১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হয় অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকার। যে চুক্তিকে বলা হচ্ছে গোলামির চুক্তি। আমেরিকার সঙ্গে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের কথিত বাণিজ্য চুক্তিকে ঢেকে রাখা হয়েছে গোপনীয়তার চাদরে। চুক্তির শর্তানুযায়ী বাংলাদেশ এ গোপনীয়তা রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বলা হয়, ‘যাহা কিছু গোপন তাহাই ষড়যন্ত্র।’ বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তির যেসব খবর চাউর হয়েছে তাতে এটিকে দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে বড়মাপের ষড়যন্ত্র বললেও কম বলা হবে। অনেকে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউনূস সরকারের বোঝাপড়াকে লর্ড ক্লাইভ ও মীরজাফরের গোপন সমঝোতার সঙ্গে তুলনা করছেন। বলা হচ্ছে, মীরজাফরের গাদ্দারির কারণে এ দেশকে ১৯০ বছর ইংরেজদের দাসত্ব করতে হয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অসম চুক্তির কারণে বাংলাদেশের পক্ষে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই কঠিন হয়ে পড়বে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে। আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভারসাম্য বরাবরই ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। কিন্তু ৯ ফেব্রুয়ারির অসম বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছে। এ চুক্তির কারণে আমেরিকা থেকে বেশি দামে খাদ্য কিনতে হবে। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অস্ত্র কেনা হতো চীন ও রাশিয়া থেকে। তার চেয়ে দ্বিগুণ কিংবা বেশি দামে এখন আমেরিকা থেকে অস্ত্র কিনতে হবে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বাংলাদেশ বিমান। শুরু থেকেই লাগাতার লোকসানের নজির রেখেছে এ সংস্থাটি। বাংলাদেশ বিমানকে বলা হয় সোনা চোরাচালানের নিরাপদ বাহন। জাতির ঘাড়ে লোকসানের বোঝা চাপানো এ বিমান সংস্থা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সে লোকসান আরও কয়েক গুণ বাড়ানো নিশ্চিত করবে আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি।
জাতীয় স্বার্থবিরোধী ওই চুক্তিতে বাংলাদেশকে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এর ফলে ব্যয় হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
দুর্জনদের বক্তব্য, সাবেক প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধু ইউনূসকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসাতে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছেন। আমেরিকার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ‘সিএসবি নিউজ ইউএসএ’ ১০ এপ্রিল ২০২৬ তাদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ৩২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার সমান। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেও স্বীকার করেছেন, ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ছিল ‘অত্যন্ত সুপরিকল্পিত; এটি কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়।’ দেখেশুনে মনে হচ্ছে, জাত ব্যবসায়ী ট্রাম্প সুদে আসলে সে অর্থ আদায়ে তাঁদের তল্পিবাহক ইউনূসকে দিয়ে এমন একটি চুক্তি করিয়ে নিয়েছেন, যাতে বাংলাদেশকে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা গচ্চা দিতে হবে।
আমেরিকার সঙ্গে ইউনূস সরকারের গোপন বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় সংবেদনশীলতার পরিপন্থি। মুসলমান ও ইহুদিদের জন্য শূকরের মাংস হারাম বা নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে বাকারাসহ একাধিক শুরায় শূকরের মাংস যে হারাম, সেটির উল্লেখ রয়েছে। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতেও বলা হয়েছে, ‘শূকর যদিও বিভক্ত খুরওয়ালা, কিন্তু জাবর কাটে না, তাই তোমরা এটিকে অপবিত্র গণ্য করবে। এর মাংস খেও না, মৃতদেহ স্পর্শও কর না।’ তবে নামধারী মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে শূকরভোজীর সংখ্যা খুব একটা কম নয়। পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় শূকরের মাংস ঠাঁই পেত। জিন্নাহর ব্যক্তিগত সচিব করিম চাগলা এটি স্বীকারও করেছেন। জিন্নাহ বিলাতে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় চলনবলনে সেদেশিদের চেয়েও বেশি ইংরেজ হওয়ার কসরত করেছেন। শূকরের মাংসের প্রতি কায়দে আজমের আসক্তি সে সময়ে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৩২ নম্বরের বাসভবনসহ সব স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের পাশাপাশি শুরু হয় জিন্নাহচর্চা। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পর বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থিরা ৫৩ বছর ধরে যে কষ্ট বুকে লালন করেছেন, তা উদগিরণের সুযোগ পান ৫ আগস্টের পর। জিন্নাহচর্চার মাধ্যমে তারা তাদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টাও করেছেন নির্ভয়ে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় তখন বসেন ড. ইউনূস। জিন্নাহর মতোই তিনি মননে-মেজাজে পশ্চিমা ভাবধারার মানুষ। জিন্নাহর মতো উদার খাদ্যাভ্যাসে ইউনূস অভ্যস্ত কি না, তা আমাদের জানা নেই। তবে জিন্নাহর মতো তিনিও বিয়ে করেছেন এক অমুসলিম নারীকে। জিন্নাহ তাঁর পারসিক বন্ধু পেটিটের কিশোরী কন্যা রতন বাই পেটিটকে বিয়ে করেন। রতন বাই-জিন্নাহ দম্পতির একমাত্র সন্তান দিনা জিন্নাহ। তিনিও বিয়ে করেন ওয়াদিয়া নামের এক পারসিক যুবককে। জিন্নাহ ব্যক্তিজীবনে ধর্মের ধার না ধারলেও একজন অমুসলিমের সঙ্গে তাঁর কন্যার বিয়ে মেনে নিতে পারেননি। সম্ভবত রাজনৈতিক ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এই ভয়ে। পারসিক যুবক ওয়াদিয়ার সঙ্গে দিনার বিয়ে টেকেনি। তারপরও দিনা ফিরে যাননি তাঁর বাবার কাছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জিন্নাহর কন্যা ভারতেই থেকে যান। বাবার মৃত্যুর পর তিনি অবশ্য পাকিস্তানে গিয়েছিলেন শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে। তারপর ভারতে ফিরে আসেন। বাবার বিশাল সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে চাননি। পরবর্তী সময়ে আমেরিকার নাগরিকত্ব ও খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেন। ড. ইউনূস বিয়ে করেন রাশিয়ান বংশোদ্ভূত আর্থডেক্স খ্রিস্টান নারী ভেরা ফরোস্টেনকোকে। ভেরা ইউনূস দম্পতির ঘরে জন্ম নেন মনিকা। ইউনূসকন্যা মনিকা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী। পেশায় তিনি অপেরাশিল্পী।
বলছিলাম বাংলাদেশে জিন্নাহচর্চার কথা। অনেকের মতে, এই চর্চার পেছনে ড. ইউনূসের প্রশ্রয় ছিল। বাংলাদেশে শূকরের মাংস আমদানি ছিল নিষিদ্ধ। ইউনূস সাহেবের আমলে জিন্নাহচর্চার পাশাপাশি বাংলাদেশে শূকরের মাংস আমদানি নিশ্চিত করা হয়েছে আমেরিকার সঙ্গে সম্পাদিত গোপন চুক্তির বদৌলতে।
‘মিট’, ‘প্রসেসড মিট’ বা ‘ফুড প্রোডাক্ট’-এই সাধারণ ক্যাটাগরির আড়ালে বাংলাদেশে অবাধে শূকরের মাংস ঢোকার সুযোগ পাবে। অনেকে এ চুক্তিকে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার পরিপন্থি বলে মন্তব্য করেছেন। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হইচই উঠলেও ধর্মীয় নেতারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন।
ইউনূস প্রশাসনের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আকতার স্বীকার করেছেন, সরকারের ভিতরে থেকেও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা অবৈধ চুক্তি ঠেকাতে পারেননি। সম্প্রতি রাজধানীতে এক গোলটেবিল আলোচনায় ফরিদা আকতার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে সস্তায় মাংস, পোলট্রি ও প্রাণিজ পণ্য আমদানির যে চুক্তি হয়েছে, তা মূলত বাংলাদেশের দুই কোটি খামারিকে পথে বসানোর মহোৎসব। তিনি স্পষ্ট করেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বিষাক্ত ও অতিরিক্ত উৎপাদিত মাংস বাংলাদেশে ডাম্পিং হওয়ার আশঙ্কা আছে।’ যে মাংসগুলো জেনেটিক্যালি মডিফাইড বা বিষাক্ত কর্ন খাইয়ে বড় করা হয়েছে, সেগুলোই এখন ডলারে কিনে এ দেশের মানুষের পাতে তুলে দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সিনেমা দেখা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি কন্যা জাইমাকে নিয়ে সিনেমা দেখেন ধানমন্ডির সীমান্ত সম্ভার শপিং মলের স্টার সিনেপ্লেক্সে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হইচই তুলেছে নিকৃষ্ট রুচির কিছু জীব। তাদের হাবভাবে মনে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী কন্যাকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে মস্ত ভুল করে বসেছেন! একজন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবন থাকা উচিত নয়, এমন তত্ত্বও হাজির করার কসরত চালিয়েছে ওই সব দুর্জন।
অন্য সবার মতো সরকারপ্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধানরাও যে মানুষ এই সহজ সত্যটি আমাদের দেশের অনেকেই ভুলে যান। উন্নত বিশ্বের সব দেশেই রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানরাও অন্য সবার মতো সাপ্তাহিক অবকাশ যাপন করেন। দেশ ও জাতির পাশাপাশি নিজেদের পরিবারকেও সময় দেন।
পাকিস্তানের রাজনীতিতে একটি অবিস্মরণীয় নাম জুলফিকার আলী ভুট্টো। দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ৯২ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য আত্মসমর্পণ করে। বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরিত দেশ না হওয়ায় আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি সৈন্যদের ভারতের জিম্মায় দেওয়া হয়। পশ্চিম সেক্টরেও বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য আটক হয় ভারতীয় বাহিনীর হাতে। পাকিস্তানি বাহিনীর লজ্জাজনক পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পদত্যাগ করেন। প্রেসিডেন্ট হন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ১৯৭২ সালে তিনি ভারতের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি করতে সেদেশ সফর করেন। সঙ্গে নেন কন্যা বেনজির ভুট্টোকে। ভারতের সিমলায় দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকন্যা বেনজিরের বয়স তখন ১৯ বছর। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঐতিহাসিক সিমলা চুক্তি স্বাক্ষরের আগে দুই দেশের দুই শীর্ষনেতা ব্যস্ত সময় কাটান দীর্ঘ আলোচনায়। চলে দরকষাকষি। সেই ব্যস্ততার মধ্যেও ইন্দিরা গান্ধী বেনজিরের কাছে জানতে চান কীভাবে সে সময় কাটাতে চায়। বেনজির ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ‘পাকিজা’ ছবিটি দেখতে চান। বলিউডের ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ মীনাকুমারী অভিনীত পাকিজা ছবিটি সে সময় ছিল ভারতের সুপারহিট মুভি। ইন্দিরা গান্ধী সানন্দে বেনজিরের কথায় সায় দেন।
ভারতের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বেনজিরের জন্য সিমলার ‘রিটজ’ সিনেমা হলে পাকিজার স্পেশাল শো-র আয়োজন করা হয়। সিনেমা হলে দর্শক ছিলেন মাত্র তিনজন। বেনজির, ভারতীয় আমলা এম কে কাউ ও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা বীণা দত্ত। সেদিন অবশ্য বেনজিরের সঙ্গে তাঁর বাবা জুলফিকার আলী ভুট্টো ছিলেন না।
বেনজির ভুট্টোর মতো জাইমা রহমানও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। যাঁর বাবা প্রধানমন্ত্রী। দাদি দেশের তিনবারের সরকারপ্রধান। দাদা ছিলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি রাজনীতিতে আসবেন কি না, তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে এ কারণে যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল করে চলেছেন, তারা তাদের নীচতারই প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। এ অপখেলা কারোর মঙ্গল ডেকে আনবে না।
লেখক : সিনিয়র সহকারী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন
ইমেইল : [email protected]