ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে ঘুমের এই পদ্ধতি যাকে বলা হচ্ছে 'মিলিটারি স্লিপ মেথড'
Author,
কেইট বোয়ি
Role,
গ্লোবাল হেলথ, বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস
৩ ঘন্টা আগে
দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে কে না চান! কিন্তু বিশ্বে প্রচুর মানুষ নিদ্রাহীনতা কিংবা ঘুমাতে সমস্যায় ভোগে ভোগেন।
এ নিয়ে নানা রকম হিসাব থাকলেও একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের পাঁচ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ অনিদ্রায় ভোগেন।
এপাশ-ওপাশ করে রাত কাটানো অনেকেই ঘুম আনার কৌশল খোঁজেন। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া 'মিলিটারি স্লিপ মেথড'ও, যে কৌশলে মাত্র দুই মিনিটে যে কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারবেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
এই ট্রেন্ড টিকটকে ইতোমধ্যে ভাইরাল হয়ে গেছে। টিকটকের সেই ভিডিওগুলো দেখেছে লাখ লাখ মানুষ। সেই ভিডিওগুলোয় যেসব কৌশলের কথা বলা হয়েছে সেগুলো অনুসরণ করলে তাৎক্ষণিক ঘুম আসবে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে তারা বলেন, 'অবাস্তব' প্রত্যাশার কারণেই ভাইরাল কৌশলটি আসলে ঘুম আনার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
তবে তারা সেনাদের ঘুমের কিছু কৌশলের কথা বলেন যা তারা ঘুমের মান বাড়াতে প্রয়োগ করে থাকেন এবং অনিদ্রায় ভোগা মানুষেরা চাইলে সেসব কৌশল কাজে লাগাতে পারেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
বিশ্বের পাঁচ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ অনিদ্রায় ভোগেন বলে বিভিন্ন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে
ঘুমের এ কৌশলকে একটি ধারণা আকারে হাজির করেন আমেরিকান ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড কোচ লয়েড 'বাড' উইন্টার। তিনি ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তার বই 'রিল্যাক্স অ্যান্ড উইন'-এ ঘুমের কৌশলটির সাথে সাধারণ পাঠকদের পরিচিত করান।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউএস নেভির প্রিফ্লাইট স্কুলের বিমানচালকরা যাতে চাপের মধ্যেও ভালো ঘুমাতে পারেন এবং নিজ নিজ সেরাটা দিতে পারেন সে জন্য এই কৌশল বের করেছিলেন উইন্টার। বইয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য বলা হয়েছে:
১ .কপাল, মাথার ত্বক, চোয়াল ও মুখ পর্যায়ক্রমে শিথিল করুন, ধীরে ধীরে গভীর শ্বাস নিন।
২. কাঁধকে নিচে নামান, বড়ো করে শ্বাস নিন ও ছাড়ুন। বুকটা ধীরে ধীরে শিথিল করুন।
৩. যেখানে শুয়েছেন (অর্থাৎ চেয়ার বা বিছানায় ) সেখানে পুরো হাতটি ছেড়ে দিন বা শিথিল করুন। বাইসেপ বা বাহু, কনুইয়ের নিচের অংশ ও হাত- ক্রমান্বয়ে পুরোটাই। এরপর অন্য হাতটাও একইভাবে শিথিল করুন।
৪. পা শিথিল করুন- উরুর অংশ থেকে পর্যায়ক্রমে কাফ বা পায়ের পেছনের নিম্নাংশ, গোড়ালি ও সব শেষে পায়ের পাতা। এরপর অন্য পা একইভাবে শিথিল করুন।
৫. এখন মনে থাকা চিন্তা বের করে দিয়ে আরামদায়ক কিছু কল্পনা করুন। যেমন বসন্তের কোনো দিন বা শান্ত হ্রদের কথা ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
৬. প্রয়োজনে, "চিন্তা করো না" বারবার বলুন এবং কমপক্ষে ১০ সেকেন্ডের জন্য অন্যান্য চিন্তাভাবনা বাদ দিন।
উইন্টার দাবি করেছিলেন, ছয় সপ্তাহের অনুশীলনে বিমানচালকরা যে কোনো পরিবেশে, দিনের যেকোনো সময় দুই মিনিটের মধ্যে ঘুমাতে শিখে যাবেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
বিছানায় শোয়ার পর গড়পড়তা মানুষের ঘুম আসতে প্রায় পাঁচ থেকে ২০ মিনিট লাগে
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এত দ্রুত ফলাফল পাওয়ার প্রত্যাশা ঘুমানোর প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
মিলিটারি নিউরোসায়েন্টিস্ট ও ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালিসন ব্র্যাগার বলেন, "বলা যায় যে এই পদ্ধতিতে আপনি ঘুমাতে পারবেন, তবে দুই মিনিটের মধ্যে আপনি ঘুমোতে পারবেন এমন ভাবা বিপজ্জনক"।
গড়পড়তা মানুষের ঘুম আসতে প্রায় পাঁচ থেকে ২০ মিনিটের মতো সময় লাগে। তাই মাত্র দুই মিনিটে ঘুম আনার চেষ্টা যে কারোরই বিরক্তির উদ্রেক করতে পারে। এমনকি ঘুমঘুম ভাব কমিয়ে দিতেও পারে।
"সত্যি বলতে যেটি (দুই মিনিটে ঘুম আনা) অর্জন করা প্রায় অসম্ভব, সেটির চেষ্টা করলে শুধু হতাশই হবেন," বলেন তিনি।
আর কেউ যদি দুই মিনিটে ঘুমিয়ে যেতে পারেন, এটি হতে পারে দীর্ঘদিন ধরে কম ঘুমিয়ে থাকা কিংবা শনাক্ত হয়নি এমন কোনো সমস্যার কারণে।
ব্র্যাগার আরো বলেন, কিছু সেনাসদস্য সত্যিই এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন বলে তিনি জানেন। কিন্তু সেনাদের ক্লান্তিকর কাজের ধরন বিবেচনায় নিলে কয়েক মিনিটের মধ্যে তাদের ঘুমিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই।
সাইকিয়াট্রি ও স্লিপ মেডিসিন কনসালটেন্ট ডা. হিউ সেলসিক বলেন, অনিদ্রায় ভোগা সাধারণ মানুষদের জন্য মিলিটারি স্লিপ মেথড বেশিরভাগ সময় কার্যকর হয় না।
"সত্যি বলতে, যারা আমার কাছে যারা এসেছেন, তাদের এটি (মিলিটারি স্লিপ মেথড) কাজ করেনি। নয়তো তারা আমার কাছে এসে বসে থাকতেন না," বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে তিনি বলেন।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটি না বললেই না, তা হলো- রোগীদের চাওয়া থাকে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে পারা, কিন্তু এটি সবসময় সাফল্যের মানদণ্ড নয়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন হসপিটালের ঘুমবিষয়ক ক্লিনিকের প্রধান চিকিৎসক সেলসিক বলেন, "আপনি যদি দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমের সমস্যায় ভোগেন, তবে ভালো ঘুমকে আদর্শ এবং সঠিক বিষয় বলে মনে করাটা স্বাভাবিক"।
"যদি দিনের বেশির ভাগ সময় নিজেকে চনমনে, উজ্জীবিত ও মানসিকভাবে চাঙ্গা মনে হয় এবং বেশির ভাগ দিন এমনটা ঘটে, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় আপনার ঘুম ঠিকঠাক কাজ করছে"।
প্রচলিত ধারণা ছিল, আট ঘণ্টা ঘুম আদর্শ। কিন্তু বিষয়টি একজনের ঘুমের চাহিদার চেয়ে আট ঘণ্টাই ঘুমানো প্রয়োজন বলে মনে করিয়ে দেয় এবং অহেতুক একটা চাপ সৃষ্টি করে।
"আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণা একটি মিথ এবং এটি ধ্বংসাত্মক মিথ," তিনি বলেন।
আসলে, গবেষণা দেখায় যে ঘুমের আদর্শ পরিমাণ (অর্থাৎ দিনে কত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত) ব্যক্তি অনুযায়ী আলাদা, যা আংশিকভাবে জেনেটিকের ওপর নির্ভর করে। আর ঘুমের আদর্শ পরিমাণের কোনো জাদুকরী সংখ্যা নেই।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
দুই মিনিটের মধ্যে, বা দ্রুত ঘুম আনার চেষ্টা বরং আপনার ঘুমকে আরো বিলম্বিত করতে পারে
জুতোর সাইজ দিয়ে বিষয়টির তুলনা করেন সেলসিক। গড়পড়তা মানুষ হয়তো সাইজ ছয়, কেউ একেবোরে আট বা চার সাইজের জুতো পরে। কাজেই কারো সাত থেকে আট ঘণ্টার চেয়ে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে, কারো কম।
তিনি বলেন, "আপনি যা করার চেষ্টা করবেন, তা হলো-আপনার জন্য যতটুকু ঘুম সঠিক, ঠিক ততটুকু ঘুমানো"।
এরপরও যদি আপনি দ্রুত ঘুমাতে চান, তিনি তিনটি পরামর্শ দিয়েছেন-
১. প্রতিদিন একই সময়ে ঘুম থেকে উঠলে শরীরে একই সময় ঘুমঘুম লাগতে শুরু করে। ফলে প্রতিদিন একই সময়ে ক্লান্ত লাগার এবং ঘুমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
২. দিনের বেলা ন্যাপ বা ছোট ঘুম নেওয়া এড়িয়ে চলুন। এতে ঘুমঘুম ভাব কমে যায়, যার ফলে রাতে ঘুমানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
৩. শেষে তিনি বলেন, ঘুমাতে যাওয়া উচিত শুধু তখনই, যখন আপনি ক্লান্ত। যদি শরীর ঘুমের জন্য প্রস্তুত না থাকে তবু ঘুমাতে যান, তাহলে দীর্ঘ সময় শুধু বিছানায় পড়ে থাকতে হবে।
"তাহলে বসুন, সময়টি উপভোগ করুন, নিজের জন্য একটু সময় নিন, আর যখন দেখবেন আপনার মাথা সামনের দিকে নুয়ে যাচ্ছে, চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, যা পড়ছেন তাতে মন বসছে না, সেই সময়ই ঘুমানোর জন্য বিছানায় যাওয়ার সময়," তিনি বলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
ছবির ক্যাপশান,
যেসব স্থানে মানসিক চাপ বেশি হয়, সেসব স্থানে মোতায়েন থাকা সৈনিকদেরকে কৌশলগত ন্যাপ নিতে বলা হয়
ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর স্লিপ সায়েন্স অ্যান্ড মেডিসিনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ডা. অ্যালেক্স রোক্লিফ বলেন, মিলিটারি স্লিপ মেথড একটু ভুল নামকরণ।
তিনি বলেন, "এই কৌশলগুলোর পেছনে যে শারীরবৃত্তীয় (দেহসংক্রান্ত) ও মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে, তার মধ্যে স্বভাবগতভাবে কোনো সামরিক বিষয় নেই"।
আসলে এই পদ্ধতিটি পুরোপুরি ভুল নয়—তিনি আরও বলেন, প্রগ্রেসিভ মাসল রিল্যাক্সেশন (ধাপে ধাপে পেশি শিথিল করার কৌশল) এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের কৌশলগুলো এখনো সেনা সদস্যদের শেখানো হয়।
প্রশিক্ষণার্থী সেনা ও সেনা সদস্যদের ঘুমের কক্ষ ভাগাভাগি করতে হয়। ১২ জন এক কক্ষে ঘুমান। কাজেই ব্যাঘাত ছাড়া ঘুম হওয়াটা কঠিনই।
সহজ কিছু সমন্বয় যেমন চোখের মাস্ক, কানের প্লাগ এবং ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করা ঘুমের মান উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে।
অশান্ত পরিবেশে থাকা সেনাদের ঘুমের কৌশল কোনো কোনো সাধারণ মানুষের কাজে লাগতে পারে।
উচ্চ-চাপে থাকতে হয় এমন স্থানে দায়িত্বে থাকা সেনাদের 'ট্যাকটিক্যাল ন্যাপ' নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কারণটা জানা, তা হলো- তারা হয়তো রাতে ভালো করে ঘুমাতে পারবে না।
যারা রাতে চটজলদি ঘুমিয়ে পড়তে চান, ন্যাপ তাদের জন্য পরামর্শযোগ্য নাও হতে পারে। কিন্তু নার্সিং মাদারদের (যেসব মা বাচ্চাকে বুকের দুধ খাওয়ান) মতো যাদের রাতের ঘুম বারবার ভাঙে, তাদের জন্য কৌশলগত ন্যাপ খুব উপকারী।
নিউরোসায়েন্টিস্ট ব্র্যাগার বলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাও সেনাদের কাছ থেকে শিখতে পারে সাধারণ মানুষেরা, তা হলো ঘুমের রুটিন তৈরি করা। এটি মস্তিষ্ককে সংকেত দেয় যে এখন শিথিল হওয়ার সময়, ফলে ঘুম আসে সহজে।
"সবকিছুই শেষ পর্যন্ত শৃঙ্খলার ওপর নির্ভর করে। সেনা সদস্যরা দৈনন্দিন রুটিনে শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে এবং মনোযোগ নষ্টকারী বিষয়গুলো কমাতে খুবই দক্ষ," বলেন তিনি।
প্রতিদিন একই সময়ে বিছানায় যাওয়া, ফোন বন্ধ করা, বই পড়া এবং আলো নিভিয়ে ফেলা- এগুলো দিয়ে ভালো ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলা শুরু করা যেতে পারে।
ব্রেগার বলেন, "শরীর খুব দ্রুত এই অভ্যাসের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। আর আপনি যদি প্রতিদিন এটা করেন, তাহলে ঘুমাতে কোনো সমস্যাই হবে না।"