আবদুর রাজ্জাক
ঢাকা আইনজীবী সমিতির এবারের নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত ‘নীল প্যানেল’ এবং জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত ১১ দলীয় আইনজীবী ঐক্য পরিষদ মনোনীত ‘সবুজ প্যানেল’-এর পাশাপাশি আটজন স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেন।
গত ২৯ ও ৩০ এপ্রিল ২০২৬ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আইনজীবীরা মনে করেন ঢাকা বারের ইতিহাসে এটি একটি প্রহসনমূলক নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন গঠনে অসামঞ্জস্য, নির্বাচনে জালভোট, বুথের ভেতর ঢুকে ভোট টেম্পারিং, একজনের ভোট অন্যজনের দেয়া, ভোট প্রদানে কমিশন সদস্যের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ ইত্যাদি ছিল এবারের নির্বাচনের দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য। নির্বাচনের এ পরিবেশের কারণে ভোটার উপস্থিতি কম হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
নির্বাচনের আগেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ : নির্বাচন কমিশন গঠনে পক্ষপাতিত্বের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এবারের নির্বাচন। দীর্ঘ সময় ধরে ঢাকা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন সাধারণত দু’টি প্যানেলের মধ্যে হয়ে থাকে। উভয় প্যানেলের মতামত ও সমতার ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়। যাতে কোনো অসমতা না থাকে। যারা প্রার্থী হতে চান তারা বিনা বাধায় প্রার্থী হতে পারতেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। একদিকে নির্বাচন কমিশন গঠনে বৈষম্য, অন্যদিকে নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধা দেয়ার ঘটনা। কমিশন গঠনে যেখানে সবুজ প্যানেল পাঁচজন এবং নীল প্যানেল পাঁচজন হওয়ার কথা। একজন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, ১০ কমিশনার, ১০০ জন কমিশন সদস্য ও প্রয়োজনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার আরো ২০ জন নিতে পারবেন। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের মোট সদস্য ১+১০+১০০+২০= ১৩১ জন। সেখানে নির্বাচন কমিশনার নীল প্যানেলের সাতজন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ আটজন এবং সবুজ প্যানেলের প্রথমে দু’জন পরে একজনসহ তিনজন নিয়ে গঠিত হয়। বলা হয়েছিল, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে হবে। কিন্তু নীল প্যানেলের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনে দলীয় প্রভাব খাটানো হয় এবং অসম নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়।
এভাবে নীল প্যানেল নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে ৯০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে আর সবুজ প্যানেলকে ৪১ জন দেয়া হয়। যেখানে নীল প্যানেল ৬৫ জন আর সবুজ প্যানেল ৬৫ জন থাকার কথা। এছাড়া নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধা দেয়ায় অনেকে প্রার্থী হতে পারেননি। এতে নীল প্যানেলের মদদ ছিল। শেষ পর্যন্ত কার্যকরী কমিটি ও নির্বাচন কমিশন তাদের কাছে নতি শিকারে বাধ্য হয়। ফলে নির্বাচনের আগেই নীল প্যানেল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ফেলে। নির্বাচন যে একপেশে হতে যাচ্ছে সে লক্ষণ দেখে সাধারণ ভোটাররা নানা প্রশ্ন তোলেন। অনেকে নির্বাচনের বিষয়ে অনীহা প্রকাশ করে। আর এ অবস্থা বোঝা যায় নির্বাচনের দিন ভোটারদের উপস্থিতি ও তাদের মধ্যে হতাশা দেখে। যারা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে ভয় পায় তারা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খালি মাঠে গোল দেয়ার পাঁয়তারা করে। এভাবেই একপ্রকার অসম এবং দলীয়করণের নীলনকশার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
নির্বাচনের দুদিন পরিবেশ ছিল অনাকাক্সিক্ষত : নির্বাচনের দিনগুলোতে ভোট কেন্দ্রের ভেতর ছিল নীল প্যানেলের প্রাদুর্ভাব এক ধরনের জিম্মি অবস্থা। ভোটারদের যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া এবং ভোটার স্লিপ ছাড়াই ব্যালট পেপার দেয়া হয়। যার কারণে বহু ভোটার আইনজীবী নিজেদের ভোট দিতে এসে দেখে ভোট দেয়া হয়ে গেছে। বেশ কিছু জাল ভোট প্রদান ধরাও পড়ে। এছাড়া বুথে সাবেক ও বর্তমান কমিটির কিছু সদস্য এবং নির্বাচন কমিশনের কতিপয় সদস্য সরাসরি তাদের প্রার্থীকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করে এবং শক্তি প্রদর্শন করে। যেহেতু কমিশনে নীল প্যানেলের সদস্য বেশি সেহেতু তারাই এ কাজ করতে দ্বিধা করেনি এবং কারো কথায় কর্ণপাত করেনি।
নির্বাচনে ভোট গ্রহণের জন্য ৩০টি টেবিল বসানো হয়। প্রতি টেবিলে সবুজ প্যানেলের একজন এবং নীল প্যানেলের দু’জন কমিশন সদস্য দেয়া হয়। যখন জাল ভোটের জন্য ফলস ভোটাররা গিয়েছে এবং নাম, সদস্য নম্বর না বলতে পারলেও টেবিলে নীল প্যানেলের সদস্য দু’জন থাকায় ব্যালট দিয়ে দেয়ায় জাল ভোটে উৎসাহিত হয়ে জালভোটের এক মহাউৎসব পরিলক্ষিত হয়। একজন ব্যক্তি পাঁচ-ছয়টি থেকে এমনকি ২০-২৫টি পর্যন্ত জালভোট দিয়েছে। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষ শনাক্তকৃত নির্ধারিত টেবিল থেকে একজনকে একাধিক ব্যালট পেপার দেয়া হয়। নির্বাচনে যাতে জালভোট দেয়া সহজতর হয় সেজন্য অহেতুক মব সৃষ্টি করা হয়। নির্বাচনের দুদিনে ৮-৯ বার মব সৃষ্টির প্রচেষ্টা করা হয়।
ভোট গণনায় সন্দেহ : দেখা গেছে ভোট গণনার টেবিল ৩০টি। এখানে নীল প্যানেলের লোক সংখ্যা সবুজ প্যানেলের চেয়ে দ্বিগুণ ছিল। যেখানে সবুজ প্যানেলের একজন সেখানে নীল প্যানেলের দু’জন করে এক একটি টেবিলে দেয়া হয়। যখন এক একজন ক্যান্ডিডেটের ভোট গণনা চলছে তখন নীল প্যানেলের লোকসংখ্যার কাছে সবুজ প্যানেলের সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়েছে। এমনকি অনেক টেবিলে ক্যান্ডিডেটের ভোট গণনায় নীল প্যানেলের লোকসংখ্যা বেশি থাকার সন্দেহের পাল্লা ভারী হয় যে ভোট গণনায় প্রচুর কারচুপি হওয়ার।
ফলাফলের অনেক আগেই নীল দলের বিজয়ের উল্লাস : দেখা যায় ফলাফলের এখনো চার ঘণ্টা বাকি তারপরও নীল প্যানেলের বিজয়ের সাক্ষাৎকার নিতে সাংবাদিক চলে আসে। এমনকি সাংবাদিক এই বলে সাক্ষাৎ নিতে চায় চার ঘণ্টা আগেই যে, বারের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল বলেছেন নীল প্যানেলের বিজয় হয়ে গেছে বলে।
বারের ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়; নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়নি : সব মিলিয়ে এটি বলা যায়, নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়নি। অব্যবস্থাপনা, বিশৃঙ্খলা, দলীয়করণ, উপরের চাপ, অনিয়ম, আর পক্ষপাতিত্বের কারণে আইনজীবীদের কাছে এই নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়নি। যা বারের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী