বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশনস (এফএসআর) বিভাগের পরামর্শক (লিগ্যাল-রেগুলেশনস অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) পদে নিয়োগের আগেই বদলে ফেলা হয়েছে যোগ্যতার শর্ত। একাধিকবার সংশোধন করা হয়েছে টার্মস অব রেফারেন্স (টর)। বাদ দেওয়া হয়েছে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নিয়োগের সুযোগ করে দিতেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটি করা হয়েছেন এমন একজনের জন্য যিনি আওয়ামী লীগ আমলেও বেশ সুবিধভোগী ছিলেন। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেনারেল সেলস এজেন্টস (জিএসএ) থেকে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার চুক্তির মেয়াদ আর নবায়ন করা হয়নি। তবে এবার তাকেই পুনরায় নিয়োগ দিতে টর-এ শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত পরিবর্তন করা হয় বলে জানা যায়।
এ পদে বেসামরিক বিমান চলাচল আইন বিষয়ে ডিগ্রি বা ডিপ্লোমাধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা। তবে সেই শর্ত পুরোপুরি বাদ দিয়ে এর পরিবর্তে যুক্ত করা হয় এভিয়েশন খাতে কাজের অভিজ্ঞতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো রেগুলেটরি সংস্থা বা এভিয়েশন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা এবং এভিয়েশন আইন বিষয়ে বিশেষ শিক্ষাগত যোগ্যতা এক নয়। এ পদের জন্য আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইন, শিকাগো কনভেনশন, আইকাও স্ট্যান্ডার্ড, সেফটি ওভারসাইট সংক্রান্ত আইনগত বিষয় ও এভিয়েশন ল’তে বিশেষ জ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, এফএসআর বিভাগই আইকাওর মানদণ্ড, বিধিমালা, লাইসেন্সিং, এনফোর্সমেন্ট ও রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স বাস্তবায়নের মূল কেন্দ্র। এমন গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতার মান শিথিল করা হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অডিটে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি বলেন, এভিয়েশন আইনে বিশেষজ্ঞের পরিবর্তে সাধারণ স্টেকহোল্ডারের অভিজ্ঞতা চাওয়া অনেকটা হার্ট সার্জনের পদে প্যারামেডিকেলের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে খোঁজার মতো অবস্থা। এটা হলে আইকাওর আসন্ন অডিটে বাংলাদেশের সেফটি ওভারসাইট, রেগুলেটরি কমপ্লায়েন্স ও আইনি সক্ষমতা মূল্যায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এসএম লাবলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, এফএসআর বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব এসেছে। আমরা সেটি পর্যালোচনা করে দেখছি। টার্মস অব রেফারেন্সে (টর) যে পরিবর্তন হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট বিভাগের সুপারিশ ও প্রয়োজন বিবেচনায় করা হয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে শর্ত পরিবর্তন করার মতো ঘটনা ঘটলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। সবকিছু যথাযথ নিয়মেই হবে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী পরামর্শক (লিগ্যাল-রেগুলেশনস অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) পদটি স্থায়ী। দীর্ঘদিন ধরে পদটি শূন্য থাকলেও নিয়মিত নিয়োগ না দিয়ে চুক্তিভিত্তিক পরামর্শক নিয়োগের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, স্থায়ী নিয়োগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে নির্দিষ্ট একজনকে এই পদে নিয়োগ দেওয়ার সযোগ থাকবে না। সে কারণেই চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
যুগান্তরের হাতে আসা এফএসআর বিভাগের পরামর্শক নিয়োগসংক্রান্ত দুটি পৃথক টার্মস অব রেফারেন্স (টর) বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৌলিক যোগ্যতার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে পরিবর্তনের কারণ, অনুমোদন বা যৌক্তিকতার কোনো উল্লেখ নেই সংশ্লিষ্ট নথিতে। প্রথম টর-এ আবেদনকারীকে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সদস্য হওয়ার পাশাপাশি আদালতে ন্যূনতম দুই বছর সক্রিয়ভাবে আইন পেশায় প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক ছিল। কিন্তু পরবর্তী টর-এ রহস্যজনকভাবে ‘ন্যূনতম দুই বছর’ শর্তটি পুরোপুরি বাদ দিয়ে শুধু আদালতে প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত রাখা হয়। ফলে বার কাউন্সিলের সনদপ্রাপ্ত হলেও দুই বছরের অভিজ্ঞতা না থাকা আইনজীবীও আবেদন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
বেবিচকের এফএসআর বিভাগের জন্য তৈরি এই টর-এর শর্ত শিথিল করা আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) নির্দেশিকার স্পষ্ট লঙ্ঘন। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ওই প্রার্থীর নাম শুভ্র দে। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগীদের একজন। তখনো তিনি বেবিচকে চুক্তিভিত্তিক পরামর্শক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।
বেবিচক সূত্র জানায়, শুভ্র দে-র জন্য ন্যূনতম দুই বছরের আদালতে আইন পেশায় সক্রিয় প্র্যাকটিসের শর্ত এবং এভিয়েশন ল-সংক্রান্ত শিক্ষাগত যোগ্যতায় অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে তার আবেদন করার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো কার্যত দূর হলো।
বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, যার জন্য ফাইলটি প্রস্তুত করা হচ্ছে, তার প্রয়োজনীয় দুই বছরের কোর্ট প্র্যাকটিস নেই। তাই শর্তটি বাদ দেওয়া হয়েছে।