দেশীয় পশুর সমারোহে উৎসবমুখর হয়ে উঠছে রাজধানীর কোরবানির পশুর হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নিজেদের খামারে লালন করা পশু নিয়ে বিভিন্ন হাটে এসেছেন খামারি ও কৃষকেরা। তবে পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং শ্রমিক ব্যয়ের কারণে এবার উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তাই গত বছরের তুলনায় এবার কিছুটা বেশি দামে পশু বিক্রির প্রত্যাশা করছেন বিক্রেতারা।
রাজধানীর কোরবানি নিয়ে সরকারি তথ্য বলছে, এবারো ঢাকা নগরীতে সাড়ে ৬ লাখের বেশি পশু কোরবানি হতে পারে। সে হিসাবে এবার ঢাকার হাটগুলোতে পশুর সামগ্রিক যে জোগান থাকেবে তাতে পশুর সঙ্কট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। বিগত সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকে অনুমান করে এই হিসাব ধরা হয়েছে।
গতকাল রোববার ঢাকার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা যায়, বড় ও মাঝারি হাটগুলোতে দেশীয় জাতের গরু, ছাগল ও ভেড়ার সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সময়ের সাথে বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড়।
গতকাল কমলাপুর হাট ঘুরে দেখা যায় ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা বেশি। দামও সাধ্যের মধ্যে।
আর ঝামেলা ছাড়া খামার থেকে ওজন মেপেও গরু বিক্রি হচ্ছে। অন্য দিকে খাসি, ছাগলের ক্রেতা সবচাইতে বেশি।
এ দিকে হাট ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। জাল টাকা শনাক্তকরণ বুথ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহলও জোরদার করা হয়েছে।
খামারিরা বলছেন, সারা বছর লালনপালন করা পশু বিক্রির এ সময়টিই তাদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশার সময়। তবে পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন খরচ এবং শ্রমিক ব্যয়ের কারণে এবার উৎপাদন খরচও বেড়েছে। তাই অনেক বিক্রেতাই গত বছরের তুলনায় কিছুটা বেশি দামে পশু বিক্রির চেষ্টা করছেন।
রাজধানীর অন্যান্য হাট ছাড়াও গতকাল দুপুর থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি পশুর হাটে গিয়ে দেখা গেছে গত বছরের তুলনায় এবারের হাট বিশাল বড় করেছে। ইজারাদার সেক্টরের ভেতর নতুন করে মাটি ভড়াট করে গরু বাঁধার জন্য বাঁশ দিয়ে সারিবদ্ধভাবে নির্মাণ করেছে। কানায় কানায় পূর্ণ হাটের বাইরেও বিপুল গরু রাখা হয়েছে। তবে ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম।
সিরাজগঞ্জ থেকে আসা মাসুম মিয়া জানান, দুই চাচাতো ভাইকে নিয়ে গতকাল সকালে ২০টি মাঝারি সাইজের গরু এই হাটে আনা হয়। এবার পরিবহন ভাড়া গত বছরের তুলনায় গরুপ্রতি এক হাজার টাকা বেশি পড়েছে।
ময়মনসিংহ থেকে আক্কাস সরদার নামে এক বৃদ্ধ তার তিন ভাতিজাকে নিয়ে গতকাল বেলা ১০টায় ১৫টি গরু নিয়ে দিয়াবাড়ি হাটে আসেন; কিন্তু হাটের ভেতর জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল সংলগ্ন ৪৭-৪৮ নম্বর পিলারের মাঝামাঝিতে বসেন। ছোট সাইজের গরুগুলোর মূল্য চাওয়া হলে একেকটা এক লাখ; কোনোটা এক লাখ ১০ হাজার টাকা মূল্য হাঁকান। তবে ক্রেতা রমিজ উদ্দিন তিনটা গরুর দাম ১৮০ হাজার টাকায়। হাটের ভেতরে বেশিরভাগই বিশাল আকারের ষাড়গরু দেখা গেছে। হাটের ভেতরে ক্রেতার সংখ্যা খুবই কম থাকায় অনেকটা হতাশ ফার্মের কর্মীরা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী এবার সারা দেশে কোরবানিযোগ্য মোট পশুর সংখ্যা এক কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। আর সম্ভাব্য চাহিদা এক কোটি এক লাখ ছয় হাজার ৩৩৪টি। এতে চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু অতিরিক্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় শতভাগই দেশীয় পশু। কারণ ঈদ ঘিরে সরকার ভারত থেকে গরু আমদানি নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশে কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু প্রস্তুত থাকায় দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষার্থে কোনো প্রকার বৈধ আমদানির সুযোগ নেই। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সীমান্তবর্তী এলাকার কিছু হাটের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হচ্ছে। ফলে এবার বাজারে আসা প্রায় শতভাগ পশু দেশের খামারে লালন করা বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী রাজধানীতে এবার মোট ২৭টি অস্থায়ী কোরবানির পশুর হাট বসেছে। স্থায়ী হাট হিসেবে গাবতলী পশুর হাট ও সারুলিয়া- এই দুই পশুর হাট চালু থাকবে। আর বাকিগুলো অস্থায়ী।
এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মোট হাটের সংখ্যা ১১টি। এর মধ্যে ১০টি অস্থায়ী এবং ১টি স্থায়ী। অপর দিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে (ডিএসসিসি) ১৭টি হাট বসেছে। এর মধ্যে ১৬টি অস্থায়ী এবং ১টি স্থায়ী।