দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়ালে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রকট প্রবণতা। যা ক্রমেই হতাশ আর জটিল করে তুলছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎকে। রাজনীতিবিদদের মধ্যে অতীতের মতো সৌহার্দ্যপূর্ণ, আন্তরিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক এখন প্রায় নেই বললেই চলে। আদর্শগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার বদলে রাজনীতিতে স্থান করে নিয়েছে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধপ্রবণতা। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই প্রবণতা দৃশ্যমান। ক্ষমতায় গেলেই বিরোধীদলকে দমনের জন্য অন্যায়ভাবে সীমাহীন নির্যাতন করার বিষয়টি দেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বাস্তবতা ও আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা, মূল্যবোধ ও সহনশীলতার অভাব যখন দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে ঠিক সেই রকম একটি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য অত্যন্ত বিরাট একটি প্রাপ্তি ও সুখবর হচ্ছে দীর্ঘদিন পর দেশ পেতে যাচ্ছে সর্বমহল ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য একজন রাজনৈতিক অভিভাবককে। বাংলাদেশের ২৩তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন রাজনীতির এক সৎ ও ভদ্র ব্যক্তিত্ব বিএনপির প্রাক্তন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ বঙ্গভবনে শপথ নেওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি দেশের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।
গত প্রায় এক মাস ধরেই কে হচ্ছেন দেশের নতুন প্রেসিডেন্ট- এই প্রশ্ন আর জল্পনা-কল্পনা ছিল তুঙ্গে। এই তালিকায় সম্ভাব্য বেশ কয়েকজনের নাম থাকলেও জনপ্রত্যাশা আর আস্থা সবচেয়ে বেশি ছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উপরই। আর এই আস্থার জায়গাটা মির্জা ফখরুল তৈরি করেছেন তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে সততা, ত্যাগ, দল ও জনগণের প্রতি জোরালো কমিটমেন্ট, বিনয়ী-অমায়িক ব্যবহার ও স্বভাবসুলভ শালীন ভাষার বক্তব্য উপস্থাপনের মাধ্যমে। পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মির্জা ফখরুলের উপর যে জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছিল সেটা তাকে আরও অনেক অনেক বেশি সহানুভূতিশীল ও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে সর্বস্তরের মানুষের কাছে। একজন সৎ ও মার্জিত রাজনীতিবিদ হিসেবে মির্জা ফখরুলের একটি অন্যতম সেরা প্রাপ্তি হচ্ছে, সকলেই এমনকি তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতারাও একবাক্যে বলতে বাধ্য হন ‘মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একজন আপাদমস্তক ভদ্রলোক’। নিঃসন্দেহে মির্জা ফখরুলকে প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন দিয়ে তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, দলের প্রতি অবিচল আস্থা ও জনগণের ভালোবাসার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে তার প্রতি যথাযথ স্বীকৃতি ও সম্মান প্রদান করেছে তার দল বিএনপি। এটা একজন ত্যাগী নেতার প্রতি দলের যথাযথ মূল্যায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
স্বভাবতই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রেসিডেন্ট পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকেই আনন্দিত ও উচ্ছ্বসিত তার দল বিএনপির নেতা-কর্মীসহ সারা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তার নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও পরিণত হয়েছে উৎসবের নগরীতে। সরকারের মন্ত্রী হিসেবে প্রাপ্ত তার হেয়ার রোডের সরকারি বাসায় প্রতিদিন চলছে হাজার হাজার লোকের উৎসবমুখর আনাগোনা। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমার সাথে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যে কারণে অনেক কাছ থেকে তাকে দেখার এবং তার সার্বিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিশ্লেষণ করার সুযোগ আমার হয়েছে। ব্যক্তিগত এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই গত ১৯ আগস্ট বুধবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে আলাপ হচ্ছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে। আলাপচারিতার এক পর্যায়ে স্বভাবসুলভভাবেই অতীতের ন্যায় সেদিনও তিনি চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন রাতে তার হেয়ার রোডের বাসায়। রাত ১০টায় তার হেয়ার রোডের বাসায় পৌঁছে দেখি এক বিরল দৃশ্য। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সেখানে তৈরি হয়েছে এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এত বিশাল বাড়ি অথচ তিল ধারণের জায়গা খালি নেই। প্রতিটি কক্ষ লোকে লোকারণ্য। বাড়ির বিশাল আঙিনার বাগান আর গাড়ি পার্কিংয়ের স্থানগুলোতেও দেখা মিলল শত শত মানুষের অবস্থান ও আড্ডা। যতই সময় গড়াচ্ছিল লোকসমাগম ততই বাড়ছিল। এটা ছিল হেয়ার রোডের এক অভূতপূর্ব দৃশ্য।
হেয়ার রোডের মন্ত্রীপাড়ায় নেতা-কর্মীদের আনাগোনা ও ভিড় একটি স্বাভাবিক ও নিত্যদিনের ঘটনা। কিন্তু মির্জা ফখরুলের বাসায় গত বুধবার লোকসমাগমের যে দৃশ্য পরিলক্ষিত হলো তা একেবারেই ব্যতিক্রম ও বিরল। হেয়ার রোড যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল। জনস্রোতের চাপে কেউই গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকতে না পারায় হেয়ার রোডের প্রধান সড়কে দেখা মিলল শত শত গাড়ির অপেক্ষমাণ বহর। যারাই আসছিলেন তাদের অনেকেরই হাতে ছিল ফুলের তোড়া এবং মিষ্টি। সকলের মুখেই অভিন্ন এক আনন্দের হাসি, বিশাল এক প্রাপ্তির উন্মাদনা। অগণিত নেতা-কর্মী ও ভক্তদের পাশাপাশি অপরিচিত অনেক মানুষও এসেছেন শুধুমাত্র তাদের এই প্রিয় মানুষটিকে একনজর কাছ থেকে দেখার প্রত্যাশায়। শত শত মানুষের এই ঢল সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল নিরাপত্তাকর্মীদেরও। তারপরও ক্লান্ত মির্জা ফখরুল চেষ্টা করেছেন আগত সকলের সাথেই দেখা করে হাত মেলাতে ও হাসিমুখে শুভেচ্ছার জবাব দিতে। তবে উপস্থিত তার নির্বাচনী এলাকার মানুষের কারো কারো মনে হতাশাও দেখা গেল এই ভেবে যে তারা আর আগের মতো চাইলেই সহজে তাদের প্রিয় নেতার সাথে বঙ্গভবনে দেখা করতে পারবেন না। এই আক্ষেপ করছিলেন উপস্থিত অনেকেই।
বাংলাদেশের নতুন প্রেসিডেন্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে চা খাওয়ার সময় শুধু একটি প্রশ্নই করেছিলাম, আপনার অনুভূতি কী? জবাবে পুরোপুরি আবেগাপ্লুত হয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আমার প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয় আমার দল বিএনপি থেকে আমাকে আগামীকাল পদত্যাগ করতে হবে, এটা আমি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। এটা মেনে নেওয়া আমার জন্য অনেক অনেক কঠিন আর কষ্টের। এ সময় মির্জা ফখরুলের চোখের পানি আর তার দুঃখভারাক্রান্ত অভিব্যক্তি দেখে কিছুক্ষণ আর কেউই কোনো কথা বলতে পারিনি।