বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আবাহনী-মোহামেডান মানেই ছিল আবেগের সংঘর্ষ। নীল-হলুদের উচ্ছ্বাস আর সাদা-কালোর গর্জন যেমন ঢাকার ফুটবলকে রঙিন করতো , ঠিক তেমনই গ্লাসগোর ফুটবলের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে সেল্টিক ও রেঞ্জার্স।

গ্লাসগোর আকাশে যখন ফুটবলের গান ওঠে, তখন তার তীব্র প্রতিধ্বনি শোনা যায় সেল্টিক পার্ক আর আইব্রক্স স্টেডিয়ামে। একদিকে সবুজ-সাদা পতাকার ঢেউ, অন্যদিকে নীল রঙের সমুদ্র। একদিকে সেল্টিক, অন্যদিকে রেঞ্জার্স।

এই শহরে ফুটবল পারিবারিক উত্তরাধিকার, শৈশবের স্মৃতি, পরিচয়ের অংশ। বাবার হাত ধরে প্রথম স্টেডিয়ামে যাওয়া শিশুটি একদিন নিজের সন্তানকে নিয়ে আসে একই গ্যালারিতে। জার্সির রং বদলায় না, বদলায় না আবেগও। বাংলাদেশের কোনো পরিবারে আবাহনী-মোহামেডানের গল্প প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যায়, তেমনই গ্লাসগোর ঘরে ঘরে সেল্টিক-রেঞ্জার্সের গল্প বেঁচে থাকে।

ম্যাচের দিন গ্লাসগো শহরটি যেন দুই রঙে ভাগ হয়ে যায়। কোথাও সবুজ-সাদা পতাকা, কোথাও নীলের আধিপত্য। পাবের আড্ডা থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটে একই প্রশ্ন—‘আজ কে জিতবে?’ এই উত্তেজনার ভেতরেও লুকিয়ে থাকে ভালোবাসার গল্প।

সেল্টিক সমর্থক জন ম্যাকডোনাল্ডের কথা, ‘সেল্টিক আমার কাছে পরিবারের অংশ।বাবা আমাকে প্রথম সেল্টিক পার্কে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে যাই। একই জায়গায় দাঁড়িয়ে তিন প্রজন্মের ইতিহাস তৈরি হয়েছে।’

অন্যদিকে রেঞ্জার্স সমর্থক অ্যালান উইলসনের চোখে একই আবেগ। তাঁর কথায়, “আইব্রক্সে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ একসঙ্গে গান গায়, তখন আমরা সবাই একই পরিবারের মানুষ হয়ে উঠি । জয়-পরাজয় আসবে যাবে, রেঞ্জার্সের প্রতি ভালোবাসা কখনো শেষ হবে না।”

তরুণ সমর্থক লিয়াম একটু ভিন্নভাবে দেখেন এই দ্বৈরথকে। তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই প্রতিপক্ষকে হারাতে চাই। শেষ পর্যন্ত চাই ফুটবল জিতুক। সেল্টিক-রেঞ্জার্সের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাই স্কটিশ ফুটবলকে আলাদা করেছে।’

রেঞ্জার্সের জন্ম ১৮৭২ সালে। স্কটিশ ফুটবলের অন্যতম প্রাচীন ক্লাব হিসেবে খুব দ্রুতই তারা গ্লাসগোর বড় শক্তিতে পরিণত হয়। ১৫ বছর পর, ১৮৮৭ সালে জন্ম নেয় সেল্টিক। গ্লাসগোর পূর্বাঞ্চলে আইরিশ অভিবাসী সম্প্রদায়ের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ক্লাবটি। নতুন দেশে নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার একটি জায়গা হয়ে ওঠে সেল্টিক। সময় যত এগিয়েছে, ততই দুই ক্লাবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু মাঠের মধ্যে আটকে থাকেনি। সামাজিক ইতিহাস, অভিবাসন,ধর্মীয় পরিচয়ে এই দ্বৈরথ হয়ে উঠেছে স্কটল্যান্ডের অন্যতম আবেগঘন অধ্যায়।

সেল্টিকের ১৯৬৭ সালের ইউরোপিয়ান কাপ জয় আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম রূপকথা। ‘লিসবন লায়ন্স’ নামে পরিচিত সেই দলটি ছিল মূলত গ্লাসগোর স্থানীয় ফুটবলারদের নিয়ে গড়া। অন্যদিকে ঘরোয়া ফুটবলে রেঞ্জার্সের সাফল্য, অসংখ্য লিগ শিরোপা এবং দীর্ঘ ঐতিহ্য তাদের স্কটিশ ফুটবলের অন্যতম স্তম্ভ করেছে।

এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসে কিছু অন্ধকার অধ্যায়ও রয়েছে। ১৯৮০ সালের ১০ মে, স্কটিশ কাপ ফাইনালে সেল্টিক ও রেঞ্জার্সের লড়াইয়ের পর হ্যাম্পডেন পার্কে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘর্ষ হয়। ম্যাচ শেষে মাঠে ঢুকে পড়েন দুই পক্ষের সমর্থকরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

আরও একবার উত্তেজনার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০১১ সালের ২ মার্চ আইব্রক্সে অনুষ্ঠিত ওল্ড ফার্ম ডার্বিতে। ম্যাচে একাধিক লাল কার্ড দেখানো হয়। মাঠের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারিতেও। একজন বৃদ্ধ রেঞ্জার্স সমর্থক আজও নাতির হাত ধরে আইব্রক্সে যান। তাঁর কাছে এই স্টেডিয়াম জীবনের স্মৃতির ভাণ্ডার। সেল্টিক পার্কেও একই ছবি। বাবার কাঁধে বসে থাকা ছোট্ট শিশু, হাতে সবুজ-সাদা পতাকা। সে জানে না পুরোনো ইতিহাস, জানে না রাজনৈতিক বিতর্ক। সে শুধু জানে মাঠে থাকা দলটাই তার ভালোবাসা।

কেউ বাবার রেখে যাওয়া পুরোনো স্কার্ফ গায়ে জড়ান। কেউ প্রথম ম্যাচের টিকিট যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। কেউ হারার পরও স্টেডিয়াম ছাড়কে চান না।এখানে  সমর্থন মানে পাশে থাকা।

সেল্টিক ও রেঞ্জার্সের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, উত্তাপ আছে, ইতিহাস আছে। সবকিছুর ওপরে আছে ভালোবাসা। গ্লাসগোকে বুঝতে হলে শুধু তার নদী, স্থাপত্য কিংবা জাদুঘর দেখলেই হবে না। একদিন দাঁড়াতে হবে সেল্টিক পার্কের বাইরে কিংবা আইব্রক্সের সামনে। তখন বোঝা যাবে,এই শহরে ফুটবল শুধু খেলাই হয় না। ফুটবল এখানে বেঁচে থাকে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews