সন্তান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের জন্য একদিকে যেমন নিয়ামত, অন্যদিকে তেমনি আমানতও। তাই সন্তানকে শুধু জন্ম দেওয়া, লালনপালন করা কিংবা ভরণপোষণের ব্যবস্থা করাই অভিভাবকের একমাত্র দায়িত্ব নয়; বরং তাকে নৈতিক, মানসিক, চারিত্রিক ও দীনি ভিত্তির ওপর গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে অশান্তির আগুন থেকে বাঁচাও। (সুরা তাহরিম, আয়াত-৬।) এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সন্তানের সফলতা শুধু দুনিয়াবি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং উত্তম মানুষ, দায়িত্বশীল নাগরিক ও আল্লাহভীরু বান্দা হিসেবে গড়ে তোলাই প্রকৃত সফলতা।

বর্তমান সময়ে সন্তান প্রতিপালন বা ‘প্যারেন্টিং’ বিষয়ে আলোচনা অনেক বেড়েছে। বই, সেমিনার ও গবেষণায় বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। অথচ আগের প্রজন্মে মা-বাবারা হয়তো এসব পরিভাষা ব্যবহার করতেন না, কিন্তু বাস্তব জীবনে সন্তানকে সময় দিতেন, খোঁজ নিতেন এবং আদব-আখলাক ও দায়িত্ববোধ শেখাতেন। আজকের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার, ব্যস্ত জীবনযাপন ও ভার্চুয়ালনির্ভরতা পরিবারে দূরত্ব তৈরি করছে। একই ঘরে থেকেও অনেক পরিবারে পারস্পরিক যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্মার্টফোন ও অনিয়ন্ত্রিত ইন্টারনেট শিশু-কিশোরদের মানসিক গঠন ও আচরণে বড় প্রভাব ফেলছে। তাই বর্তমান সময়ে অভিভাবকের দায়িত্ব আগের চেয়ে আরও বেশি।

সন্তানের সুন্দর জীবন গঠনে অভিভাবকের করণীয় দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো-সন্তানের জন্য নিয়মিত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা। সন্তানকে শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তার মেধা, মন-মননের পরিশুদ্ধতা ও বরকতের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে কল্যাণের দোয়া করতে হবে। শুধু দুনিয়াবি সফলতা নয়; সন্তানের ইমান, চরিত্র ও দীনের ওপর অটল থাকার জন্যও দোয়া করা প্রয়োজন। যেমন আল্লাহ শিখিয়েছেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন।’ (সুরা সাফফাত, আয়াত-১০০।)

সন্তানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছে প্রযুক্তিঅভিভাবকের উচিত সন্তানকে সময় দেওয়া। অনেক অভিভাবক সন্তানের জন্য সবকিছু করেন, কিন্তু সময় দিতে পারেন না। অথচ সন্তান সবচেয়ে বেশি চায় তার কথা কেউ শুনুক, তাকে বুঝুক এবং পাশে থাকুক। সন্তানের পড়াশোনা, বন্ধু, আচরণ ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়াও দায়িত্বের অংশ। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি, হাদিস ৮৯৩।)

এখন প্রযুক্তির যুগ। কেননা বর্তমান যুগে প্রযুক্তি থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা সম্ভব নয়। তবে নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার সন্তানের মনোযোগ, আচরণ ও মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মোবাইল হাতে তুলে দেওয়ার আগে তার ব্যবহার, সময় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করা জরুরি। পাশাপাশি সন্তান কার সঙ্গে মিশছে সে ব্যাপারে সজাগ ও সতর্ক থাকা জরুরি। সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠনে পরিবার, বন্ধু ও শিক্ষা পরিবেশ গভীর প্রভাব ফেলে। ভালো সঙ্গ মানুষকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, আর অসতর্ক পরিবেশ ধীরে ধীরে লক্ষ্যচ্যুত করতে পারে। সন্তান উপদেশের চেয়ে আচরণ থেকে বেশি শিক্ষা গ্রহণ করে। যে পরিবারে সম্মান, শৃঙ্খলা, নামাজ, দায়িত্ববোধ ও সুন্দর ব্যবহার থাকে, সেখানে সন্তানও সেভাবেই গড়ে ওঠে। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম।’ (তিরমিজি, হাদিস-৩৮৯৫।)

সন্তানকে যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিত করা প্রয়োজন। তবে বেশি প্রয়োজন নৈতিকতা ও দীনি শিক্ষা। দীনি চেতনা ছাড়া জাগতিক যেকোনো শিক্ষা অপূর্ণ হয়ে যায়। রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো পিতা তার সন্তানকে উত্তম চরিত্র ও উত্তম শিক্ষার চেয়ে উত্তম উপহার দিতে পারে না। (তিরমিজি, হাদিস-১৯৫২।) সন্তানকে বিলাসিতা ও অপ্রয়োজনীয় অর্থের প্রতি নির্লোভ হিসেবে গড়ে তোলা বাবা-মায়ের অন্যতম দায়িত্ব। সন্তানের প্রয়োজন পূরণ করা দায়িত্ব; কিন্তু অতিরিক্ত বিলাসিতা ও অযথা অর্থ হাতে তুলে দেওয়া অনেক সময় দায়িত্ববোধ কমিয়ে দেয়। সংযমী ও পরিমিত জীবনযাপন সন্তানকে বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে। তাকে শেখাতে হবে, অপচয়কারী শয়তানের ভাই। অপচয় দেশ ও জাতির জন্য অভিশাপ। তবে সন্তানকে শেখাতে হবে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব। সন্তানের লালনপালন, শিক্ষার পেছনে বৈধ ও পরিচ্ছন্ন উপার্জনের গুরুত্ব ইসলামে অত্যন্ত বেশি। অভিভাবকের জীবনাচরণও সন্তানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরিবারে পিতা-মাতার মতভেদ থাকতেই পারে, কিন্তু তা সন্তানের সামনে স্থায়ী বিরোধে পরিণত হলে তার মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই সন্তানের সামনে সম্মানজনক সম্পর্ক, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও ইতিবাচক আচরণ বজায় রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে শুধু সনদ, পেশা বা আর্থিক সফলতা নয়-একজন সন্তান যেন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, সেটাই হওয়া উচিত অভিভাবকের প্রধান লক্ষ্য।

♦ লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, চরপাথালিয়া সালমান ফারসি রা. মাদ্রাসা, মুন্সিগঞ্জ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews