বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে কিছু নাম শুধু একজন চিকিৎসকের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না: তারা হয়ে ওঠেন একটি প্রতিষ্ঠান, একটি অনুপ্রেরণা, একটি আলোকবর্তিকা। অধ্যাপক ডা. এম, এ, ফয়েজ তেমনই এক নাম-যিনি চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষকতা মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়। সম্প্রতি জেনেভায় অনুষ্ঠিত World Health Assem-
bly 79-এ জনস্বাস্থ্যে অসামান্য অবদানের জন্য অধ্যাপক ডা. এম. এ. ফয়েজ সম্মানজনক ‘Dr. Lee Jong-wook Me-morial Award 2026’ অর্জন করেছেন। এই অর্জন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সম্মান নয়: এটি বাংলাদেশের চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্যখাতের জন্যও এক গৌরবময় মুহূর্ত। কিন্তু আজকের এই বিশ্বস্বীকৃত গবেষক, শিক্ষক ও চিকিৎসকের গল্প শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নীরব করিডোরে।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আবুল ফায়েজ হাস-পাতালের একটি বেডের পাশে উদ্বিগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বেডে শুয়ে আছেন তাঁর মা। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে ভীষণভাবে। বুক দ্রুত উঠানামা করছে, চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ। পরিবারের সদস্যরা ধরে নিয়েছিলেন এটি হয়তো হাঁপানির সমস্যা। মেডিকেলের একজন সিনিয়র চিকিৎসক রোগী দেখে বললেন, ‘তোমার মায়ের হাঁপানি হয়েছে।” কিন্তু তরুণ ছাত্র আবুল ফয়েজের মন সেই ব্যাখ্যা মেনে নিতে পারছিল না। ছাত্র হলেও তাঁর ক্লিনিক্যাল পর্যবেক্ষণ ছিল অসাধারণ। রোগীর শ্বাসের ধরণ, ঠোঁটের রঙ, শারীরিক অবস্থা সবকিছু বিশ্লেষণ কারে তাঁর মনে হচ্ছিল, ‘এটা শুধুই হাঁপানি নয়। এখানে হার্টের কোনো সমস্যা আছে, সম্ভবত হার্ট ফেইলিউর।’
সেই সময় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ECG মেশিনটি অকেজো ছিল। বর্তমান প্রজন্মের কাছে এটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু তখনকার বাংলাদেশের চিকিৎসা অবকাঠামো ছিল সীমিত। তবুও আবুল ফয়েজ হাল ছাড়েননি। তিনি শুনেছিলেন, আশকার দিঘীর পাড়ে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এস জি, এম, চৌধুরী স্যার এর চেম্বারে একটি ECG মেশিন আছে। সেই মেশিন আনা হলো। পরীক্ষা শেষে দেখা গেল তরুণ ছাত্রের সন্দেহই সঠিক। এটি হাঁপানি নয়, হার্টের অসুখ। সেদিন হয়তো একজন ছেলে নিজের মায়ের রোগ নির্ণয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পেয়েছিল ভবিষ্যতের এক অসাধারণ চিকিৎসকের ক্লিনিক্যাল প্রজ্ঞা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং রোগীর প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা।
গত ১ মে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ গ্লোবাল রিইউ-নিয়নে সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন ফয়েজ স্যার। সেখানে স্যার এর কাছ থেকেই এই ঘটনার কথা শুনি। কথোপকথনের এক পর্যায়ে তাঁর সহধর্মিণী মিসেস জেসমিন আক্তার হাসিমুখে বলেন, ‘ফয়েজ সাহেবের জীবনে পড়াশোনাই প্রধান কাজ। উনি এক ধরনের bookworm personality.” আসলে সেটিই সত্য। বই, গবেষণা, রোগী এবং শিক্ষার্থীদের নিয়েই তাঁর জীবন।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার বটতলী গ্রামে ১৯৫৩ সালে জন্ম নেওয়া আবুল ফয়েজের শৈশব কেটেছে সাধারণ পরিবেশে। পড়াশোনা করেছেন আনোয়ারা উচ্চবিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। পরবর্তীতে তিনি বিএসএমএমইউ (তৎকালীন আইপিজিএমআর) এবং যুক্তরাজ্যের University of Newcastle upon Tyne-এ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। মেধা, অধ্যবসায় এবং মানুষের জন্য কাজ করার গভীর তাগিদ তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি চট্টগ্রাম, ঢাকা ও স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, কক্সবাজার সদর হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ নানা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা অনুষদের ডিন এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
পরবর্তীতে তিনি হয়ে ওঠেন দেশের অন্যতম শ্রদ্ধেয় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক এবং গবেষক। বিশেষ করে ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ডেঙ্গু, বিষক্রিয়া এবং সাপের কামড় নিয়ে তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, SEARO, Oxford-Wellcome Trust-Mahidol, Malaya Uni-versity, Oxford University সহ বিশ্বের বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি গবেষণায় যুক্ত ছিলেন।
বাংলাদেশে সাপের কামড়ের চিকিৎসাব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিক ও আধুনিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। WHO Snakebite Envenoming Strategy 2019 প্রণয়নে তিনি National Guideline 1 Co-chair হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার Malaria Treatment Guidelines এবং SEARO Snakebite Management Guidelines প্রণয়নেও তিনি অন্যতম উপদেষ্টা ছিলেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের বহুল পঠিত গ্রন্থ Davidson’s Principles and Practice of Medicine-ও তাঁর গবেষণার উদ্ধৃতি স্থান পেয়েছে। ল্যানসেট জার্নালে প্রকাশিত ম্যালেরিয়া বিষয়ক তাঁর গবেষনা প্রবন্ধ ২০১০ সালে BMJ Re-search Award অর্জন করে। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও চিকিৎসাসেবায় অবদানের জন্য বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক ২০০২ সালে তিনি স্বর্ণপদকে ভূষিত হন।
তাঁর ছাত্ররা বলেন, ‘ফয়েজ স্যার রোগ নির্ণয় করতেন শুধু বইয়ের জ্ঞান দিয়ে নয়, রোগীকে গভীরভাবে বুঝে।’
তিনি শুধু একজন দক্ষ চিকিৎসকই নন, বরং একজন মানবিক শিক্ষকও। তাঁর ক্লাসে চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি থাকত সততা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে। তাঁর সহধর্মিণী জেসমিন আক্তার, চট্টগ্রাম কলেজের জনপ্রিয় জুলজির অধ্যাপক জয়নাব ম্যাডামের ছোট বোন। তাঁদের দুই কন্যা খালিসা ও ফারিহা দুজনই চিকিৎসক। যেন পরিবারের মধ্যেই বহমান রয়েছে সেবার ঐতিহ্য।
আজ যখন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে অধ্যাপক ডা. এম, এ. ফায়েজ সম্মানিত হন, তখন মনে পড়ে যায় সেই তরুণ মেডিকেল ছাত্রটির কথা-যিনি একদিন হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে মায়ের শ্বাসকষ্টের ভেতরে হার্ট ফেইলিউরের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছিলেন।
সেদিনের সেই ক্লিনিক্যাল চোখ, সেই অধ্যবসায় এবং সত্যের প্রতি অটল বিশ্বাসই তাঁকে আজকের অধ্যাপক ডা. এম. এ. ফয়েজে পরিণত করেছে যিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক অনুপ্রেরণার নাম।
আজকের এই আনন্দময় দিনে আরেকজনের কথাও বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়-অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমান। বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া গবেষণায় ফয়েজ স্যার ও অধ্যাপক রিদওয়ানের যুগলবন্দীর অবদান অনস্বীকার্য। অধ্যাপক ডা. আবুল ফয়েজ এবং অধ্যাপক রিদওয়ানুর রহমান বাংলাদেশের ট্রপিক্যাল মেডিসিন ও সংক্রামক রোগ গবেষণার দুই উজ্জ্বল নাম। ম্যালেরিয়া, সাপের কামড় ও জনস্বাস্থ্য গবেষণায় তাঁদের যৌথ অবদান অবদান বাংলাদেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
গবেষণা, চিকিৎসা, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ এবং জাতীয় গাইডলাইন প্রণয়ানের মাধ্যমে তাঁরা দেশের স্বাস্থ্যখাতে বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছেন। তাঁদের কাজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের চিকিৎসা গবেষণাকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
গবেষণা, জনস্বাস্থ্য নীতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব কাজ সব মিলিয়ে এই দুই গবেষকের নিরলস প্রচেষ্টা বাংলাদেশের সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অধ্যাপক ডা. এম. এ. ফয়েজের প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন। তাঁর সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও উত্তরোত্তর সাফল্য কামনা করি।
লেখক: রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুস্নউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/রাকিব