বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক বৈষম্য কমানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে। তবে বাস্তবতার দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে নারীরাই সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হয়। পারিবারিক আয় সীমিত হওয়া, অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সামাজিক বৈষম্যের কারণে অনেক নারী জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণেও সংগ্রাম করে। ফলে নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়বদ্ধতা নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। এই বাস্তবতায় পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে। এই কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, কার্ডটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা হবে এবং আর্থিক সহায়তা সরাসরি তার মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দেওয়া হবে। ফলে একদিকে দরিদ্র পরিবারগুলো নিয়মিত নগদ অর্থ সহায়তা পাবে, অন্যদিকে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার ভূমিকা শক্তিশালী হবে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল দর্শন হলো, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক।’ অর্থাৎ সহায়তার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে পরিবার। একটি পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং শিশুদের ভবিষ্যতের ওপর প্রতিফলিত হয়। নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগের সম্ভাবনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত দরিদ্র পরিবারের নারীরা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সীমিত ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যদি সামাজিক সহায়তা সরাসরি তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়, তাহলে তারা পরিবারে ব্যয় ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গবেষণায় দেখা গেছে, নারীর হাতে অর্থ পৌঁছালে তা শিশুদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশি ব্যয় করা হয়। ফলে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নারীর ক্ষমতায়নের পাশাপাশি শিশুদের উন্নয়ন এবং পারিবারিক কল্যাণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবারভিত্তিক ও নারীকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সফল উদাহরণ রয়েছে। লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলে পরিচালিত Bolsa Familia কর্মসূচি পরিবারভিত্তিক নগদ সহায়তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এই কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র পরিবারগুলোকে নিয়মিত নগদ সহায়তা দেওয়া হয় এবং অর্থ সরাসরি মায়ের ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কর্মসূচি চরম দারিদ্র্য হ্রাস এবং শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। একইভাবে মেক্সিকোর Progresa/Oportunidades কর্মসূচিও শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যুক্ত শর্তযুক্ত নগদ সহায়তা প্রদান করে, যা মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশু শিক্ষার উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের Benazir Income Support Programme (BISP)(ইওঝচ) নারীকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ, যেখানে দরিদ্র পরিবারের নারী সদস্যদের সরাসরি নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট হয় যে, নারীকেন্দ্রিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশেও যদি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি নারীর আর্থিক ক্ষমতায়ন এবং পারিবারিক কল্যাণ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
এখন প্রশ্ন হলো- কোথায়, কীভাবে, কত ব্যয়ে এটির বাস্তবায়ন হবে? সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর যৌথভাবে প্রণীত ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন ২০২৬ (খসড়া)’ অনুযায়ী প্রথম ধাপে দেশের ১৪টি নির্বাচিত এলাকায় ৬,৫০০ দরিদ্র পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। মোট বাজেট ধরা হয়েছে ২ কোটি ১০ লাখ ৭২ হাজার ৩২৫ টাকা, যার ১ কোটি ৬২ লাখ টাকা (৭৭%) সরাসরি উপকারভোগীদের হাতে যাবে। দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও অনগ্রসরতার মাত্রা বিবেচনায় ১৪টি এলাকা বাছাই করা হয়েছে। উপকারভোগী নির্বাচন হবে ‘প্রক্সি মিনস টেস্ট (PMT)’ স্কোরিং পদ্ধতিতে (০-১০০০ স্কোর)। প্রথম (০-৭৭৭) ও দ্বিতীয় (৭৭৮-৭৯৬) কোয়ান্টাইলে থাকা অতি দরিদ্র ও দরিদ্র পরিবার পাইলটে অন্তর্ভুক্ত হবে। যেখানে যোগ্যতার শর্ত রাখা হয়েছে- গ্রামে বসতভিটাসহ আবাদি জমি সর্বোচ্চ ০.৫০ একর; সরকারি চাকরিজীবী/পেনশনভোগী সদস্য, বড় ব্যবসা বা বাণিজ্যিক লাইসেন্সধারী পরিবার এবং বিলাসবহুল সম্পদ (গাড়ি, এসি) থাকলে অযোগ্য। অগ্রাধিকার পাবে ভূমিহীন, গৃহহীন, প্রতিবন্ধী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠী (তৃতীয় লিঙ্গ, বেদে, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী)। কার্ড ইস্যু হবে পরিবারের ‘মা’ বা নারী প্রধানের নামে; প্রতি পরিবার মাসে ২,৫০০ টাকা পাবে। অর্থ সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক হিসাবে জি-টু-পি পদ্ধতিতে যাবে। একই স্মার্ট কার্ড ও ওটিপি ভেরিফিকেশনে সাশ্রয়ী খাদ্য সহায়তাও পাওয়া যাবে; ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি, কৃষি ভর্তুকি যুক্ত হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে এই কর্মসূচিকে সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ডে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে একটি প্ল্যাটফর্মে একত্রিত করতে সহায়ক হবে।
ফ্যামিলি কার্ড একটি সমন্বিত ও ডিজিটাল সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ হলেও এর সফল বাস্তবায়ন বেশ কিছু কাঠামোগত, প্রশাসনিক ও আর্থিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। নীতিগতভাবে উদ্যোগটি পরিচালনা করছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সমাজসেবা অধিদপ্তর। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন মাত্রা তৈরি করতে পারে। প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থায়ন ও আর্থিক টেকসইতা। পাইলট পর্যায়ে ৬,৫০০ পরিবারকে মাসিক ২,৫০০ টাকা প্রদান করলে ব্যয় সীমিত থাকবে; কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে যদি ২০-২৫ লাখ বা ততোধিক পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে বার্ষিক ব্যয় কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। যেখানে প্রধানমন্ত্রী ৪ কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। এতে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় জিডিপির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। সরকার সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও এর জন্য স্থায়ী রাজস্ব উৎস, কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, আত্মনির্ভরতার পরিবর্তে পরনির্ভরতার ঝুঁকি রয়েছে। মাসিক নগদ সহায়তা তাৎক্ষণিকভাবে দরিদ্র পরিবারের ভোগক্ষমতা ও খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ালেও, যদি এটি দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র উদ্যোগ সহায়তা বা আয়বর্ধক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে এটি কেবল ভোগনির্ভর সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল সক্ষমতা বৃদ্ধি না পেলে দরিদ্রতা কাঠামোগতভাবে কমবে না; বরং নিয়মিত ভাতার ওপর নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা একটি বড় প্রশ্ন।
উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে-শুধু সরকারি কর্মচারীদের দিয়ে গঠিত কমিটি কীভাবে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে? নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বা কমিউনিটির অংশগ্রহণ সীমিত হলে সামাজিক আস্থা দুর্বল হতে পারে। ওয়ার্ড পর্যায়ে যদি অনিয়ম বা ঘুষের মাধ্যমে নাম অন্তর্ভুক্ত হয়, উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা বাস্তবে কতটা সরেজমিন যাচাই করতে পারবেন? প্রত্যন্ত এলাকা, চর বা দুর্গম অঞ্চলে নিয়মিত তদারকি করার মতো পর্যাপ্ত জনবল ও সময় কি রয়েছে-এই প্রশ্ন অস্বাভাবিক নয়। চতুর্থত, ডিজিটাল অবকাঠামো ও তথ্য সুরক্ষা একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। জি-টু-পি পদ্ধতিতে সরাসরি অর্থপ্রদান এবং কিউআর কোড ও ওটিপি যাচাই ব্যবস্থার কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং নিরাপদ তথ্য ব্যবস্থাপনার ওপর। প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ডেটা আপডেটের ঘাটতি থাকলে প্রকৃত দরিদ্র বাদ পড়তে পারে বা অযোগ্য ব্যক্তি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি নগদ সহায়তা কর্মসূচি নয়; এটি রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং সুশাসনের মান যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। টেকসই অর্থায়ন, উৎপাদনশীল সংযোগ এবং বহুমাত্রিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে এটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তরমূলক ভূমিকা রাখতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক (সিলেকশন গ্রেড), সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।