কফি হাউসের সেই আড্ডাটা… এ গান শুনলে খাবার দাবারের কথা মনে হয়ে যায়। মনে পড়ে যায় যৌবনকাল। রূপে রসে, বর্ণে গন্ধে যা ছিল অতি বিশেষ। মনে পড়ে আমাদের মধ্যের একজনের হাতে ছিল মন্ত্রপুত বাঁশরী। তার নাম ফরিদুর রেজা সাগর।
সাগরকে তখন কেউ কোথাও বসে থাকতে দেখেনি। সে বরাবরই একস্থানে দাঁড়িয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড চষে বেড়ানো মানুষ। মাথা কখনো বসে থাকে না। আবোল তাবোল চিন্তায় সময় কাটানোর অভ্যাস নেই তার, তা কাছের মানুষেরা জানে।
কাছের মানুষেরা আরো জানে, চ্যানেল আই তার শ্বাস প্রশ্বাস। একদা টেলিভিশনও তাই ছিল। আমরা যখন কেউ কিছুই ছিলাম না, যে বয়সটায় তারুণ্যের ছটফটানি কাউকে বসে থাকতে দেয় না, তখন আমরা, বন্ধুদলের প্রায় সবাই বাঁধা পড়েছিলাম সৃজনশীলতার চক্করে।
সদ্য স্বাধীন দেশ। দেশজুড়ে তখন প্রবল অস্থিরতা। বিশেষ করে তারুণ্যের তেজে অহরহ অঘটন ঘটছে এখানে ওখানে। সেসময়ে আমাদের সকলেরই শিরা উপশিরায় তাজা তরুণ রক্ত টগবগ করে কিন্তু দেশের অস্থির পরিস্থিতি আমাদের কাউকে স্পর্শ করতে পারেনি।
তার পিছনে সাগরের বিরাট একটা ভূমিকা ছিল। সাগর তখন নিজেই পত্র পল্লবহীন কিন্তু সবাই একত্রে যেনো থাকতে পারি, একত্রে কিন্তু আলাদা আলাদাভাবে যেনো বিকশিত হতে পারি, তেমন একটা গণ্ডি তৈরি করে দিয়েছিল সে।
তার মাথার ছুটোছুটির অভ্যাস সেইকাল থেকেই। সে সর্বদা অনেককে নিয়ে ভাবতে পছন্দ করে, সেটাই তার নিজেকে নিয়ে ভাবা। আমরা অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সব নিয়ে আবেগময় কতকিছু ভাবি, ভাবতে পছন্দ করে মানুষ। সেইসব ভাবনা চিলের মতো ছোঁ দিয়ে সময় এবং কর্তব্য ছিনিয়ে নিয়ে যেতে দেয়।
চুয়াত্তর/ পঁচাত্তর সাল। আমরা চারপাশে প্রচুর সর্বনাশের হাতছানি উপেক্ষা করে একত্রিত হয়ে ছিলাম। ছিলাম সৃজনশীলতার পথে। আনন্দ কুড়িয়ে কুড়িয়ে দিন কাটতো।
সাগর তখন ব্যস্ত দেশের একমাত্র টেলিভিশনে শিশুদের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, পাণ্ডুলিপি রচনার কাজে। টেলিভশনে সর্ববিষয় নিয়ে চমৎকার চমৎকার অনুষ্ঠান হয়। দর্শক তখন আইন, চিকিৎসা, বিতর্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য ইত্যাদি বহু বিষয়ের উপর নির্মিত অনুষ্ঠান অতি আগ্রহ নিয়ে দেখেন।
শাইখ সিরাজ কৃষি বিষয় নিয়ে অনুষ্ঠান করতে কোমর বেঁধে নেমে পড়ে। আমি ঢাকা থিয়েটারে যোগ দিয়েছি, মঞ্চের পাশাপাশি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করি। ইমদাদুল হক মিলন লেখক হবে প্রতিজ্ঞা করে দিনরাত তখন হয় পড়ে, না হয় লেখে। আব্দুর রহমান শিশু কিশোরদের সংগঠন চাঁদের হাটের সংগঠক আর দারুণ দারুণ ছড়া লিখছে তখন।
ভাবতে বসলে মনে হবে সেটা ছিল আনন্দমধুর কাল কিন্তু ভাবনার গভীরে গেলে মনে হয়, সেটা সবার ভয়ানক যুদ্ধকালও ছিল। সবাই অস্তিত্ব নির্মাণের চেষ্টা করছে। তা যুদ্ধের মতোই। পরস্পরের প্রিয় মানুষেরা একত্রে লড়াইয়ে থাকলে তা লড়াইয়ের অনুভব দেয় না।
সাগর খাবার দাবার খুলে বসলো। বঙ্গবন্ধু এ্যাভেনিউতে ভাতের হোটেল। ব্যবসা হবে কি হবে না, আমাদের কারো মাথায় সে চিন্তা নেই। থাকবার বয়স সেটা নয়। নতুন খোলার পর প্রায় সারাদিনই সে রেস্টুরেন্ট থাকে খরিদ্দার ছাড়া। বিকাল হলে আমরা যে যেখানেই থাকি, হাজির হয়ে যাই খাবার দাবারে।
বিকাল থেকে দীর্ঘ সময় ধরে আড্ডা চলে। আমরা অনেকে আসি। সাগর আর শাইখ সিরাজের বসার জন্য তৈরি করা কেবিনটা দখল করে আড্ডা চলতে থাকে।
সিরাজ, শাইখ সিরাজ রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঘোরে, মাঝেমাঝে ঢোকে আমাদের আড্ডায়। সাগর, ফরিদুর রেজা সাগর দাঁড়িয়ে থাকে খাবার দাবারের বাইরে। খরিদ্দারের আশায় নয়, ফুটপাতে রকমারি মানুষের প্রবাহ। সেই স্রোতের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে ভাবে। তার ভাবনা আকাশ থেকে পাতাল পর্যন্ত বিস্তৃত। সে ভাবনা শতভাগ বিষমুক্ত, অসুখহীন।
একদিন বলি, খরিদ্দারদের চেয়ে আমরা যারা আড্ডা দিতে আসি, তাদের সংখ্যাই তো বেশি। সাগর হাসে, তোমাদের চেয়ে মাছিরাও সংখ্যায় বেশি। একদিন মানুষের ভিড়ে মাছিরা ভেগে যাবে আর তোমাদের আড্ডাটাও আয়তনে বেড়ে যাবে, দেখো।
সত্যি সত্যিই আমাদের আড্ডাটা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। কারা কারা যুক্ত হলো বলবো। বলা চলতে থাকলে বোঝা যাবে, এই একটা মানুষের মাথা বিশেষ মাত্রার অশ্বশক্তি সম্পন্ন। যে মাথা একদিন দৌড়াতে শুরু করেছে, থামাথামি নেই।
লেখক: আফজাল হোসেন চিত্রশিল্পী, অভিনেতা ও নির্মাতা