কানাডাকে সাধারণত হকির দেশ হিসেবেই চেনে সবাই। বরফের মাঠ, স্টিক, পাক আর দীর্ঘ শীত এই দেশের ক্রীড়া-পরিচয়ের বড় অংশ। কিন্তু সেই পরিচয়ের আড়ালে বহু বছর ধরে আরেকটি খেলা ধীরে ধীরে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। উত্তর আমেরিকায় যাকে বলা হয় সকার, বিশ্বের বড় অংশে সেটিই ফুটবল। আজ টরন্টো, ভ্যাঙ্কুভার, মন্ট্রিয়ল, ক্যালগারি, এডমন্টন কিংবা মিসিসাগার পার্কে পার্কে শিশু-কিশোরদের পায়ের নিচে ঘুরে বেড়ানো সেই বলই কানাডাকে নিয়ে গেছে বিশ্বকাপের মঞ্চে।
কানাডায় সংগঠিত ফুটবলের ইতিহাস নতুন নয়। কানাডা সকারের তথ্য অনুযায়ী, এ দেশে ফুটবল খেলা শুরু হয় ১৮৭৬ সালে। ১৯১২ সালের ২৪ মে গঠিত হয় Dominion of Canada Football Association, যা পরে Canada Soccer নামে পরিচিত হয়। একই বছরের শেষদিকে কানাডার ফুটবল সংস্থা ফিফার সঙ্গে যুক্ত হয়। ফুটবলে কানাডার শিকড় তাই এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো।
তবে ইতিহাস পুরোনো হলেও বিশ্বকাপের পথ কানাডার জন্য সহজ ছিল না। ১৯৫৭ সালের ২২ জুন টরন্টোর ভার্সিটি স্টেডিয়ামে কানাডা প্রথমবার ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশ নেয়। প্রতিপক্ষ ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেই ম্যাচে কানাডা ৫-১ গোলে জেতে। কিন্তু জয় দিয়ে শুরু করেও সেবার সুইডেন বিশ্বকাপে যাওয়া হয়নি। মেক্সিকোর কাছে পিছিয়ে পড়ে কানাডার প্রথম স্বপ্ন থেমে যায় বাছাইপর্বেই।
বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে কানাডার প্রথম উপস্থিতি আসে ১৯৮৬ সালে, মেক্সিকো বিশ্বকাপে। কানাডা সেবার কনকাকাফ চ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বকাপে যায়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ছিল কঠিন। ফ্রান্স, হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে তিন ম্যাচেই হারতে হয়। গোল করা হয়নি একটিও। তবু ১৯৮৬ বিশ্বকাপ কানাডার ফুটবল ইতিহাসে বড় এক অধ্যায়। কারণ কোনো দেশের প্রথম বিশ্বকাপ কখনো কেবল ফলাফলের বিষয় নয়, সেটি আত্মপরিচয়েরও বিষয়।
তারপর আসে দীর্ঘ অপেক্ষা। একে একে বিশ্বকাপ এসেছে, বিশ্বকাপ গেছে, কিন্তু কানাডা আর ফিরতে পারেনি। ৩৬ বছরের সেই অপেক্ষা শেষ হয় ২০২২ সালে। টরন্টোর ঠান্ডা বিকেলে জ্যামাইকাকে ৪-০ গোলে হারিয়ে কানাডা কাতার বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। কানাডা সেবার পয়েন্ট পায়নি, কিন্তু আলফানসো ডেভিস ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে মাত্র ৬৭ সেকেন্ডে গোল করে কানাডার বিশ্বকাপ ইতিহাসের প্রথম গোলটি করেন। হার সত্ত্বেও সেই গোল কানাডার ফুটবলে নতুন প্রজন্মকে সাহসী করে তোলে।
২০২৬ বিশ্বকাপে কানাডার অন্তর্ভুক্তি এসেছে দুই পথে। একদিকে কানাডা এখন আর ফুটবল মানচিত্রের প্রান্তে থাকা দেশ নয়। আলফানসো ডেভিস, জোনাথন ডেভিড, সাইল লারিন, স্টিফেন ইউস্তাকিওদের মতো খেলোয়াড়রা ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বড় লিগে নিজেদের পরিচিত করেছেন। অন্যদিকে, সহ-আয়োজক হিসেবে কানাডা সরাসরি মূলপর্বে জায়গা পেয়েছে। ফিফা ২০২৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি নিশ্চিত করে, ২০২৬ বিশ্বকাপের তিন আয়োজক দেশ কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূলপর্বে খেলবে।
আয়োজক হওয়ার পথটিও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১৮ সালের ১৩ জুন মস্কোয় ফিফার ৬৮তম কংগ্রেসে কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ প্রস্তাব জয়ী হয়। ভোটের ফল ছিল ১৩৪-৬৫। মরক্কোর একক প্রস্তাবকে হারিয়ে উত্তর আমেরিকার এই যৌথ বিড ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের অধিকার পায়। এটিই প্রথম বিশ্বকাপ, যা তিন দেশ মিলে আয়োজন করছে।
মাঠের ফলাফলেও ২০২৬ বিশ্বকাপ কানাডার জন্য বিশেষ হয়ে উঠেছে। টরন্টোতে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সঙ্গে ১-১ ড্র দিয়ে শুরু। এরপর ভ্যাঙ্কুভারে কাতারের বিপক্ষে ৬-০ গোলের বড় জয়। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ২৪ জুন সুইজারল্যান্ডের কাছে ২-১ গোলে হারলেও কানাডার পথ থামেনি। গ্রুপ বি থেকে দ্বিতীয় দল হিসেবে কানাডা উঠে গেছে রাউন্ড অব ৩২-এ। বিশ্বকাপে এটি কানাডার প্রথম নকআউট যাত্রা।
কানাডার বিশ্বকাপ আয়োজন ম্যাচসংখ্যায় সীমিত, কিন্তু গুরুত্বে বড়। টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভার ২০২৬ বিশ্বকাপের কানাডীয় মঞ্চ। ২০২২ সালের ১৬ জুন ফিফা এই দুই শহরকে কানাডার অফিসিয়াল হোস্ট সিটি হিসেবে ঘোষণা করে। ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত চলা টুর্নামেন্টে মোট ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে কানাডায় হচ্ছে ১৩টি। টরন্টো আয়োজন করছে ৬টি ম্যাচ, ভ্যাঙ্কুভার ৭টি। টরন্টোর BMO Field বিশ্বকাপের সময়ে Toronto Stadium নামে পরিচিত, আর ভ্যাঙ্কুভারের BC Place কানাডার ফুটবল উচ্ছ্বাসের আরেক বড় ঠিকানা।
হকি এখনো কানাডার ক্রীড়া-আবেগের বড় জায়গা দখল করে আছে। তবে অংশগ্রহণের বিচারে ফুটবলও বিশাল জায়গা করে নিয়েছে। Canada Soccer জানিয়েছে, ফুটবল কানাডার সবচেয়ে বড় অংশগ্রহণমূলক খেলা এবং দ্রুত বর্ধনশীল খেলাগুলোর একটি। প্রায় ১০ লাখ নিবন্ধিত অংশগ্রহণকারী ১,২০০ ক্লাবের মাধ্যমে দেশের ১৩টি প্রাদেশিক ও টেরিটোরিয়াল সংস্থার অধীনে যুক্ত আছে।
এই জনপ্রিয়তার পেছনে অভিবাসী সমাজের বড় ভূমিকা আছে। কানাডা এমন এক দেশ, যেখানে পৃথিবীর প্রায় সব ফুটবল সংস্কৃতি এসে বসতি গড়েছে। টরন্টোর এক পাড়ায় আর্জেন্টিনার পতাকা, আরেক পাড়ায় ব্রাজিলের জার্সি, কোথাও মরক্কোর ঢাক, কোথাও ইরানের গান, কোথাও পর্তুগালের লাল-সবুজ। বিশ্বকাপের সময় কানাডা যেন নানা দেশের মানুষের এক মিলনমেলা হয়ে ওঠে। এখানকার ফুটবল শুধু খেলাধুলা নয়, এটি স্মৃতি, শিকড়, পরিচয় ও নতুন দেশে মানিয়ে নেওয়ার এক সামাজিক ভাষা।
কানাডার নারী ফুটবল এই জনপ্রিয়তার আরেক শক্তি। কানাডার নারী দল লন্ডন ২০১২ ও রিও ২০১৬ অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জেতে, আর টোকিও ২০২০ অলিম্পিকে স্বর্ণপদক জয় করে। ক্রিস্টিন সিনক্লেয়ারদের প্রজন্ম কানাডার ফুটবলকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা দেশের সামগ্রিক ফুটবল সংস্কৃতিকে আরও শক্ত করেছে।
কানাডার ফুটবলের গল্প তাই একটু অন্যরকম। এখানে পুরোনো ইতিহাস আছে, দীর্ঘ ব্যর্থতা আছে, আবার ফিরে আসার শক্তিও আছে। হকির দেশ ফুটবলকে জায়গা করে দিচ্ছে, আর ফুটবলও কানাডাকে নতুনভাবে চিনতে শেখাচ্ছে। ১৮৭৬ সালের শুরু থেকে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ মঞ্চ পর্যন্ত কানাডার ফুটবল যেন ধীরে ধীরে বলে যাচ্ছে, এই দেশ শুধু বরফের মাঠে নয়, সবুজ ঘাসের মাঠেও নিজের ভবিষ্যৎ লিখতে চায়।
তথ্যসূত্র: Canada Soccer, FIFA, Reuters