যৌন কেলেঙ্কারির ভূমিকম্পের মধ্যে ২০১৮ সালের একটি চাঞ্চল্যকর ভিডিও পুনরায় সামনে এসেছে। ভিডিওটিতে ‘ববি’ নামের এক নারী- যিনি নিজেকে বিজেপির একজন কর্মী হিসেবে দাবি করছেন- দলের বরিষ্ঠ নেতা বিজয় গোয়েল এবং নীতিন গড়করির বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও অশালীন প্রস্তাব দেয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। ওই ভিডিও ক্লিপটিতে তিনি কথিত আপত্তিকর বার্তা আদান-প্রদান এবং দলের অভ্যন্তরীণ শোষণের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। এ পুরনো ফুটেজটিকে বিজেপি একসময় বিরোধী পক্ষের অপপ্রচার হিসেবে উড়িয়ে দিয়েছিল; কিন্তু বর্তমানে এটি ভারতীয় রাজনীতির আঙিনায় নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ক্ষোভ ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিজেপি নেতাদের ও নরেন্দ্র মোদির যৌন কেলেঙ্কারী নিয়ে জ্যোতিষী আশোক খারাট, সুব্রাহ্মণ্যম স্বামী ও মোদির জীবনীকার মধু পূর্ণিমা কিশ্বর মুখ খোলার পর ভারতীয় রাজনীতিতে প্যান্ডোরার বাক্স খুলতে শুরু করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একের পর এক নারী নেত্রী ও বিভিন্ন মহল থেকে বিজেপি নেতাদের যৌন কেলেঙ্কারীর নানা খবর প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। কিন্তু ভারতীয় মূল গণমাধ্যমে এর সামান্যই প্রকাশিত হচ্ছে। এ নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে বিজেপিবিরোধী মহল থেকে। কংগ্রেস নেতারা মুখ খুলে বলছেন, আজ যদি কংগ্রেসের কোনো নেতার বিরুদ্ধে এ ধরনের সমালোচনা হতো তাহলে গণমাধ্যম ও বিজেপি বিষয়টি নিয়ে ভারত জুড়ে শোরগোল ফেলে দিত।
এই চাপান-উতোরের মধ্যে নতুন করে ভাইরাল হয়েছে সীমা গোবিন্দ নামে এক স্কুল শিক্ষিকা ও মহিলা নেত্রীর ভিডিও। তিনি বলেছেন, নারীদের রাজনীতিতে আসার ৯০ শতাংশ পথই রাজনীতিবিদদের শয্যার মধ্য দিয়ে যায়, এটা একেবারে সত্যি। তার দাবি, ‘রাজনীতিতে মহিলাদের রাজনীতিবিদদের শয্যাসঙ্গী হতে হয়’।
নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে সীমা গোবিন্দ বলেন, যখন আমি স্কুল বা কলেজের শিক্ষিকা ছিলাম, তখন একটি অনুষ্ঠানে একজন মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। আমি একটি বক্তৃতা দিই, যার পরে মন্ত্রী আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং বলেন, তিনি আমাকে রাজনীতিতে আনতে চান। তিনি আমাকে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু আমি মাত্র এক বছর টিকেছিলাম। তবে অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আমাকে বের করে দেয়। এক বছরের মধ্যে আমার সাথে দেখা হওয়া সমস্ত নেতার মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় ছিল, আমাকে টাকা দাও।
এসময় তিনি বলেন, আমি দেখেছি, বিজেপিতে ৯০% মহিলা রাজনীতিবিদের ওপরে ওঠার একটাই রাস্তা। ১০% যাদের বিশাল রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড বা বিপুল জনপ্রিয়তা আছে তাদের কথা ভিন্ন। সবত্র একই কথা, গিভ এন্ড টেক।
তিনি বলেন, মহিলা পার্টি অফিসে একবার দুই মহিলার আলাপ-আলোচনা শুনছিলাম। যাদের একজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে এবং অন্যজনকে দেয়া হয়নি। যাকে দেয়া হয়নি তিনি বলছিলেন, আমি কাপড় খোলা থেকে সবকিছু দিয়েছি। তবুও পেলাম না। আর কী দেবো? সর্বত্র একই দাবি। যতবড় ধর্ম অধিকারী ততবড় ব্যভিচারী। এমন পরিস্থিতি দেখে ১ বছর পর রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছি। নিজের এক বছরের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সীমা গোবিন্দ আরো বলেন, তার কলেজের কাজের জন্য সাবেক গভর্নর কল্যাণ সিং-এর সাথে একবার দেখা করতে হয়েছিল। বিজেপি নেতা কল্যাণ সিং সরাসরি তাকে গিভ এন্ড টেক প্রস্তাব দেন যা সীমা গোবিন্দ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। ফলস্বরূপ, কাজটি সম্পন্ন হয় না এবং সীমা গোবিন্দকে তার কলেজ বন্ধ করে দিতে হয়।
দিল্লি সরকারের মন্ত্রী কপিল মিশ্র। তার কাছে নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহের একটি সিডি ছিল, যা দিল্লি বিধানসভায় বাজানো হয়েছিল। এ সিডিটি ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে জমা দেয়া হয়েছিল, কিন্তু এর তদন্ত ১০ বছর ধরে এর তদন্ত আটকে রাখা হয়েছে।
কপিল মিশ্র দিল্লি বিধানসভায় অন রেকর্ড রাখার জন্য হলফনামা হিসেবে জানান যে, নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, তখন তিনি সরকারি গাড়িতে করে একটি মেয়েকে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে নিয়ে যেতেন, তাকে পাশের ঘরে রাখতেন এবং এরপর কী হতো? এ সবকিছুই ওই সিডিতে রয়েছে।
কেবল কপিল মিশ্র নয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে যৌনতার বিনিময়ে নারীদের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী বানানোর অভিযোগ তুলেছেন খোদ বিজেপি নেতা সুব্রাহ্মণ্যম স্বামী। এক পডকাস্টে অংশ নিয়ে এপস্টিন ফাইলস প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে সাবেক বিজেপি এমপি সুব্রাহ্মণ্যম স্বামী দাবি করেন, তিনি ৩-৪ জন মহিলার নাম বলতে পারেন, যাঁদের সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য মোদির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক রাখতে হয়েছিল।
এদিকে সুব্রাহ্মণ্যম স্বামীর অভিযোগ সমর্থন করে এক্স হ্যান্ডেলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করেন কট্টর হিন্দুত্ববাদী, মোদির প্রশস্তি করে বই লেখা এবং মোদিকে গান্ধীর সঙ্গে তুলনা করা লেখিকা মধু পূর্ণিমা কিশ্বর। নিজের ভেরিফাইড এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেন, ‘এ ঘটনাই প্রমাণ করে ২০১৪ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে কেন আমি মোদি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতাম’।
তার পোস্টটির বঙ্গানুবাদ নিম্নরূপ : ‘এ কারণেই ২০১৪ সালের মে মাসে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আমি তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখেছিলাম। তাকে নিয়ে লেখা আমার বইয়ের একটি কপি উপহার দিতেও আমি যাইনি। শুধু তার প্রিয় আমলা ভরত লালের মাধ্যমে একটি সইবিহীন কপি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম!
একেবারে শুরু থেকেই সংঘী ক্ষমতার বলয়গুলোর মধ্যে সেইসব মহিলাদের নাম বেশ জোরেই ফিসফিস করে বলা হচ্ছিল, যারা মোদির ঘনিষ্ঠতার কারণে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হয়েছিলেন। সেই কারণেই আমি খুব তাড়াতাড়ি সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম। হরদীপ ও জয়শঙ্কর মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সাথে সাথেই হরদীপ পুরীর মতো যারা গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন তাকে বিশেষ পরিষেবা দিয়েছিলেন, তাদের নামও চাপা গলায় বলা হতে লাগল!
২০১৪ সালে, যখন আমি আমেরিকায় বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলাম, সেখানেও তার আয়াদের গল্প প্রচলিত ছিল। দ্বাদশ শ্রেণি পাস স্মৃতি ইরানিকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়ায় অন্যান্য কেলেঙ্কারিগুলো বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছিল, যা এতদিন পর্যন্ত জনসমক্ষে গোপন ছিল। মানসী সোনিকে নিয়ে কেলেঙ্কারিটি ইতোমধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। মোদির ঘনিষ্ঠ কেউ আমাকে সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা একগুচ্ছ কাগজপত্র দিয়েছিলেন, যা দাখিল করেছিলেন সেই কারাবন্দী আইএএস অফিসার, যিনিও সোনির সঙ্গে ফুর্তিবাজ সময় কাটাচ্ছিলেন।
মোদিনামার লেখিকা মধু পূর্ণিমা কিশ্বর বলেন, এছাড়াও, গুজরাটের লোকজন, যাদের মধ্যে মোদির ঘনিষ্ঠ কয়েকজনও ছিলেন, আমাকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন মহিলাদের সঙ্গে তার অসুস্থ প্রেমলীলার জঘন্য সব কাহিনী শুনিয়েছিলেন এবং তারও আগে, যখন তিনি প্রচারক ও বিজেপির পদাধিকারী ছিলেন! সেইসব কাহিনী শুনে তার উপস্থিতির প্রতি আমার এতটাই বিতৃষ্ণা জন্মেছিল যে, আমি বিয়ের সংবর্ধনাসহ সেইসব অনুষ্ঠানও এড়িয়ে চলতাম, যেখানে মোদির আসার সম্ভাবনা ছিল! সেইসব বীভৎস বিবরণ শুনে আমি এতটাই মানসিকভাবে আঘাত পেয়েছিলাম যে, ২০১৪ সালে আমি গভীর বিষণ¦তায় ডুবে যাই, যা আমার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। একাধিক মানসিক আঘাত থেকে সেরে ওঠার আশায় ২০১৫ সালে কোয়েম্বাটুরের একটি আয়ুর্বেদিক নিরাময় কেন্দ্রে ২১ দিনের জন্য গিয়েছিলাম।
মোদির জীবনীকার মধু পূর্ণিমা কিশ্বর বলেন, আমার মনে আছে, আমি যে খবরগুলো শুনছিলাম তাতে আমার দুঃখের কথা যখন আরএসএস-এর একজন খুব সিনিয়র বুদ্ধিজীবীর কাছে বলেছিলাম, তিনি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি এত অবাক হচ্ছেন কেন? তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমাদের কারোরই বা মাথাব্যথা থাকবে কেন’?
পর্নো বিক্রেতা অমিত মালভিয়াকে বিজেপির সোশ্যাল মিডিয়া ইনচার্জ হিসেবে নিয়োগ দেয়াটা ছিল বিজেপির শীর্ষ কর্তাদের ঝোঁকের আরো একটি প্রমাণ! অন্যান্য ক্ষেত্রে সে যদি ভালো করত, তাহলে হয়তো আমি তার এ শিকারীসুলভ যৌন আচরণ উপেক্ষা করতাম। কিন্তু তার আগ্রাসীভাবে গণহত্যামূলক টিকা বিক্রি, হিন্দু সমাজকে দমন করার নির্লজ্জ প্রচেষ্টা এবং হিন্দু ধর্মকে শয়তান হিসেবে চিত্রিত করা, হিন্দুদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানোর জন্য ভীমতা ও মীমতাদের প্রতি তার জঘন্য পৃষ্ঠপোষকতা, বিশ্বায়নবাদী মাফিয়াদের প্রতি তার দাসসুলভ আচরণ, কাঠুয়া কা-ের সময় হিন্দুদের ওপর তার পৈশাচিক নির্যাতন (যা আমার বই ‘দ্য গার্ল ফ্রম কাঠুয়া, এ স্যাক্রিফিশিয়াল ভিকটিম অফ গাজওয়া-ই-হিন্দ’-এ বিস্তারিতভাবে বর্ণিত) এবং আরো অনেক কিছু, আমাকে প্রথম মেয়াদেই উপলব্ধি করিয়েছিল যে, আমরা এক শয়তানি শাসকের পাল্লায় পড়েছি; সিআইএ-র এক চর, যাকে ভারতকে ধ্বংস করতে এবং হিন্দুদের নিশ্চিহ্ন করতে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে!
মোদির ব্যক্তিত্বের বিকার আমাকে এ বিশ্বাসে উপনীত করেছে যে, আমাদের নেতাদের যৌন দুর্নীতির দিকে আরো অনেক বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। যারা এক্ষেত্রে আপোস করে, তারা আর্থিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্তদের চেয়ে ভারতের শত্রুদের ব্ল্যাকমেলের কাছে অনেক সহজে নতি স্বীকার করে! প্রথম দিন থেকেই কীভাবে তাকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে, তার প্রমাণ শিগগিরই দেব। আর তাই ওই অশ্লীল ৫৬ ইঞ্চির দম্ভোক্তি!
এদিকে মধু পূর্ণিমা কিশ্বরের এ পোস্ট ভারত জুড়ে তোলপাড় হওয়ায় মোদিভক্ত ও বিজেপি সমর্থকেরা তাকে ক্রমাগত হুমকি দিয়ে আসছে বলে তিনি জানান। এ ছাড়াও তার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু মধু পূর্ণিমা কিশ্বর এতে দমে যাননি। তিনি একের পর এক পোস্ট দিয়ে ও বিভিন্ন পডকাস্টে নিজের বক্তব্যের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরছেন। একই সাথে তিনি অচিরেই আরো তথ্যপ্রমাণ নিয়ে মোদি ও বিজেপির ঘরের অন্তরালের নানা খবর প্রকাশ করে দেবেন বলেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।