চুল পড়া ঠেকাতে পেঁয়াজ, মেথি বা কালো জিরার তেল কি সত্যি কার্যকরী?

ছবির উৎস, Witthaya Prasongsin

ছবির ক্যাপশান,

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই চুল পড়া রোধের নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দেখা যায়

    • Author,

      জান্নাতুল তানভী

    • Role,

      বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা

  • Published

    ২ ঘন্টা আগে
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

জেনেটিকভাবেই চুল অনেক লম্বা, তবে বেশ পাতলা উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এর প্রতিকার চেয়ে একটি গ্রুপে পোস্ট দেন সুপ্রভা নীলি। এইচএসসি পরীক্ষার কিছুদিন আগে গত মাসে দেওয়া এই পোস্টে তিনি লিখেছেন, চুল নিয়ে তিনি চরম হতাশায় ভুগছেন।

"এমনিতেই চুল কম, তার উপর প্রতিদিন সকাল-বিকাল এভাবে চুল পড়লে আমার মাথায় তো আর চুলই থাকবে না। খুব ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছি আমি এটা নিয়ে" লিখেছেন মিজ নীলি।

আবার, মাথায় টাক রয়েছে, এমন ব্যক্তিদেরও চুল গজাবে এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন দেখা যায় হরহামেশাই।

মিজ নীলি যেমন সমস্যার সমাধান চেয়েছেন, ঠিক তেমনি আবার কালো জিরা, মেথি, পেঁয়াজের রস অথবা কারিপাতা- এ সব বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে তেল তৈরি করে চুল পড়ার সমাধানও দিতে দেখা যাচ্ছে ফেসবুকেই।

এসব পোস্টে বলা হচ্ছে, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে অর্গানিক এসব তেল বা হেয়ার প্যাক তৈরি করা হয়েছে। শতভাগ স্থায়ী সমাধানও দাবি করা হচ্ছে এসব পোস্টে।

কিস্তু প্রশ্ন হলো, পেঁয়াজের রস, মেথি, কালো জিরা বা এমন নানা উপাদানে তৈরি তেল কী আদৌ চুল পড়া রোধ করতে পারে? এগুলোর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আদৌ আছে?

অথবা এসব উপাদান কী পরিমাণে ব্যবহার করা উচিত, এগুলোর কী কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে?

আবার মিজ নীলির মতো যাদের বংশগত কারণে চুল কম বা পাতলা তাদের ক্ষেত্রেও কী এই ধরনের পদ্ধতিগুলো উপকারী, চিকিৎসকরাই বা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?

হেয়ার প্যাক বানানোর উপাদান

ছবির উৎস, Jordan Lye

ছবির ক্যাপশান,

হেয়ার প্যাক বানানোর উপাদান

মেথির মতো উপাদান ব্যবহারে কী বন্ধ হবে চুল পড়া?

নারীদের কারো পছন্দ দীঘল কালো চুল, কারো বা মাথাভর্তি ঘন কালো চুল, আবার কেউ কেউ ছোট চুল পছন্দ করেন।

তবে নারী-পুরুষ প্রত্যেকেরই পছন্দ পাতলা নয়, বরং ঘন চুল। কেউই চান না চুল ঝরে যাক।

আর এই চুল রক্ষায় বা যত্নে যুগে যুগে নানা ধরনের চিকিৎসা ও অপচিকিৎসা চলছে।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা স্বাস্থ্যসেবা সংস্থার(এনএইচএস) ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, চুল পড়া একটি স্বাভাবিক ব্যাপার। আমাদের অজান্তেই প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে যেতে পারে।

চুল পড়া সাধারণত দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের কোনো কারণ নয়, তবে মাঝে মাঝে এটি কোনো শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে।

এনএইচএস বলছে, কিছু ধরনের চুল পড়া স্থায়ী হয়। যেমন: পুরুষ ও মহিলাদের টাক পড়া।

এই ধরনের চুল পড়া সাধারণত বংশগত কারণে হয়ে থাকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে যুক্তরাজ্যের সরকারি এই স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে।

তবে টাক ছাড়া অন্যান্য ধরনের চুল পড়া সাময়িক হতে পারে।

যেমন: অসুস্থতা, মানসিক বা শারীরিক স্ট্রেস বা চাপ, হরমোনের অভাব, জেনেটিক্যাল, পুষ্টির অভাব, স্কাল্পে ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাসের আক্রমণ, ক্যান্সারের চিকিৎসা, ওজন কমা এবং আয়রনের অভাব এ ধরনের নানা কারণে চুল ঝরে যেতে পারে।

কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট ধরনের চুল পড়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে বলে উল্লেখ করেছে এনএইচএস।

বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেই চুল পড়া রোধের নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দেখা যায়।

এমনকি কেউ কেউ ব্যক্তি বিশেষেও নানা ধরনের উপাদান দিয়ে তৈরি টোটকা পদ্ধতি ব্যবহার করেন।

চুলে ব্যবহারের জন্য জবা ফুল, পেঁয়াজের রস, মেথি, কালো জিরা, কারি পাতা, রোজেলা, তিসি নানা ধরনের উপাদান দিয়ে তেল বা হেয়ার প্যাক তৈরি করে গ্যারান্টিসহ অনলাইনে বিক্রি করা হয়।

তবে, ডার্মাটোলোজিস্টরা বলছেন, জবা, মেথি, পেঁয়াজের রস বা এমন উপাদান দিয়ে তৈরি হেয়ার প্যাক বা তেল ব্যবহার করলেই যে চুল ঝরা রোধ হবে অথবা প্রচুর পরিমাণে নতুন চুল গজাবে এখন পর্যন্ত বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি।

নর্দার্ন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডার্মাটোলজি এন্ড ভিনিরিওলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তাসনীম খাঁন জানান, পেঁয়াজের রস, আমলকি, জবা ফুলে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটোরি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান রয়েছে। এগুলো মাথার স্কাল্পের অবস্থাকে ভালো করে।

তবে এখন পর্যন্ত চুল পড়া রোধ বা নতুন চুল গজাতে এগুলো সাহায্য করে, সেরকম প্রমাণ নেই বলে জানান ডা. খান।

"এই ধরনের হারবাল উপাদানে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটোরি, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভেজিটেবল প্রোটিন থাকে। অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটোরি অর্থ হলো দেহে কোনো ধরনের প্রদাহ হলে যে ওষুধগুলো ব্যবহার করা হয়, তাকে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটোরি মেডিসিন বলে।

"বাট কোনো স্ট্রং সায়েন্টিফিক এভিডেন্স এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয় নাই যে, এই ধরনের প্রডাক্টগুলা দিলে চুল পড়া বন্ধ হবে বা প্রচুর পরিমাণে চুল গজাবে, এ ধরনের কোনো স্ট্রং এভিডেন্স নেই" বলেন মিজ খান।

আন্তর্জাতিক গবেষণার কথা উল্লেখ করে এই ডার্মাটোলজিস্ট বলেন, মানুষের দেহে এ ধরনের কিছু উপাদান নিয়ে গবেষণায় কোন ফল পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, "কিছু কিছু প্রডাক্ট যখন ট্রায়ালে নিয়ে যাওয়া হইছে, তখন সেগুলার হিউম্যান বডির ওপরে তেমন কোনো স্ট্রং এভিডেন্সসহ ট্রায়াল নেই। কিন্তু এনিমেল বডিতেও দেখা গেছে যে, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে চুল নতুন করে গজায় কিন্তু এটা অনেক বেশি স্ট্রংলি প্রুভড নয়।"

তবে, কেবলমাত্র রোজমেরি তেল মাথার চুলে ব্যবহারে কিছুটা ভালো ফলাফল পাওয়া গেছে বলে জানান ডার্মাটোলজিস্ট ডা. তাসনীম খাঁন।

একজন ব্যক্তির প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে যেতে পারে

ছবির উৎস, Soumen Hazra

ছবির ক্যাপশান,

একজন ব্যক্তির প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০টি চুল ঝরে যেতে পারে

নতুন করে চুল না গজানোর কারণ সম্পর্কে মানবদেহের স্কাল্পে থাকা সুনির্ধারিত ও সুনির্দিষ্ট পরিমাণের হেয়ার ফলিকলের কথা উল্লেখ করেন মিজ খাঁন।

হেয়ার ফলিকল হলো মানব দেহের মাথার ত্বকের নিচে থাকা সেই কোষ যেটি থেকে চুলের উৎপত্তি বা তৈরি হয়। সেটি একজন ব্যক্তির দেহে একটা সুনির্দিষ্ট পরিমাণেই থাকে।

ডার্মাটোলজিস্ট ডা. তাসনীম খাঁন বলেন, "আল্লাহতায়ালা হেয়ার ফলিকলের অ্যামাউন্টটা এক্সাক্টলি অ্যামাউন্ট দিয়ে দিয়েছে। এটা নষ্ট হলে নতুন করে রিজেনারেশন হবে, সেটা কিন্তু না। যখন চুল ঝরা শুরু হয় বা ড্যামেজ হতে দেখি তখনই ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হয়।"

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ চিকিৎসা শুরু না করে হারবাল উপাদান ব্যবহার করে সময়টাকে দীর্ঘস্থায়ী করে ফেলে উল্লেখ করে তিনি জানান, "এ কারণেই হেয়ার ড্যামেজটা খুব ফার্স্ট হয়ে যায়। পরবর্তীতে হেয়ারটা রিগ্রোথ আর হয় না। যেটা মেডিকেশনের মাধ্যমে হওয়ার কথা ছিল।"

কিন্তু চুলে হারবাল উপাদান ব্যবহার করলে কী কোন উপকারিতাই পাওয়া যায় না- এমন প্রশ্নে তাসনীম খাঁন জানান, উপকারিতা আছে।

ডা. খাঁন বলেন, "যখন এই তেলগুলা স্কাল্পে ম্যাসাজ করা হয়, সায়েন্টিফিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেখানকার ব্লাড সার্কুলেশন কিছুটা ইম্প্রুভ বা উন্নত হচ্ছে। এটা ইম্প্রুভ হলে আমরা যে খাবার খাচ্ছি তার যে নিউট্রিশন সেটা ব্লাডের মধ্যে যাচ্ছে, নিউট্রিশন সাপ্লাই বা অক্সিজেন সাপ্লাই এটা হেয়ার ফলিকলের মধ্যে বেড়ে যায়। তখন কিছুটা হেল্প হচ্ছে।"

একইসঙ্গে, বংশগতভাবে যাদের চুল কম বা পাতলা থাকে তারা বা অল্প বয়সী যাদের চুল বেশি ঝরে পড়ে চিকিৎসার মাধ্যমে তা রোধ করা সম্ভব বলে জানান ডার্মাটোলজিস্ট ডা. তাসনীম খাঁন।

"যেমন: ২৪ বা ২৫ বছর বয়সে যাদের চুল পড়ে তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের মেডিসিন দিয়ে চুল পড়া রোধ করা হয়। কিন্তু এ ধরনের উপাদান দিয়ে চুল গজাবে বা পড়া রোধ করা যাবে বিষয়টি তা নয়" বলেন ডা. খাঁন।

আমলকি

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান,

আমলকিতে থাকা প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট চুলের যত্নে উপকারি

চুলে ব্যবহার করবেন নাকি খাবেন?

অ্যালোভেরা, আমলকী, পেঁয়াজ, রসুন, তুলসী, মেথি- এমন নানা উপাদানে চুলের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ই এবং বি-১২, ফলিক এসিড, জিঙ্ক, ফাইবার, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, খনিজ উপাদান এবং নাইট্রোজেনসহ নানা উপাদান থাকে, যা চুলের গোড়া মজবুত করে বৃদ্ধিতে সহায়তা করে এবং মাথার ত্বকের পুষ্টি যোগায়।

একইসঙ্গে, কোষের বিকাশে সহায়তা, খুঁশকি প্রতিরোধসহ চুলের নানা ধরনের গঠনে সহায়তা করে বলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের সরকারি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের এই ওয়েবসাইটে, এসব উপাদান বাহ্যিকভাবে ব্যবহারের চেয়ে রস হিসেবে বা মুখে খেলে চুলের স্বাস্থ্যের বেশি উপকার হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডার্মাটোলজিস্ট বা চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ আসিফ ইমরান সিদ্দিকীও একই কথা বলছেন।

তিনি জানান, "কেউ যদি এসব উপাদান ব্যবহার করতে চায় আমি বরাবরই নিষেধ করি। বরং এসব উপাদান খেতে হবে বেশি করে। যেমন: চুল পড়ছে বলে ডিম মাথায় মাখলে কিন্তু সেটা মাথায় ঢোকে না। তার মানে আমাদের স্কিন সবচেয়ে বিগেস্ট বা বড় অর্গান। এটা সবচেয়ে প্রথম ফার্স্টলাইন ইমিউনিটি দেয়।"

ঠিক কী পরিমাণ, কোন উপাদান কোন মাত্রায় বা কোন রেসিপি অনুসরণ করে হারবাল উপাদান দিয়ে এসব হেয়ার প্যাক বা তেল তৈরি করা হচ্ছে, তাতে যথাযথ পরিমাণ উপাদান আছে কিনা তা না জেনে অনলাইনে দেখেই কেনা যাবে না বলে পরামর্শ দিচ্ছেন এই ডার্মাটোলজিস্ট।

হারবাল উপাদানের সংরক্ষণের নির্ধারিত সময় থাকে ফলে দীর্ঘ সময়ের জন্য এসব উপাদানে তৈরি হেয়ার প্যাক বা তেল এবং ফেসপ্যাক ব্যবহারে চিকিৎসক হিসেবে রোগীদের নিরুৎসাহিত করেন বলে জানান তিনি।

বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার মতো দেশে তেল ব্যবহারের প্রচলন বেশি উল্লেখ করে ডার্মাটোলজিস্ট আসিফ ইমরান সিদ্দিকী বলেন, সবারই যে তেল ব্যবহার করতে হবে, তা নয়।

"যাদের মাথা অলরেডি তৈলাক্ত তারা যদি সবসময় তেল দেয় তাহলে মাথার চুল পাতলা হয়ে উঠে যাবে, খুঁশকি বেশি হবে। যার প্রয়োজন সে পরিমিত ব্যবহার করবে। বিশেষ করে যাদের চুল কোঁকড়া বা অনেক শুষ্ক তাদের ক্ষেত্রে স্কাল্পে না চুলে হালকা তেল ব্যবহার করলে চুল মসৃণ হয়। এটা তাদের জন্য কন্ডিশন হিসেবে ব্যবহৃত হয়" বলেন ডার্মাটোলজিস্ট ডা. সিদ্দিকী।

এমনকি কারো কারো জন্য চুলে তেল বা পেঁয়াজের রস, মেথি, জবা বা অ্যালোভেরা ধরনের উপাদান ব্যবহার করাই যায় না নতুবা তার অন্য রোগ বেড়ে যায় বলেও উল্লেখ করেন ডার্মাটোলজিস্ট আসিফ ইমরান সিদ্দিকী।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews