বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান নয়। এছাড়াও এগুলো দেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক চেতনা গঠনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখান থেকেই তৈরি হয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, নীতি-নির্ধারক ও জ্ঞানচর্চার ধারক-বাহক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কাঠামো, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে যে বিতর্ক ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এই প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে রদবদল বা পরিবর্তন আনা এখন শুধু প্রয়োজনই নয়, বরং সময়োপযোগী ও যৌক্তিক একটি পদক্ষেপ।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং সরকারের পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলোতে পুনর্নিয়োগের একটি প্রক্রিয়া শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই প্রক্রিয়া নিয়ে যেমন সমালোচনা হয়েছে, তেমনি এর পক্ষে কিছুটা যুক্তিও রয়েছে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ জমে উঠেছিল, যা শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দলের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা, দক্ষতা ও নৈতিকতার চেয়ে দলীয় পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্র রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়ে, যা অনেক সময় সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়।

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রশাসনিক নিয়োগে অনিয়ম এবং একটি নির্দিষ্ট দলের প্রভাবের অভিযোগ উঠে এসেছে। এমনকি আমার কর্মস্থলে ইমাম নিয়োগসহ কিছু নিয়োগে অনিয়ম এর অভিযোগ আসছে। যেখানে ইমাম নিয়োগে অনিয়ম বা স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠে, তখন আর ঐ প্রতিষ্ঠান আর বিশ্ববিদ্যালয় থাকে না বলে মনে করেন অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তারা। যা খুবই দুঃখজনক।

অভিযোগের ফলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের অবনতি, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং শিক্ষার পরিবেশের অবক্ষয় দেখা দিয়েছে। একইভাবে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রশাসনিক অনিয়ম ও অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই বাস্তবতায় সরকার যখন নতুন করে প্রশাসনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কারণ, একটি কার্যকর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য প্রয়োজন দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং অ্যাকাডেমিকভাবে যোগ্য নেতৃত্ব। উপাচার্য ও অন্যান্য প্রশাসনিক পদে এমন ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে, যারা শিক্ষার মান উন্নয়ন, গবেষণার পরিবেশ সৃষ্টি এবং শিক্ষার্থীদের মুক্তচিন্তা বিকাশে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের শিক্ষকদের উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া দোষের কিছুটা নয়, বরং ঐ আদর্শের মধ্যে সবচেয়ে যোগ্য শিক্ষককে উপাচার্য নিয়োগ দিলে বিশ্ববিদ্যালয় আরও বেশি কার্যকর এবং গতিশীল হবে।

সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যে সমালোচনা গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। তবে সব সমালোচনাই যে বাস্তবভিত্তিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পূর্বে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাদের অবস্থান হারানোর কারণে পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে সমালোচনার পেছনের বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে একটি সরকারী দলের লোক উপাচার্য হিসেবে এটাই স্বাভাবিক। যা অতীতে হয়ে আসছে। সরকারী দলের পছন্দের লোক প্রশাসনে থাকলে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর ইতিবাচক প্রভাব যে কতটা হতে পারে তা বিগত সময়ে দেখতে পেয়েছে জনগণ,তা বিভিন্ন দিক থেকে বিশ্লেষণ করা যায়। যার উদাহরণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। প্রথমত, এটি রাজনৈতিক বিভাজনকে অনেক সময়ে কমিয়ে নিয়ে আসতে পারে। তবে যখন প্রশাসনের শীর্ষে থাকা ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শে পক্ষপাতিত্ব না করেন,তখন ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ভালো হয়। এর ফলে ক্যাম্পাসে সংঘর্ষ, উত্তেজনা এবং সহিংসতার ঝুঁকি কমে আসে।

দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে গতিশীলতা ফিরে আসে। তবে তাকে স্বচ্ছতার সহিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ,পদোন্নতি কিংবা বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক সিদ্ধান্তে দলীয় বিবেচনা কম প্রাধান্য দিতে হবে, তাহলে মেধা ও যোগ্যতা বেশি গুরুত্ব পাবে। যদিও অতীতে সরকার দলীয়করণ করে গেছে। এখনও যদি তাই হয় তাহলে তো আর কোনো পরিবর্তন হলো না। যদি যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়,এতে করে শিক্ষার মান উন্নত হবে এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতি জনগণের এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের আস্থা বেড়ে যাবে। এছাড়াও সরকারী দলের ওপর মানুষের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।

তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শৃঙ্খলা ঠিক রাখা সহজ হয়। একটি স্বাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত মুক্তভাবে গবেষণা ও মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা। কিন্তু যখন প্রশাসন কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে পরিচালিত না হয়, তখন সেই স্বাধীনতা আরো বৃদ্ধি পায়। দলীয় উপাচার্য হলেও তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে হবে। তাঁকে অনেক কিছু ত্যাগ করে হইলে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা দেখাতে হবে এবং বাস্তবে প্রয়োগ করতে হবে।

চতুর্থত, দলীয় উপাচার্য নিয়োগ পাওয়া স্বাভাবিক ঘটনা, কিন্তু তিনি যদি যোগ্য শিক্ষক ও মেধাসম্পন্ন লোক দিয়ে প্রশাসন পরিচালনা করেন তাহলে সাধারণ জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি নাও হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে রদবদল বা পরিবর্তন আনার উদ্যোগকে একপাক্ষিকভাবে সমালোচনা না করে বরং এর প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করা উচিত। অবশ্যই এই পরিবর্তন হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং গ্রহণযোগ্য প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। শুধু একটি নির্দিষ্ট দলের প্রভাব কমানোই যথেষ্ট নয়; বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা এবং নৈতিকতা হবে নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড।

সরকারের উচিত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়োগ কমিশন গঠন করা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বেশি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে অ্যাকাডেমিক উৎকর্ষতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে প্রশাসনিক সংস্কার অপরিহার্য। এই সংস্কারের মাধ্যমে যদি একটি সুশাসিত, স্বচ্ছ এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলে তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সাম্প্রতিক সময়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে যে সমালোচনা গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক। তবে সব সমালোচনাই যে বাস্তবভিত্তিক বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পূর্বে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাদের অবস্থান হারানোর কারণে পরিবর্তনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ফলে সমালোচনার পেছনের বাস্তবতা ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করা জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি দৃঢ় নীতিমালা গ্রহণ করে, তবে এসব অনিয়ম কমানো সম্ভব। শিক্ষক নিয়োগের জন্য লিখিত পরীক্ষা, ডেমো ক্লাস, ফলাফলের ভিত্তিতে নিয়োগ এবং মৌখিক পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এ ছাড়া উপাচার্য নিয়োগ নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে করা অতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়েছে, কারণ, তাঁরা সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করবেন। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ দিলে তাঁরা দায়িত্ব পালন শেষে চলে যেতে পারেন, তবে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন এবং চক্ষুলজ্জার ভয়ে থাকে। তাঁকে আরও বেশি জবাবদিহি এবং সততার সহিত দায়িত্ব পালন করতে হয়।

সার্বিক অর্থে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পরিবর্তন আনা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি যৌক্তিক এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে এই পরিবর্তন যেন আরেকটি রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের প্রকৃত লক্ষ্য-জ্ঞান সৃষ্টি, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন অর্জনে সফল হবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

এইচআর/এমএস



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews