ঐতিহাসিকভাবেই ঢাকা ছিল মশার রাজ্য। মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে মুঘলরা বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিল। ইংরেজ শাসনামলেও পুরানা পল্টনের ক্যান্টনমেন্ট ছিল বেয়ারা সৈনিকদের 'পানিশমেন্ট পোস্টিং'—মশার কামড় খাইয়ে সোজা করার জায়গা! কালক্রমে ব্রিটিশ গেল, পাকিস্তান এলো, ঢাকা হলো পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী। নতুন দেশ, লাখ লাখ মানুষের ঢল; কিন্তু মশার যন্ত্রণা কমলো না বিন্দুমাত্র। ঠিক সেই সময়েই স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে দৃশ্যপটে এলেন ফেনীর কৃতিসন্তান, সাবেক ফুটবল অধিনায়ক মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী। কথা কম বলে কাজে বিশ্বাসী এই মানুষটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ হাজারের মতো মশার ওষুধ ছিটানোর যন্ত্র আনালেন, গভীর ড্রেন কাটলেন, বর্জ্য ব্যবস্থা আধুনিক করলেন, খাল-পুকুর পরিষ্কার করালেন। এমনকি ইস্পাহানীর সহায়তায় মশার ওষুধ ছিটানোর দুটি বিমান পর্যন্ত কেনা হলো! মাত্র দুই বছরে ঢাকার মশাকে এমনভাবে দমন করেছিলেন যে, ১৯৭৫-৭৬ সাল পর্যন্তও ঢাকাবাসী মশারি ছাড়া ঘুমাতে পারতো। যক্ষ্মা ও মশক নিবারণে তার এই অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
ইতিহাসের সেই বিমান কিংবা ম্যানুয়াল স্প্রে-র দিন পেরিয়ে মশা মারার লড়াইটা আজ কিন্তু থেমে নেই; বরং পৌঁছে গেছে মহাকাশ গবেষণার যুগের অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে। 'মশা মারতে কামান দাগানো' প্রবাদ শোনেনি—এমন বাংলাভাষী খুঁজে পাওয়া দায়। প্রাচীন এই লোকভাষ্যকে এতদিন আমরা রূপক হিসেবেই দেখে এসেছি। তবে এবার সেই হাস্যোদ্দীপক প্রবাদের পথ ধরেই হাঁটা শুরু করেছে চীন। পার্থক্য একটাই—এখানে কোনো ভারী কামান নেই, নেই বারুদের ধোঁয়া; বরং তার জায়গায় হাজির হয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক অনন্য বিস্ময়—লেসার রশ্মি! হবীবুল্লাহ বাহারের বিমানের বদলে এখন মশার বিরুদ্ধে নেমেছে চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও লেসার রশ্মির অপ্রতিরোধ্য 'এয়ার ডিফেন্স' ব্যবস্থা। কালের পরিক্রমায় কৌশল পাল্টালেও, মশার বিরুদ্ধে মানুষের এই প্রযুক্তিনির্ভর সংগ্রাম যেন চিরন্তন!
ঘটনাটি বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জগতের। বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন আন্তর্জাতিক পাঠকদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে নিয়মিত কাজ করছেন আলজেরীয় বংশোদ্ভূত সংবাদকর্মী আরেজকি আমিরি। জাপানে বসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম 'দ্য ডেইলি গ্যালাক্সি'র প্রধান সম্পাদক এবং প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। আন্তর্জাতিক গবেষণা কীভাবে মানুষের স্বাস্থ্য ও সমাজকে বদলে দিচ্ছে, তা সহজ ভাষায় তুলে ধরাই তার প্রধান কাজ। গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিনি চীনের এক অদ্ভুত অথচ অত্যন্ত চমকপ্রদ প্রযুক্তিগত অভিযানের বিশদ তথ্য সামনে এনেছেন।
সেকেন্ডে ৩০টি মশা ধ্বংস করতে সক্ষম এক পোর্টেবল বা বহনযোগ্য লেসার যন্ত্র বানিয়ে বিশ্বজুড়ে রীতিমতো হৈ চৈ সৃষ্টি করেছে চীনের জিয়াংসু প্রদেশের চাংঝৌ শহরের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান 'ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাব'। যন্ত্রটির নাম দেয়া হয়েছে 'ফোটন ম্যাট্রিক্স'। শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত লেসার প্রযুক্তিকে সাধারণ মানুষের ব্যবহারযোগ্য ছোট যন্ত্রে রূপান্তর করে এই মশারোধী 'এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম' বা নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। এটি বাজারে আনার উদ্দেশ্যে ক্রাউডফান্ডিং বা জন অর্থায়নের প্ল্যাটফর্ম 'ইন্ডিগোগো'-তে প্রাথমিক তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ২০ হাজার মার্কিন ডলার। কিন্তু চমকপ্রদ এই প্রযুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিশ্বজুড়ে গ্রাহকদের মধ্যে অভূতপূর্ব উন্মাদনা তৈরি হয়। মাত্র কিছুদিনেই ৫০টিরও বেশি দেশের চার হাজারের বেশি মানুষ এই উদ্যোগে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। ফলে সংগৃহীত তহবিলের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ মার্কিন ডলারেরও বেশি, যা তাদের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রাকে বহুগুণ ছাড়িয়ে গেছে।
বিষয়টি কেবল প্রযুক্তিগত কৌতুহলের নয়, এর পেছনে রয়েছে এক গভীর বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য সংকট। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মশাবাহিত ভয়াবহ রোগ—যেমন ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকনগুনিয়া ও এনসেফালাইটিসে বিশ্বে প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষ আক্রান্ত হয় এবং প্রাণ হারায় এক লাখেরও বেশি মানুষ। মশা তাড়াতে বা মারতে রাসায়নিক কেমিক্যালের বিষাক্ত ব্যবহার স্বাস্থ্য ও পরিবেশ উভয় দিক থেকেই ক্ষতিকর। ফলে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার না করে, শুধু বিদ্যুতে চলে এমন এক নিখুঁত স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষাকবচের বাণিজ্যিক চাহিদা বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত ব্যাপক।
কিন্তু কীভাবে কাজ করে এই পোর্টেবল লেসার প্রতিরক্ষা যন্ত্র? ফোটন ম্যাট্রিক্স মূলত দুটি সুনির্দিষ্ট ধাপে শিকার ধরে। প্রথম ধাপে এতে থাকা 'লিডার' (LiDAR— আলোক রশ্মি ব্যবহার করে কোনো বস্তুর সুনির্দিষ্ট দূরত্ব ও অবস্থান মাপার প্রযুক্তি) মডিউল চারপাশ স্ক্যান করে। উড়ন্ত মশার অবস্থান, কোণ ও আকার মাত্র তিন মিলিযেকন্ডের মধ্যে মেপে ফেলে এটি। দ্বিতীয় ধাপে নিজস্ব গণনানির্ভর ট্র্যাকিং ও এআই ভিশন মডিউলের মাধ্যমে নিশানা ঠিক করে লেসার রশ্মি ছুড়ে মশাটিকে মাঝআকাশেই ভস্ম করে দেয়। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এতে অ্যালগরিদম ভিত্তিক বিশেষ সুরক্ষাবলয় যুক্ত করা হয়েছে। স্ক্যানিং জোনে লেসার নির্গমনের পথে কোনো মানুষ বা পোষা প্রাণী থাকলে যন্ত্রটি থেকে কখনোই লেসার রশ্মি বের হবে না।
যন্ত্রটি সেকেন্ডে ৩.৩ ফুট (১ মিটার) গতিতে ওড়া বস্তুকে সনাক্ত করতে পারে। সাধারণ মশার উডার গতি ঠিক এমনই হয়। তবে মাছি বা দ্রুতগতির অন্যান্য পতঙ্গ এই নির্ধারিত গতির সীমা ছাড়িয়ে যায় বলে সেগুলো যন্ত্রের হাত থেকে রেহাই পেয়ে যায়। এর প্রাথমিক বা বেসিক সংস্করণের কাজের পরিধি ৯.৮৪ ফুট (৩ মিটার) এবং ৯০ ডিগ্রি স্ক্যানিং কোণ, যার 'আর্লি বার্ড' দাম রাখা হয়েছিল ৪৬৮ ডলার। অন্যদিকে 'প্রো' সংস্করণটি ১৯.৬ ফুট (৬ মিটার) দূরত্ব পর্যন্ত কাজ করতে পারে এবং এর নির্ধারিত দাম ৬৬৮ ডলার। ব্যাপক উৎপাদনে গেলে প্রতিটি যন্ত্রের গড় মূল্য পড়বে প্রায় ৬৩০ ডলার। ওয়াটারপ্রুফ বা পানিনিরোধক হওয়ায় এটি যেকোনো পোর্টেবল পাওয়ার ব্যাংকে যুক্ত করে বাড়ির উঠোন, বারান্দা বা বাগানে সহজেই বসানো যাবে।

চাংঝৌ শহরের শক্তিশালী উৎপাদন অবকাঠামো বা সাপ্লাই চেইনের অবস্থানের কারণেই এই কঠিন প্রযুক্তি বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ফোটন ম্যাট্রিক্স ল্যাবের বিক্রয় পরিচালক লরেন্স লেং জানান, যুক্তরাষ্ট্রের সিলিকন ভ্যালির মতো প্রযুক্তি অঞ্চলে হাই-প্রিসিশন ফাইবার লেসার মডিউলের প্রোটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেল তৈরিতে যেখানে কয়েক সপ্তাহ বা মাস পার হয়ে যেত, সেখানে চাংঝৌয়ের স্থানীয় বাজারে হাতের কাছেই সব প্রয়োজনীয় পার্টস ও ল্যাব সুবিধা পাওয়া গেছে। শিল্পকারখানা ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত কম খরচের লিডার সেন্সর, এজ কম্পিউটিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত ক্যামেরা মডিউলকে এক ছাদের নিচে এনে এমন একটি আধুনিক ভোক্তা পণ্য তৈরি করতে পেরেছে চীনা দলটি।
তবে বিশাল তহবিল সংগ্রহ ও বিশ্বব্যাপী আলোচিত হলেও যন্ত্রটির আন্তর্জাতিক বাজারজাতকরণে কিছু বাস্তবিক জটিলতা দেখা দিয়েছে। চলতি বছরের গ্রীষ্মের শুরুতেই এটি সমর্থকদের হাতে তুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও জটিল সেন্সর ক্যালিব্রেশন ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলের কারণে গণ-উৎপাদন বা 'মাস প্রোডাকশন' পিছিয়ে আগামী আগস্ট মাসে নির্ধারণ করা হয়েছে। তাছাড়া পশ্চিমা বাজারে পণ্যটি বিক্রির জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছাড়পত্র প্রয়োজন। বিশেষ করে ইউরোপীয় সিই এবং যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ-এর মতো প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ।
প্রবাদের 'কামান' আর আধুনিক 'লেসার'—দুয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আজ বিশ্ববাসী দেখছে মশা নিধনের এক অবিশ্বাস্য প্রযুক্তিগত রূপান্তর। পঞ্চাশের দশকে পূর্ব বাংলায় হাবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী যেভাবে বিমান থেকে ওষুধ ছিটিয়ে কিংবা মার্কিন প্রযুক্তি এনে মশামুক্ত ঢাকা গড়েছিলেন, চীনের এই নতুন উদ্ভাবন যেন তারই আধুনিকতম ও ডিজিটাল সংস্করণ।
বাস্তব ক্ষেত্রে এই 'পোর্টেবল এয়ার ডিফেন্স' ঠিক কতটা কার্যকরভাবে মশা দমন করতে পারে, তা দেখতে ৫০টিরও বেশি দেশের চার হাজারেরও বেশি গ্রাহক এখনো আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের এই নতুন মেলবন্ধন সত্যিই সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন থেকে মশাউপদ্রব চিরতরে দূর করতে পারবে কি না, তা জানতে পণ্যটি আন্তর্জাতিক বাজারে শিপিং হওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে। তবে প্রবাদের সেই রূপক 'কামান' যে এবার বাস্তবের লেসার রশ্মি হয়ে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দারুণ এক সত্যতা তৈরি করতে চলেছে, তা নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই!