যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় বাংলাদেশি দুই পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি হত্যাকাণ্ডে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। তদন্ত নথিতে দেখা গেছে, এই দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকেই গ্রেফতার আমেরিকান খুনি হিশাম সালেহ আবুঘরবেহ লাশ গুমের কৌশল জানতে চ্যাটজিপিটির দ্বারস্থ হয়েছিল। ‘কালো আবর্জনার ব্যাগে মানুষের লাশ ডাস্টবিনে ফেলে দিলে কী হতে পারে’ বা ‘বন্দুকের শব্দ প্রতিবেশীরা শুনতে পাবে কি না’-এমন ভয়ংকর সব প্রশ্ন করে সে প্রমাণ নষ্টের ছক কষেছিল।
এদিকে লিমনের ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধারের দুই দিন পর রোববার ফ্লোরিডার পিনেলাস কাউন্টির একটি জলাশয় থেকে লাশের আরেকটি অংশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ধারণা করা হচ্ছে, এটি নিখোঁজ বৃষ্টির দেহাবশেষ। তবে পরিচয় নিশ্চিত হতে ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে। অন্যদিকে তাদের লাশ দেশে পাঠাতে মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে মায়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেট। সোমবার বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গিয়ে সমবেদনা জানান ডিসি-ইউএনও।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা ক্যাম্পাসের বাইরে লিমনের সঙ্গে একই অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন আবুঘরবেহ। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন শিক্ষার্থী। লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার পর ফরেনসিক দল লিমনের অ্যাপার্টমেন্টে যায় এবং সেখানে তারা রক্তের চিহ্ন খুঁজে পায়। ওই কমপ্লেক্সের ভেতর আবর্জনা রাখার জায়গায় তারা লিমনের মানিব্যাগ ও চশমা এবং একটি গোলাপি রঙের আইফোন কাভার খুঁজে পায়। সেটি নিখোঁজ আরেক শিক্ষার্থী নাহিদা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হয়। ফরেনসিক দলটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতর রক্তে ভেজা কাপড়ের টুকরাও খুঁজে পায়।
আবুঘরবেহর বিরুদ্ধে দুটি হত্যার অভিযোগ এনেছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে পুলিশ বলেছে, শুক্রবার ফ্লোরিডার হাওয়ার্ড ফ্রাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কয়েকটি কালো রঙের আবর্জনা ফেলার ব্যাগে লিমনের লাশ খুঁজে পাওয়া যায়। আদালতের নথি অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তারা আবুঘরবেহর ফোন ঘেঁটে কিছু তথ্য পেয়েছেন। সেই তথ্যানুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন আগে থেকেই আবুঘরবেহ চ্যাটজিপিটিকে একাধিক প্রশ্ন করেছিলেন। ১৩ এপ্রিল করা প্রথম প্রশ্নে তিনি ‘একজন মানুষকে’ ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া সম্পর্কে জানতে চান।
নথি অনুযায়ী, চ্যাটজিপিটি এর উত্তরে বলে, এটি ‘বিপজ্জনক শোনাচ্ছে।’ তিনি চ্যাটজিপিটিকে আরও জিজ্ঞেস করেন, ‘একটি গাড়ির যানবাহন শনাক্তকরণ নম্বর (ভিআইএন) কি পরিবর্তন করা যায়?’ এবং ‘লাইসেন্স ছাড়া বাড়িতে কি বন্দুক রাখা যায়?’ আরও জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেউ কি স্নাইপারের গুলিতে মাথায় আঘাত পাওয়ার পর বেঁচে গেছে?’ এবং ‘আমার প্রতিবেশীরা কি আমার বন্দুকের শব্দ শুনতে পাবে?’ তবে চ্যাটজিপিটি এসব প্রশ্নের উত্তর কী দিয়েছিল, তা নথিতে বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
তদন্তে পাওয়া অন্যান্য রেকর্ড অনুযায়ী, দুই শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার পর আবুঘরবেহ ১৬ এপ্রিল গভীর রাতে গাড়ি চালিয়ে কর্নি ক্যাম্পবেল কজওয়ে পার হয়ে স্যান্ড কি পার্ক এলাকায় যান। সেই রাতে তার গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার পথের সঙ্গে লিমনের মোবাইল ফোনের সিগন্যালের গতিপথ মিলে যায়। এরপর হঠাৎ সেটির সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়।
লাশের আরেকটি অংশ উদ্ধার, বৃষ্টির কিনা জানতে পরীক্ষা : স্থানীয় সময় রোববার পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের পিনেলাস কাউন্টি থেকে লাশের আরেকটি অংশ উদ্ধার করা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে দেহাবশেষের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। উদ্ধার করা দেহাবশেষ নারীর নাকি পুরুষের, তা এখনো নিশ্চিত করা হয়নি।
লাশ দেশে পাঠাতে কনস্যুলেট জেনারেল কাজ করছে : ওয়শিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, লিমন ও বৃষ্টির লাশ দেশে পাঠাতে মায়ামিতে অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেল সংশ্লিষ্ট মার্কিন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। পুলিশ বলেছে, নতুন করে পাওয়া লাশের খণ্ডিত অংশগুলো বর্তমানে পিনেলাস কাউন্টি মেডিকেল এক্সামিনারের দপ্তরে রাখা হয়েছে। দূতাবাস আরও জানায়, নিহত শিক্ষার্থীদের শোকার্ত পরিবারের সঙ্গেও দূতাবাস, কনস্যুলেট ও মন্ত্রণালয় থেকে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হয়েছে।
বৃষ্টির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ডিসি-ইউএনওর সমবেদনা : মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মর্জিনা আক্তার ও সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াদিয়া শাবাব সোমবার দুপুরে বৃষ্টির গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর এলাকায় যান। এ সময় বৃষ্টির চাচা দানিয়াল আকন, মো. ওবায়দুর রহমান, খোয়াজপুর ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান মাসুদুর রহমান, ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য বাদল ব্যাপারীর সঙ্গে কথা বলেন ডিসি। বৃষ্টির বাবা জহিরউদ্দিন দ্বীন মোহাম্মদ চাকরির সুবাদে পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তার সঙ্গেও ফোনে কথা বলে সমবেদনা জানান এবং যে কোনো প্রয়োজনে বৃষ্টির পরিবারের পাশে থাকবেন বলে আশ্বস্ত করেন।
বৃষ্টির বাবা জহির উদ্দিন জানান, ডিসি সাহেব আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। আমি মাদারীপুর গেলে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেছেন। তিনি বলেন, ফ্লোরিডা পুলিশ এখনো বৃষ্টির লাশের সঠিক সন্ধান পায়নি। তারা আমাদের অফিশিয়ালি কিছু জানায়নি। আমি অন্য মাধ্যমে জেনেছি, তারা একটি লাশের খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেছে, সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।