বাংলাদেশে নেপালের অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ রফতানির পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত হয়ে গেছে। ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (সিইএ) প্রয়োজনীয় অনুমোদন না দেয়ায় আগামী ১৫ জুন থেকে বাংলাদেশ আগের মতোই ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাবে। ফলে নেপালের সাথে বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারণের আশা আপাতত অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন- নেপালের সস্তা পানিভিত্তিক বিদ্যুৎ আমদানি করা গেলে ভারতের আদানির ব্যয়বহুল বিদ্যুতের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা থাকবে না। এ কারণে বাড়তি বিদ্যুৎ নেপাল সরবরাহ করুক তা ভারত চাইছে না।
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি (এনইএ) জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত নেপাল-ভারত যৌথ স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রফতানির বিষয়ে নীতিগত সম্মতি হয়েছিল। কিন্তু ভারতের ট্রান্সমিশন লাইনের সক্ষমতার অজুহাতে অনুমোদন আটকে গেছে। বর্তমানে নেপালের ত্রিশূলী ও চিলিমে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। ২০২৪ সালে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় প্রতি বছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করে।
আদানি বিদ্যুতের সাথে বড় পার্থক্য
নেপাল বাংলাদেশের কাছে প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট ঘণ্টা) বিদ্যুৎ বিক্রি করছে ৬.৪০ মার্কিন সেন্টে, যা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী প্রায় ৭.৮০ থেকে ৮.০০ টাকা প্রতি ইউনিটের সমান। অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট অনুমোদন পেলেও একই দামে বিদ্যুৎ সরবরাহের কথা জানিয়েছে এনইএ।
অন্য দিকে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনছে। বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এবং জ্বালানি বিশ্লেষকদের প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, আদানি বিদ্যুতের গড় সরবরাহ মূল্য জ্বালানি ব্যয়সহ অনেক সময় প্রতি ইউনিট ১২ থেকে ১৪ টাকা, আবার আন্তর্জাতিক কয়লার দামের ওঠানামার সময় তা আরো বেশি হয়েছে।
ফলে তুলনামূলকভাবে দেখা যায়-
উৎস প্রতি ইউনিট মূল্য (আনুমানিক)
নেপালের জলবিদ্যুৎ ৭.৮-৮.০ টাকা
আদানি পাওয়ার (গোড্ডা) ১২-১৪ টাকা বা তার বেশি
অর্থাৎ নেপালের বিদ্যুৎ আদানি বিদ্যুতের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত সস্তা হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের জলবিদ্যুৎ শুধু সস্তাই নয়, এটি নবায়নযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানির উৎস। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে এলএনজি, কয়লা ও আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। ফলে তুলনামূলক কম দামে জলবিদ্যুৎ পাওয়া গেলে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয়ও কমানো সম্ভব।
তবে দক্ষিণ এশিয়ার আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্যে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। নেপালের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে পৌঁছাতে ভারতীয় ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে হয়। ফলে ভারতীয় অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ-নেপাল বিদ্যুৎ বাণিজ্যের সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বর্তমানে বাংলাদেশ নেপাল থেকে মাত্র ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছে, যা দেশের মোট চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য। কিন্তু নেপালের জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনা ৪০ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে কয়েক শ’ মেগাওয়াট থেকে হাজার মেগাওয়াট পর্যায়েও বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেই প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত ২০ মেগাওয়াট রফতানি আটকে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি প্রযুক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বাংলাদেশের স্বল্পমূল্যের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রাপ্তির প্রশ্নের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।