শিল্প অধ্যুষিত গাজীপুর জেলায় ছোটবড় প্রায় ৫ হাজার শিল্প কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় কাজ করে অর্ধকোটি শ্রমিক। দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে এদের মধ্যে অনেকেই গাজীপুরের ভোটার হয়েছেন৷ এ জন্য প্রতিটি নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নির্ধারক হয়ে ওঠে এসব কারখানার শ্রমিকরা৷ এছাড়াও দোদুল্যমান অবস্থায় থাকা ফ্লোটিং ভোটার৷

বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পাঞ্চল গাজীপুর। গাজীপুর-১ (কালিয়াকৈর –সিটির একাংশ), গাজীপুর-২ (গাজীপুর মহানগর ও টঙ্গী) ও গাজীপুর-৩ (শ্রীপুর ও সদর একাংশ) এই তিনটি সংসদীয় আসনজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য পোশাক, টেক্সটাইল, ওষুধ, প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসসহ নানা ধরনের শিল্পকারখানা। এসব কারখানায় কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক লাখ ছাড়িয়েছে বহু আগেই। কর্মসংস্থানের সুবাদে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা এসব শ্রমিকের একটি বড় অংশ এখন গাজীপুরের স্থায়ী বাসিন্দা এবং ভোটার। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এলেই গাজীপুরে শ্রমিক ভোটাররা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হন।  

গাজীপুরে ৫টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ২৭ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৯ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১৩ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৮ জন, নারী ভোটার ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ৮৬৭ জন ও হিজড়া ভোটার ৩৪ জন। মোট ভোটকেন্দ্র ৯৩৫টি, মোট ভোটকক্ষ ৫ হাজার ১৭৩টি এবং অস্থায়ী ভোটকক্ষ ৩৭৩টি। নির্বাচনে মোট ৪২ জন প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন।  

কারখানার শ্রমিক ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর সদর, টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈর, শ্রীপুরসহ বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে শিল্পকারখানার ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি। বিশেষ করে পোশাকশিল্পের কারণে নারী শ্রমিকের সংখ্যাও এখানে উল্লেখযোগ্য। দিনের বড় একটি সময় কারখানায় কাটালেও এসব শ্রমিক স্থানীয় বাজার, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে তারা শুধু কর্মজীবী জনগোষ্ঠীই নন, বরং স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। 

এই বাস্তবতায় শ্রমিকদের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক সচেতনতা ক্রমেই বাড়ছে। আগের মতো তারা আর কেবল ভাসমান ভোটার নন, বরং অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করে গাজীপুরের ভোটার হয়েছেন। এর ফলে তিনটি আসনেই ভোটার সংখ্যায় শ্রমিকদের অংশ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

গাজীপুর মহানগরীর কোনাবাড়ী এলাকায় ১৪ বছর ধরে স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টসে কাজ করেন মোঃ সালেহিন। তিনি বলেন, আমরা কারখানায় কাজ করি, এখানেই বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতজন হয়ে উঠেছে। এ জন্য আমি পরিবারসহ এখানেই ভোটার হয়েছি৷ আমার মতো অনেকেই এখানকার ভোটার। আমরা পছন্দ করে রেখেছি কাকে ভোট দিব৷  

আরও পড়ুন

আরও পড়ুন

১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত

১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠক অনুষ্ঠিত

কালিয়াকৈরে উপজেলার তেলিরচালা এলাকায় পরিবার নিয়ে বাস করেন ইমন খান৷ তিনি ও তার স্ত্রী কাজ করেন স্থানীয় দুটি পোশাক কারখানায়। তাদের দেশের বাড়ি গাইবান্ধা। এখানে ভোটার হলেও ৪ দিন কারখানা ছুটি থাকায় গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। 

এসব ভোটারদের আকৃষ্ট ও আশ্বস্ত করতে গাজীপুরের তিনটি আসনেই প্রার্থীদের প্রচারণা জোরালো হয়ে উঠেছে। প্রচলিত গণসংযোগের পাশাপাশি এবার একটি ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে, প্রার্থীরা সরাসরি শিল্পকারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলছেন, তাদের সমস্যা ও দাবি শুনছেন। এমনকি কারখানার আশপাশের এলাকায় বিশেষভাবে প্রচারণা চালাচ্ছেন। কারখানার মাইকে মাইকে তাদের থেকে ভোট প্রার্থনা করছেন।

প্রার্থীরা তাদেরকে আশ্বস্ত করতে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন পরিশোধ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, বাসস্থান সংকট, যাতায়াত সমস্যা এবং চিকিৎসা সুবিধার মতো বিষয়গুলোকে তাদের নির্বাচনি বক্তব্যে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, শ্রমিক ভোটারদের গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।  

এলাকার সাধারন মানুষের ভাষ্য মতে,গাজীপুরের তিনটি আসনেই বিজয়-পরাজয়ের ব্যবধান অতীতে খুব বেশি ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে সংগঠিত ও সংখ্যায় বড় একটি ভোটব্যাংক হিসেবে শ্রমিকরা ফলাফল বদলে দিতে সক্ষম। বিশেষ করে যদি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থী বা প্রতীকের পক্ষে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে সেটি অন্য সব সমীকরণকে ছাপিয়ে যেতে পারে।  

মহানগরীর ৫৭ টি ওয়ার্ডের প্রায় ৪০ শতাংশ ভোটার ভাসমান। এছাড়াও কোনাবাড়ি, কাশিমপুর, বাসন, টঙ্গী, মাওনা এলাকাতেও উল্লেখযোগ্য ভোটার ভাসমান। এদের মধ্যে আবার অর্ধেক ভোটার নির্বাচনি ছুটিতে গ্রামে চলে যায়। যার ফলে তাদের হিসাবটা কষা কষ্টকর৷ এছাড়াও এবার উল্লেখযোগ্য ভোটাররা জীবনের প্রথম ভোট দেবেন৷ এসব তরুণ ভোটারেরা অনেকটা সচেতন ও জুলাই চেতনাধারী। তাদের ভোটগুলো দলভিত্তিক ছেড়ে প্রার্থীকে গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের চিন্তাধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রতিশ্রুতি পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব।

গাজীপুর মহানগরীর চৌরাস্তা এলাকার ভোটার তাহের উদ্দিন বলেন, আমি একজন ব্যবসায়ী, এখানকার ভোটার৷ ভোট দিতে যাব কিন্তু কাকে ভোট দিব তা এখনো ঠিক করিনি৷ সবার কথাই শুনছি, নির্বাচনের দিন সিদ্ধান্ত নিব, কাকে ভোট দিব। 

জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক জোট বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, গাজীপুরে লাখ লাখ কারখানা শ্রমিক রয়েছে। এদের মধ্যে দীর্ঘদিন বসবাসের সুবাদে এখানকার ভোটার। তাদের ভোট নির্ধারণ করে দিবে কে জয়ী হবে।

সমাজকর্মী ও শিক্ষক দোলন ইসলাম বলেন, নিদিষ্ট রাজনৈতিক দলের অনুগত নয় এমন ফ্লোটিং ভোটার, যারা পরিস্থিতি ও প্রার্থীর যোগ্যতা বিবেচনা করে ভোট প্রদান করেন৷ তারা যেদিকে ঝুঁকবে সেই প্রার্থী বা দলের জয়ের পথটা সহজ হবে৷ 

সুজনের গাজীপুর শাখার সাধারন সম্পাদক ইফতেখার শিশির বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাজীপুর এলাকায় শ্রমিক ভোটাররাই মূলত জয়ের মূল চাবিকাঠি বা নির্ধারক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর মূলে প্রধান কারণ ৩টি, বিশাল সংখ্যার ভোট ব্যাংক, ফলাফল পরিবর্তনের ক্ষমতা ও তরুণ ও নারী ভোটার।  



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews