বরিশালের যেসব আসনে প্রায় কোনো নির্বাচনেই হারেনি আওয়ামী লীগ, ঠিক সেসব এলাকাতেই দলের বিদ্রোহী আর শক্ত প্রতিপক্ষ নিয়ে অস্বস্তিতে আছে বিএনপি। ‘নৌকা’ বিহীন নির্বাচনে এসব এলাকায় সহজ জয় পাওয়ার কথা থাকলেও নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আর জামায়াত-চরমোনাইর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বীর কারণে অমসৃন হয়ে গেছে ধানের শীষের জয়ের পথ।

পরিস্থিতি এমন যে এসব এলাকার অন্তত ৩ থেকে ৪টি আসনে জয় পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে বিএনপির জন্য। যদিও এমন পরিস্থিতি মানতে নারাজ দলটির প্রার্থীরা। বিএনপির পক্ষে এখন সারা দেশে গণজোয়ার চলছে উল্লেখ করে এসব আসনেও ধানের শীষ সহজ জয় পাবে বলে জানিয়েছেন তারা।

পটুয়াখালী-২ (বাউফল) : ৯০ পরবর্তী সময়ে এই আসনে মাত্র একবার জিতেছে বিএনপি। এখানে বারবার এমপি হওয়া আওয়ামী লীগের আ.স.ম ফিরোজ বর্তমানে কারাগারে। এবার ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে লড়ছেন সাবেক এমপি শহিদুল আলম তালুকদার।

বিএনপি এখানে সহজে জিতে যাবে বলে মনে করা হলেও সেই ধারণার বিপরীতে শক্ত দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের সেক্রেটারি এই নেতা একসময় ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি। ভোটের মাঠে কেবল প্রচার-প্রচারণাই নয়, সংঘাত সংঘর্ষেও এখানে মুখোমুখি বিএনপি-জামায়াত। রোববারও সেখানে দুপক্ষের সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি।

যুগান্তরকে শহিদুল আলম বলেন, আগে কি ছিল সেই প্রশ্নে যাব না। বিএনপি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী। ধানের শীষের পক্ষে সারা দেশে গণজোয়ার উঠেছে। ইনশাআল্লাহ এখানে বিপুল ভোটে জিতব আমরা। বিষয়টি সম্পর্কে কথা বলার জন্য শফিকুল ইসলাম মাসুদকে ফোন দেওয়া হলেও ধরেননি তিনি।

পটুয়াখালী-৩ (দশমিনা-গলাচিপা) : কখনোই কোনো নির্বাচনে এখানে জেতেনি বিএনপি। বরাবরই এটি আওয়ামী লীগের নিজস্ব আসন হিসাবে চিহ্নিত। এবারের নির্বাচনে আসনটি আন্দোলনের সমমনা দল গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। সেই হিসাবে নুরের জয় নিয়ে আসার কথা থাকলেও তার সেই স্বপ্ন আটকে গেছে বিএনপির বিদ্রোহী হাসান মামুনের উপস্থিতিতে।

কেবল উপস্থিতিই নয়, নির্বাচনি এলাকার দুই উপজেলায় এতটাই শক্ত অবস্থান মামুনের যে নূর শেষ পর্যন্ত জিততে পারবেন কিনা তাই নিয়ে দেখা দিয়েছে সন্দেহ। দল থেকে বহিষ্কার, কমিটি বিলুপ্ত এমনকি ওয়ার্ড-ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েও হাসান মামুন তথা দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ঠেকাতে পারেনি বিএনপি। ব্যক্তি ইমেজের কারণে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংকে পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেছেন মামুন। ফলে নির্বাচনি ফলাফল নুরের অনুকূলে যাবে কিনা সেই প্রশ্ন এখন সবার।

পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) : ৯০ পরবর্তী সবকটি নির্বাচনে এখানে জিতেছে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। সাগর পারের এই এলাকায় সর্বশেষ ২০০৮-এর নির্বাচনে ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারে বিএনপি। আওয়ামী অধ্যুষিত এই আসনে এবার ধানের শীষের হয়ে লড়ছেন দলের কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক এবিএম মোশাররফ। তার বিরুদ্ধে আছেন চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলনের মোস্তাফিজুর রহমান।

হাতপাখার প্রার্থী মোস্তাফিজুর ছিলেন কলাপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি। আওয়ামী শাসনামলে কলাপাড়া উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ছিলেন বিএনপির ১২ ফেব্রুয়ারির এমপি। নির্বাচনি এলাকায় বেশ জনপ্রিয় মোস্তাফিজের সঙ্গে নেপথ্যে কাজ করছে বিএনপির একটি অংশ। সেই সঙ্গে হাতপাখার সমর্থন তো আছেই। সবমিলিয়ে বিএনপির সামনে বেশ শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে দাঁড়িয়েছেন তিনি। যুগান্তরকে এবিএম মোশাররফ বলেন, আওয়ামী লীগের লোকজন ধানের শীষে ভোট দেবে।

বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-তালতলী) : নিরপেক্ষ ভোটে এখানে কখনোই তৃতীয় স্থানের ওপরে উঠতে পারেনি বিএনপি। আওয়ামী লীগ যেমন পেয়েছে জয় তেমনি দ্বিতীয় অবস্থানের দখল ছিল ইসলামী আন্দোলনের হাতে। এবারও এখানে বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মোল্লার বিরুদ্ধে আছেন হাতপাখার মো. অলিউল্লাহ। ভোটের মাঠে এই দুজনের লড়াই এখন নির্বাচনি এলাকার মানুষের মুখে মুখে। চূড়ান্ত ভোটযুদ্ধটাও এই দুজনের মধ্যেই হবে।

বর্তমানে এখানে চলছে আওয়ামী লীগের ভোট নিয়ে আলোচনা। পরিচয় না প্রকাশের শর্তে নির্বাচনি এলাকার একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, এখানকার রাজনীতির একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের আত্মীয়তা। ভোটযুদ্ধে এটি বিএনপির জন্য উপকারী না হলেও আওয়ামী লীগ সবসময় পেয়েছে এর সুবিধা। এবার যেহেতু আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই তাই পুরোনো সেই ঋণ তারা শোধ করে কিনা-সেটাই দেখার বিষয়।

পিরোজপুর-২ (ভাণ্ডারিয়া-কাউখালী-নেসারাবাদ) : সরাসরি আওয়ামী লীগের না হলেও আসনটি আগাগোড়া দখলে ছিল আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অংশীদার দল জেপি (মঞ্জু) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর। ৯০ পরবর্তী সময়ে এই আসনে ৫ বার এমপি হয়েছেন তিনি। সবশেষ ২০২৪-এর নির্বাচনে হারলেও সেই পরাজয়ও ছিল আওয়ামী লীগেরই বিদ্রোহী মহিউদ্দিন মহারাজের কাছে। এবার এই আসনে বিএনপি প্রার্থী সুমন মঞ্জুরের সামনে রয়েছেন দুই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী।

এরা হলেন-বিএনপির বিদ্রোহী মাহমুদ হোসাইন ভিপি মাহমুদ এবং জামায়াতের শামিম সাঈদী। কিংবদন্তী সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার ভাতিজা ভিপি মাহমুদ সম্পর্কে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর চাচাতো ভাই। এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হননি মঞ্জু। তাই ভিপি মাহমুদকে দেখা হচ্ছে তার প্রার্থী হিসাবে। অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী শামিম সাঈদী মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সন্তান। ফলে এখানে ভোটের মাঠের হিসাবটা বেশ জটিল।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews