পরামর্শ; পরিবার পরিকল্পনা ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে চিকিৎসা ও পরামর্শ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত পরামর্শ ও রেফারেন্স। অ্যাম্বুলেন্স, রক্ত, দুর্ঘটনায় জরুরি সেবার তথ্য এখান থেকে দেওয়া হয়।

এখানে আসা প্রতিটি কল স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করা হয়। রোগীর প্রয়োজন অনুসারে ই-প্রেসক্রিপশন রোগীর মোবাইল ফোনে এসএমএস আকারে পাঠানো হয়। প্রয়োজনে ভিডিওকলের মাধ্যমে রোগীর চিকিৎসা হয়। স্বাস্থ্য বাতায়ন ১৬২৬৩ থেকে যে সেবা দেওয়া হয়, প্রতিদিন তা সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া মাসিক, ত্রৈমাসিক ও বার্ষিক প্রতিবেদনও তারা দেয়।

সিনেসিস আইটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাড়ে ছয় হাজার কল আসে। ২০২৫ সালে কল এসেছে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩টি। করোনাভাইরাস মহামারির প্রথম বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালে কল আসে এক কোটির বেশি। যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত দুই কোটি ৭০ লাখের বেশি কল পেয়েছে স্বাস্থ্য বাতায়ন।

চিকিৎসকরা বলছেন, মানুষের কাছে ১৬২৬৩ একটি পরিচিত নম্বর। মানুষ প্রয়োজনের সময় এখানে ফোন করে বিভিন্ন সমস্যার কথা বলতে পারেন, চিকিৎসা নেন, পরামর্শ নেন। সেবাটি বন্ধ হয়ে গেলে টেলি স্বাস্থ্যসেবায় ছেদ পড়বে।

এএএইচ/এমআরএম



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews