ছবির ক্যাপশান,
শাকিল আহমেদ
Author,
তাফসীর বাবু
Role,
বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
Published
এক ঘন্টা আগেপড়ার সময়: ৫ মিনিট
"গুলিটা আমার কোমরের পেছনে একপাশে ঢুকে তেরছা হয়ে সামনে দিয়ে বেরিয়ে যায়। এইরকম একটা গুলি। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো একটা পিঁপড়া কামড় দিয়েছে! তারপর হঠাৎ নিচে তাকিয়ে দিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছে।"
বিবিসি বাংলাকে নিজের আহত হওয়ার সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলছিলেন বিশ বছর বয়সী শাকিল আহমেদ। তিনি ২০২৪ সালের চৌঠা অগাস্ট মিরপুর দশ নম্বর গোলচত্বরের কাছে আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন।
তখন তিনি ছিলেন একটি কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী।
সেদিন তিনি মিরপুরে নিজেও ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন তার স্মার্টফোনে।
বিক্ষোভের একপর্যায়ে গোলাগুলি শুরু হয়। শাকিল নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।
"গুলি লাগার পর আমি চেষ্টা করছিলাম দূরে সরে আসার। কিন্তু এতো রক্ত। আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। বল পাই না, রাস্তায় পড়ে যাই। আমি ভেবেছিলাম, এটাই শেষ। মরে যাচ্ছি। ফলে যে দুয়েকজন আমাকে তুলতে আসে তাদেরকে অনুরোধ করি আমার মায়ের মোবাইল নাম্বারটা টুকে নিতে। যেন আমার লাশটা অন্তত মায়ের কাছে পৌছায়।"
গুলিবিদ্ধ শাকিলের মায়ের মোবাইল নাম্বার বলতে থাকার সেই ভিডিওটি পরে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই ভেবেছিলেন তিনি হয়তো মারা গিয়েছেন।
"কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে যাই। শরীরে ভয়ানক ক্ষতি হয়। পরে আমাকে সরকারিভাবে থাইল্যান্ডে নেয়া হয় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু আমার শরীরে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা মনে হয় আজীবন থেকে যাবে।"
বাংলাদেশে চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে সরকারি হিসেবে মারা যায় আটশত তেতাল্লিশ জন।
তবে আহত হয় বহুসংখ্যক। সংখ্যাটি চৌদ্দ হাজার তিনশত সাতষট্টি।
এরমধ্যে দুই চোখ কিংবা অন্তত এক চোখ হারিয়েছেন পাঁচশত চারজন। এছাড়া পা কেটে ফেলতে হয়েছে অনেকের। সেই ক্ষত কিংবা পঙ্গু শরীর নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন আহতরা।

ছবির ক্যাপশান,
জুলাই আন্দোলনে চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন সাব্বির আহমেদ
শাকিল আহমেদের গুলি লাগার পর তাকে নেয়া হয় হাসপাতালে।
গুলিতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় তার পেশাব এবং পায়খানার রাস্তা।
"যাদের কোলন ক্যান্সার হয়, তাদের জন্য পেটের একপাশে বিশেষ ব্যাগ লাগানো হয় মলমূত্র ত্যাগের জন্য। আমার যেহেতু বাথরুমের রাস্তাটা নষ্ট হয়ে যায়, আমাকেও সেরকম ব্যবস্থাটা করে দেয়া হয়েছিলো। দেড় বছর এভাবে আমার চলেছে।"
শাকিলের অপারেশন হয়েছিলো ৯টি। দেশে চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা না থাকায় তাকে নেয়া হয় থাইল্যান্ডে। সবগুলো অপারেশন সেখানেই করা হয়।
তিনি বলেন, "নয় নম্বর অপারেশনের পরে তারা আমার এই ওয়াশরুমের রাস্তাটি খুলে দেয়। তারা ভেবেছিলো ঠিক হয়ে গেছে। কিন্তু আসলে ঠিক হয়নি। পরে তারা বিকল্প পদ্ধতি নেয়। এই বিকল্প পদ্ধতির চিকিৎসা নিয়েই কষ্ট করে অসুস্থতা নিয়ে চলতে হচ্ছে।"
তবে শাকিলের সমস্যা শুধু সেখানেই আটকে থাকেনি। গুলির কারণে তার ডান পায়ের রগেও ইনফেকশন ধরা পড়ে। যার ফলে দীর্ঘদিন নিজ পায়ে দাঁড়িয়ে হাঁটতে পারেননি।
"আমার পায়ের উরুতে রক্তনালীর কিছু অংশ কেটে ফেলে দিতে হয়েছে। রগের মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ফলে উপর থেকে রক্ত সরাসরি পায়ের নিচে যেতে পারে না। এতে করে পা অবশ হয়ে থাকে। ডাক্তার বলেছেন এটা আর ভালো হবে না।" বলেন শাকিল আহমেদ।
মি. আহমেদ এখন হাঁটতে পারেন। তবে দুয়েকমিনিট হাঁটার পরই তাকে থেমে যেতে হয়। পায়ে ব্যাথা হয়।
এছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসেও থাকতে পারেন না।
তিনি বলেন, "পায়ে সার্বক্ষণিক ঝিমঝিম করে। চিনচিন করে ব্যাথা করতে থাকে। আমি যে কোনো কাজ করবো বা কোনো চাকরি করবো, সেটাও সম্ভব হচ্ছে না।"
শাকিল আহমেদ যেদিন মিরপুরে গুলিবিদ্ধ হন, সেই একইদিনে ঢাকার কারওয়ানবাজারে আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সাব্বির আহমেদ।
তিনি বলছিলেন, সেদিন হঠাৎ একটি গুলি 'উপর থেকে কিছুটা তেরছাভাবে' কপালের একপাশ দিয়ে ঢুকে চোখ দিয়ে বেরিয়ে যায়। গুলিতে তার চোয়ালের হাড় ভেঙে যায়। চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসে।
"গুলিটা একটু অ্যাঙ্গেল হয়ে বের হয়ে যায়। চোখ দিয়ে বের হয়ে যায়। গুলিতে চোখটা বের হয়ে নিচে ঝুলতে থাকে।"
"ডাক্তারের ভাষ্যমতে এটা স্নাইপার শট ছিলো। বড় বুলেট ছিলো। আল্লাহপাক আমাকে বাঁচায় রাখছেন আরকি! ঐ চোখটা তো গেছেই, পাশের চোখের যে নার্ভ সেটাও নষ্ট হওয়ায় একসঙ্গে দুই চোখই আমার অন্ধ হয়ে গেছে!" যোগ করেন সাব্বির আহমেদ।
মি. আহমেদ বিবাহিত। আড়াই মাস আগে তিনি পুত্র সন্তানের বাবা হয়েছেন।
গত মঙ্গলবার মগবাজার তার বাসায় গিয়ে দেখা যায়, আড়াই মাস বয়সী পুত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে আদর করছেন তিনি।
কখনো সন্তানের মাথা, হাত, পা স্পর্শ করে মূলত সন্তানকেই যেন দেখার চেষ্টা করছেন।
"এই যে আমার বাচ্চার মাথা। চুল নাই, চুল অনেক ছোট ছোট। এই যে কান, গাল।" সন্তানকে স্পর্শ করতে করতে বলতে থাকেন মি. আহমেদ।
"আলহামদুলিল্লাহ! ছেলেটা সুন্দর হয়েছে! আমি শুনেছি!" হাসতে হাসতে যোগ করেন সাব্বির আহমেদ।

ছবির ক্যাপশান,
সন্তানকে 'স্পর্শ করে দেখার' চেষ্টা করছেন চোখ হারানো সাব্বির
মি. আহমেদ জানান, বাইক তার খুব পছন্দ। সময় পেলেই ঘুরতে যেতেন। পাহাড়-নদী-সাগর খুব টানে তাকে। কিন্তু এখন আর এসব দেখার সুযোগ নেই।
"কালো রঙ ছিলো আমার সবচেয়ে প্রিয় কালার। এখনতো জগৎটাই কালো হয়ে গেছে। আমি যখন স্বপ্ন দেখি, তখন স্বপ্নে সবকিছু রঙিন দেখি। আজতেও ফজরের পরে স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নে বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছি, ঘুরছি। কিন্তু ঐ স্বপ্ন থেকে যখন ঘুমটা ভাঙছে, তখনই দিলের ভেতরে একটা চিনচিন করে ব্যাথা শুরু হয়ে গেছে।
"স্বপ্নের ভেতরই তো ভালো ছিলাম। আরেকটু যদি ঘুমায় থাকতে পারতাম, তাহলে স্বপ্নটা হয়তো আরেকটু বড় হতো। ঘুমটা যদি না ভাঙতো, তাহলে স্বপ্নটা সুন্দর হতো" আক্ষেপ করে বলতে থাকেন সাব্বির আহমেদ।
তিনি জানান, নিজের সন্তানকে যে দেখতে পারছেন না, মা কে দেখতে পারছেন না -এই কষ্ট তাকে প্রতিনিয়ত কাঁদায়।
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের বাসিন্দা রাকিব হোসেন। পেশায় ইলেক্ট্রিশিয়ান। ইলেক্ট্রিশিয়ানের কাজ শিখে অপেক্ষায় ছিলেন বিদেশে যাবার। চলছিলো ভিসার প্রস্তুতি।
এমন সময়ই শুরু হয় জুলাই আন্দোলন।
চব্বিশের ষোলই জুলাই থেকে রাকিব হোসেন জড়িয়ে পড়েন আন্দোলনে। বন্ধুদের সঙ্গে প্রতিদিনই নামেন রাস্তায়।
বিশ তারিখ এমনই এক বিক্ষোভের সময় বাম পায়ে গুলি লাগে তার।
রাকিব বলছিলেন, "আমি একটু পিছনেই আছিলাম। এমনকি গুলি যে লাগছে, সেটাও টের পাই নাই প্রথমে। যখন আমি দৌড়ায়া আরো পিছনে যাবার চেষ্টা করছি, তখনই বুঝতে পারি যে পা নড়ে না। নিচে তাকায় দেখি যে, আমার পা ছিদ্র হয়ে গেছে। আর রক্ত পড়তেছে। তখনই আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।"
প্রথম দফায় স্থানীয় একটি হাসপাতাল, তারপর ঢাকা মেডিকেল, হৃদরোগ হয়ে পঙ্গু হাসপাতাল -রাকিবকে নিয়ে সবখানে ছোটাছুটি করেন তার বাবা-মা।
তবে শেষপর্যন্ত পা আর বাঁচানো যায়নি।
"পঙ্গুতে ডাক্তার বলছিলো যদি প্রথম ছয় ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন করা যাইতো, তাহলে পা কাটা লাগতো না। কিন্তু আমার অপারেশন হইছে আঠারো ঘণ্টা পর। ততক্ষণে ইনফেকশন হয়ে গেছে। ফলে বাম পা কাইটা দেয়া লাগছে।" বলেন রাকিব হোসেন।
মি. হোসেন চেষ্টা করছিলেন বিদেশে যাবার। এখন বিদেশ তো দূরের কথা। কাজই করতে পারেন না। স্ত্রী এবং বাবা-মা নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন সংসার চালাতে।
রাকিব হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, "আমি সরকার থেইকা ভাতা পাই ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু এইটা দিয়া তো চলে না। আমার এক পা নাই। কত জায়গায় গেছি কাজের জন্য। কেউ কাজ দেয় না। এই অবস্থায় ইলেক্ট্রিকের কাজও করা যায় না।"