নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি বহু দিনের। অনেকেরই জানা থাকার কথা, দেশের ব্যবসায়ীরা সার্বক্ষণিক সরবাহের নিশ্চয়তায় বিদ্যুতের অতিরিক্ত দাম দিতে রাজি বলে জানিয়েছিলেন। তারপরও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিদ্যুতের অভাব বা লোডশেডিংয়ের কারণে পূর্বাপর উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। প্রতিদিন গড়ে দু’হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে ১০/১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ভূমিকা প্রধান। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো থেকে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রও আছে বেশ কিছু। যেগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিদ্যুৎ আসে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে শীর্ষস্থান অধিকারের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। গ্যাস-তেলের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে গ্যাস ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ইরান যুদ্ধে বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘিœত হওয়া ছাড়াও দাম বেড়েছে অস্বাভাবিক মাত্রায়। বৈশ্বিক এই জ্বালানি পরিস্থিতি অন্যান্য দেশের চেয়ে আমাদের দেশে বৈরী প্রভাব ফেলেছে সবচেয়ে বেশি। এর প্রধান কারণ, আমাদের জ্বালানি চাহিদার অন্তত ৭০ শতাংশ বিদেশ থেকে আমাদনি করতে হয়। ফলে, আমাদের সংকটটা তুলনামূলকভাবে অধিক গভীর ও বিস্তৃত। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ হ্রাস এবং উচ্চমূল্যের প্রেক্ষিতে আমাদের দেশেও বাধ্য হয়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা কারো অজানা নেই। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া পড়তে শুরু করেছে। ইনকিলাবে প্রকাশিত এক খবরে জানানো হয়েছে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থ বিভাগের কাছে অর্থ চেয়েছে। অর্থ বিভাগ বা সরকার বিদ্যুৎ বিভাগের চাহিদা মতো অর্থের যোগান দিতে পারবে কিনা, সেটা এ মুহূর্তে একটা বড় প্রশ্ন। সরকার এমনিতেই অর্থাভাবে আছে। রাজস্ব আদায় অবিশ্বাস্য কম। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও দৈনন্দিন কাজকর্ম চালানোর মতো অর্থ জমা আছে কিনা সন্দেহ। ইরান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক জ্বালানি দুর্ঘট সরকারের খরচ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। উন্নয়ন কর্মকা- চালানোর অর্থেও টান রয়েছে। স্মরণ করা দরকার, সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকার চুরিদারি ও লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে নিঃশেষ করে দিয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতি উদ্ধারে সফল হতে পারেনি। অর্থনীতির কোনো কোনো সূচকে উল্টো অবনমন ঘটেছে। অর্থনীতির এই বেহালের প্রেক্ষাপটে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকার বিরাজমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বমুখী চেষ্টা করে যাচ্ছে। জ্বালানি পরিস্থিতির উন্নয়ন ও উত্তরণের উপায় খুঁজে বের করার জন্য সরকার ও বিরোধীদলের ১০ সদস্যকে নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সরকারের পক্ষে এ মুহূর্তে কোনো খাতের জন্য বাড়তি কোনো অর্থ দেয়া অত্যন্ত কঠিন। অথচ প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়া সমস্যাসংকুল খাতের উন্নয়ন নয়। বিদ্যুৎ এমন একটি জরুরি খাত, যা অধিক দিন ঝুলিয়ে রাখা উচিৎ হবে না। এমত ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই বিকল্পের সন্ধান করতে হবে। বিকল্পও আছে। সরকারি-বেসরকারি গ্রাহকের কাছে বিদ্যুৎ বিভাগের বিপুল অংকের অর্থ পাওনা আছে। সরকার যদি এই পাওনা আদায়ে বিশেষ উদ্যোগ নেয়, তবে প্রয়োজনীয় অর্থের অনেক বেশি আদায় হতে পারে। ইনকিলাবের খবরে বিদ্যুৎ বিভাগের যে হালনাগাদ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, তা উদ্বেগজনক। বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক ঘাটতি প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর পাওনা ৩৬ হাজার কোটি টাকা। আর বিভিন্ন সরকারি কোম্পানির পুঞ্জিভূত লোকসানের পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা। খবরে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার তার মধ্যে ২৯ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। এ ছাড়া এ খাতের আরো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। এরপরও ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলেছে । একইভাবে বিদ্যুৎ বিভাগের পাওনার পরিমাণও বেড়ে চলেছে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থার কাছে এই বকেয়ার পরিমাণ অন্তত ৪৫ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি বিভিন্ন কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান ও গ্রাহকের কাছেও মোটা অংকের বকেয়া পড়েছে। এসব বকেয়া যথাসময়ে আদায় হলে এখাতে অর্থাভাব দেখা দেয়ার কথা নয়। গ্যাস, ফার্নেস অয়েল ও কয়লা আমদানি করতে বিদ্যুৎ বিভাগ অর্থবিভাগের কাছে যে অর্থের আবদার করেছে, সে আবদারও তার করতে হতো না। বিদ্যুৎ খাতের যাবতীয় উন্নয়ন ও চাহিদা বিদ্যুৎ খাতের অর্জিত অর্থ দিয়েই করা সম্ভব হতো। খুব বেশি দরকার হলে সরকার তো আছেই। সরকার সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতো। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়ে থাকে, তার পরিমাণও কম নয়। উদ্ভূত সংকট মোচন ও পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকারকে কঠোর সিদ্ধান্তে আসতে হবে। বকেয়া বিল আদায়ে শূন্য সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করতে হবে।
সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে যে পাওনা আছে, সর্বাগ্রে তা আদায়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। বেসরকারি খাতে যে বিল বকেয়া রয়েছে, তাও শতভাগ আদায়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের যেসব পদক্ষেপ ইতোমধ্যে সরকার নিয়েছে, তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কক্ষে বিদ্যুৎ ও এসির বাড়াবাড়ি বন্ধ করতে হবে। তারা আরাম-আয়েশ করবেন অথচ বিল পরিশোধ করবেন না বা করতে বিলম্ব করবেন, এটা হতে পারে না। সরকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের অপচয় বন্ধ করতে হবে। সিস্টেম লসের নামে বিদ্যুৎ চুরি রহিত করতে হবে। বিদ্যুতের সকল অবৈধ সংযোগ নির্বিচারে কেটে দিতে হবে। দেশের মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, বৌদ্ধবিহার ইত্যাদিতে যে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়, তার বিল সরকার পরিশোধ করে। গত মার্চ মাসে এ খাতের বিল পরিশোধে ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ছাড়ের অনুমোদন দিয়েছে অর্থমন্ত্রণালয়। বিশ্বের কোথাও এ ধরনের দৃষ্টান্ত নেই। দেশে কিছু মডেল মসজিদ রয়েছে। মডেল মসজিদে ১০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুতের দাম দিতে হয় না। এর অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিল কমিটি পরিশোধ করে। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, উপাসনালয়ের জন্য এ ধরনের ব্যবস্থা সমীচীন নয়। এতে বরং বিদ্যুতের অপচয় বা যথেচ্ছ ব্যবহার উৎসাহিত হয়। পরিশেষে আমরা বলবো, বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে, যার মাসুল দিতে হচ্ছে সরকার ও গ্রাহকদের। কাজেই, যেকোনো মূল্যে এখাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।