গাজা উপত্যকা ও পশ্চিম তীরে চলমান মানবিক সংকট মোকাবিলায় ফিলিস্তিনিদের জন্য অতিরিক্ত ১০ কোটি ডলারের ফেডারেল সহায়তা তহবিল ঘোষণা করেছে কানাডা সরকার। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনীতা আনান্দ ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক বৈঠকের ফাঁকে এই ঘোষণা দেন। একইসঙ্গে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।
ফ্রান্সে আয়োজিত বৈঠকে পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতারা ও কূটনীতিকরা অংশ নিচ্ছেন। আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের পথে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে এগিয়ে নেওয়া।
- Advertisement -
কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন ঘোষিত অর্থের একটি বড় অংশ জাতিসংঘের বিভিন্ন মানবিক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে। এই সহায়তা বিশেষভাবে গাজায় ক্রমাবনতিশীল মানবিক পরিস্থিতি মোকাবিলা, চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং পশ্চিম তীরে সহিংসতার শিকার সাধারণ মানুষের সহায়তায় ব্যয় করা হবে।
সরকারি সূত্রের মতে, পশ্চিম তীরে চরমপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংস কর্মকাণ্ড এবং গাজায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে লাখ লাখ ফিলিস্তিনি মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
নতুন এই তহবিল ঘোষণার ফলে ২০২৩ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের জন্য কানাডার মোট আর্থিক সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৫০ কোটি ডলারে। এই অর্থ শুধু জরুরি মানবিক সহায়তার জন্যই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং পুনর্গঠন কার্যক্রমেও ব্যয় করা হবে বলে জানিয়েছে অটোয়া।
এদিকে, অনীতা আনান্দ বৃহস্পতিবার ব্রিটেন ও অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকে তিন দেশ সম্মিলিতভাবে এমন ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি ব্যক্তি ও সংগঠনকে শক্তিশালী করার উদ্যোগে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়, যারা সহিংসতা ও চরমপন্থার পরিবর্তে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সংলাপের পক্ষে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে আগামী তিন বছরে প্রায় ১৮ লাখ ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে কানাডা সরকারের এই উদ্যোগের পরও দেশটির মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। ফিলিস্তিনপন্থী বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও অধিকারকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কানাডা পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাদের মতে, মানবিক সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সংঘাতের মূল কারণগুলো মোকাবিলায় আরও দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান প্রয়োজন।
অন্যদিকে, কানাডার ইহুদি সম্প্রদায়ের কিছু সংগঠন এবং ইসরায়েলপন্থী মহল মনে করে, সাম্প্রতিক সময়ে অটোয়ার কিছু সমালোচনামূলক বক্তব্য ও অবস্থান ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, অতিরিক্ত রাজনৈতিক সমালোচনা সমাজে ইহুদিবিদ্বেষকে উৎসাহিত করতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কানাডা বর্তমানে একটি সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে। একদিকে গাজায় মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সহায়তা বৃদ্ধি, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং আন্তর্জাতিক আইন উভয় বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে অটোয়া। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই কানাডাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করার চাপ বাড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন অর্থ সহায়তা মানবিক সংকট মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থায়ী শান্তির জন্য কেবল অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং একটি কার্যকর রাজনৈতিক সমাধান এবং আন্তর্জাতিক ঐকমত্য গড়ে তোলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
- Advertisement -