ধরা যাক, রাস্তায়, খেলার মাঠে কিংবা অফিসে কেউ আপনাকে দু-চারটা অযাচিত কটূকথা শোনাল। অভিযুক্তকে আপনি সহজেই চিনে নিতে পারবেন। কিন্তু যে অসীম ভার্চুয়াল জগতে আমাদের পদচারণা, সেটি যেন সার্বক্ষণিক চলমান একটি রণক্ষেত্র। সবসময় একটা যুদ্ধংদেহী অবয়ব সবার। কথায় কথায় কথাকাটাকাটি, গালমন্দ আর বিশ্রী আক্রমণ।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেওয়ার পাশাপাশি নিয়ে এসেছে অব্যাহত হয়রানি, হুমকি আর লাঞ্ছনার মতো বিপদগুলো। “সাইবার বুলিং” হিসেবে পরিচিত এ আচরণকে নিছক “ছেলেমানুষি” কিংবা “ইন্টারনেটের নাটকীয়তা” বলে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এটি একটি সুসংগঠিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধাবস্থা, যা পুরো একটি প্রজন্মের মানসিক সুস্থতাকে ঠেলে দিচ্ছে প্রশ্নের মুখে।

বাংলাদেশে গত দুই বছরে সাইবার বুলিংয়ের মাত্রা বেড়েছে আশঙ্কাজনক হারে। অভিনয়শিল্পী, ইনফ্লুয়েন্সার, খেলোয়াড় থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ কেউই এর প্রভাবমুক্ত নন।

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো সাইবার বুলিংয়ের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ধরুন, খেলার মাঠে কারও সঙ্গে আপনার দ্বিমত থেকে দু-চারটা উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হলো, ঘটনা সেখানেই মিটিয়ে উভয়পক্ষ বাড়ি ফিরে গেলেন। কিন্তু ডিজিটাল মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তেই একজন ব্যক্তি নানাভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন। প্রতি মুহূর্তে কারও না কারও নজরদারিতে থাকতে পারেন ভুক্তভোগী। এমন অবস্থায় মস্তিষ্ক চাপমুক্ত হতে গিয়ে “লড়াই অথবা পালানো”-এর সিদ্ধান্ত নেয়। সে জিততে চায়। এখানেই ঘটে যায় মারাত্মক বিপত্তি।

চেনা নেই, জানা নেই, এমনকি দূরতম সম্পর্কও নেই, অথচ সদ্য কেনা লাখ টাকা দামের ফোন থেকে মফস্বল শহরের কিশোরটি কোনো এক গুণী ব্যক্তিকে বলে বসল “ফ্রড”! দ্য ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে নিজের ক্ষতি করা কিংবা আত্মহত্যার প্রবণতা অন্যান্যদের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

মূলত তিনটি কারণ উঠে এসেছে গবেষণায়—

স্থায়িত্ব: আক্রমণাত্মক ডিজিটাল কন্টেন্টগুলো সবসময়ই খুঁজে পাওয়া যায় কোথাও না কোথাও। দীর্ঘকাল ধরে বিশ্রী আক্রমণে ভুক্তভোগীর মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি হয়, বিশেষজ্ঞরা যাকে বলেন “ডিজিটাল স্টেইন”। অর্থাৎ, মানুষটা ধরেই নেয় এই অব্যাহত লাঞ্ছনার কবল থেকে তার নিস্তার নেই।

প্রসারের ব্যাপকতা: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি কন্টেন্ট সেকেন্ডের মধ্যে হাজারো মানুষের চোখে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ একটি পোস্টের রিয়্যাকশন, ভিউ কিংবা কমেন্ট যত বেশি হয়, ভুক্তভোগী ব্যক্তিও নিজেকে তত বেশি অপমানিত মনে করেন।

মুখোশের ভয়াবহতা: আক্রমণকারীরা প্রায়ই পরিচয় গোপন রেখে তুমুল সাইবার বুলিং চালিয়ে যায়। এতে ভুক্তভোগীর মনে এক ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষটি সম্পর্কে দ্বিধার সৃষ্টি হয় তার মনে। সে ভাবতে থাকে, আক্রমণকারী কি পরিচিত, নাকি অচেনা কেউ?

দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব

সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে মানুষের মধ্যে প্রাথমিকভাবে সামাজিক মেলামেশায় অনীহা (সোশ্যাল অ্যাংজাইটি) ও বিষণ্ণতা (ডিপ্রেশন) দেখা দেয়। অপমান মিশ্রিত সেই কন্টেন্ট সবাই দেখে নিয়েছে—এমনটা ধরে নিয়ে সে নিজেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করে সবকিছু থেকে।

ক্রমাগত সাইবার লাঞ্ছনার প্রভাব পড়ে ভুক্তভোগীর শরীরেও। মাথাব্যথা, পেটের অসুখ এবং মারাত্মক অনিদ্রার মতো সমস্যায় ভুগতে থাকেন তারা। এর কারণ মস্তিষ্কের ওপর পড়া ক্রমাগত ব্যাপক চাপ।

আজকাল অনেকের জন্য ভার্চুয়াল জগতই সবকিছু—তার পরিচিতির একমাত্র মাধ্যম। সেই মাধ্যমটি শত্রুময় হয়ে উঠলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভুক্তভোগী হয়ে পড়েন অসহায়।

সাইবার বুলিং কেন প্রাণঘাতী

শুনতে অবাক লাগলেও সত্যি যে, মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে ওঠা কিছু কমেন্ট হয়ে উঠতে পারে রীতিমতো প্রাণঘাতী! ক্রমাগত সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে থাকলে মানুষকে একসময় ঘিরে ধরে তীব্র অপরাধবোধ। ভেতরে ভেতরে সে নিজেকে “নির্যাতিত” ও “অসহায়” ভাবতে শুরু করে। তাই সাইবার বুলিংকে বলা হয় “মনুষ্যত্বের নিয়মতান্ত্রিক অবস্খলন”।

ভুক্তভোগীর মনে হতে থাকে, ডিজিটাল জগতে সবার চোখে সে ঘৃণার পাত্র, আর বাস্তবে তাকে বোঝার মতো কেউ নেই! দীর্ঘদিন সাইবার বুলিং চলতে থাকলে মস্তিষ্ক ধরেই নেয় “মৃত্যুই একমাত্র মুক্তির পথ”। এ কারণেই অনেক সময় তারকা বা ইনফ্লুয়েন্সাররা তাদের কমেন্ট বক্স বন্ধ রাখেন।

কেবল আত্মহত্যা নয়, সাইবার বুলিং হতে পারে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়ায় ব্যাঘাত এবং স্ট্রোকের কারণ। সাইবার জগতে অব্যাহত আক্রমণের শিকার মানুষটির শরীর তার অজান্তে “লড়াই অথবা পালানো”-এর মনস্তত্ত্বে প্রবেশ করে। ফলে শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন হরমোনের উৎপাদন বেড়ে যায়। দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, চরম মাত্রার মানসিক চাপ সরাসরি হার্ট অ্যাটাক (অ্যাকিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন) ও স্ট্রোকের কারণ।

অতিরিক্ত চাপের ফলে মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং ধমনী সংকুচিত হয়ে আসে। ফলে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয় কিংবা রক্তচাপ অতিরিক্ত বেড়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়।

এছাড়াও, ডাক্তারি পরিভাষায় “ব্রোকেন হার্ট সিন্ড্রোম” নামে একটি বিষয় রয়েছে। ভাইরাল সাইবার বুলিংয়ের শিকার বহু রোগীর হৃৎপিণ্ডের বাম প্রকোষ্ঠ হঠাৎ দুর্বল হয়ে পড়তে দেখেছেন চিকিৎসকরা।

(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews