মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের মেয়াদ এক মাস অতিক্রম করেছে। কিন্তু যুদ্ধ থামার পরিবর্তে আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ে বিধিনিষেধ বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে তেলের দামও। প্রতি ব্যারেল ১১২ থেকে ১১৫ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে। এ কারণে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংকট আরও বড় হওয়ার পূর্বাভাস আঁচ করতে পেরে ইতোমধ্যে অনেক দেশ তেল সাশ্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারিভাবে কঠোর সিদ্ধান্ত আরোপ করে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সব ক্ষেত্রে তেল সাশ্রয়ের নীতি বাস্তবায়ন করছে।
এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ এখনো সেভাবে তেল সাশ্রয়ের জাতীয় নীতি গ্রহণ করেনি। কিছুটা রেশিনিং করা হচ্ছে বটে। তবে এতে তেলের মজুত বাড়ানো সম্ভব হবে না। আসন্ন ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত ব্যক্তিগত যানবাহন, অফিস-আদালত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজের সর্বত্র তেলের ব্যবহার কমিয়ে আপৎকালীন তেলের মজুত বাড়াতে হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, পাকিস্তান ও ভারতের মতো দেশ জ্বালানি তেল আমদানিনির্ভর। কিন্তু আমরা ছাড়া বাকি দেশগুলো তেল সাশ্রয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য তেলের ব্যবহার সীমিত করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা দুঃখজনক। তিনি বলেন, তেলের মজুত বাড়াতে সরকারকে জ্বালানি সাশ্রয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুবা সবাই বিপদে পড়বে। মনে রাখতে হবে, সামনের দিকে বেশি দাম দিলেও বিশ্ববাজারে তেল পাওয়া যাবে না। তখন পুরো দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে সরকারের উচিত হবে, এখনই তেলের ব্যবহার আরও সীমিত করা।
ম. তামিম বলেন, সমঝোতা না হয়ে যদি যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশকে সত্যিই মহাবিপদে পড়তে হবে। এজন্য এখন সবার আগে সরকারি কর্মকর্তাদের উচিত হবে গাড়ি ব্যবহার বন্ধ বা কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমাতে হবে।
এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু হলে জ্বালানি খাতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও বাড়বে। সেজন্য জ্বালানি তথা বিদ্যুৎ খরচের চাপ কিছুটা কমাতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক দেশ আপৎকালীন পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস চালু করেছে। তবে কোভিডের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা দেখেছি আমাদের দেশে এটি খুব একটা কার্যকর নয় এবং ওই সময়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের মধ্যে শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। সেক্ষেত্রে আপৎকালীন পরিস্থিতিতে বাস্তবসম্মত উপায়ে কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া। এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সময় কিছুটা পরিবর্তন করা এবং অনলাইন-অফলাইন সমন্বিত পদ্ধতিতে পাঠদানের মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি খরচ সাশ্রয় করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতভিন্নতা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে জ্বালানি স্থাপনা টার্গেট করেও পালটাপালটি অনেক হামলা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতিবছর ৬৮ লাখ টনের মতো জ্বালানি তেল লাগে। এর ৮০ শতাংশের বেশি আমদানি করা হয় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে। এছাড়া গ্যাস অর্থাৎ এলএনজি আমদানি করা হয় বছরে ৭০ লাখ টনের মতো। গত বছর গ্যাস আমদানি করে সরকার ব্যয় করেছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বড় সমস্যা হচ্ছে বিশ্ববাজারে তেলের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি।
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম শনিবার যশোরে সাংবাদিকদের বলেন, বেশি দামে তেল কিনে কম দামে বিক্রির কারণে সরকার দৈনিক ১৬৭ কোটি লোকসান দিচ্ছে। এরপরও সরকার আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ঠিকমতো তেল কিনতে পারছে না।
জানা যায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে মার্চে ১৭ জাহাজ তেল কেনার ক্রয়াদেশ দিলেও এ পর্যন্ত এসেছে মাত্র ১১টি। তবে আশা করা হচ্ছে এপ্রিলে বেশি তেল আসবে।
কোন দেশে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে : আন্তর্জাতিক মিডিয়ার খবর অনুযায়ী পাকিস্তানে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সপ্তাহে চার দিন কর্মদিবস নির্ধারণ এবং সরকারি দপ্তরে জ্বালানি বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
শ্রীলংকায় স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং অতীব জরুরি নয়-এমন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাধ্যতামূলক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। কিউআর কোডভিত্তিক ‘ন্যাশনাল ফুয়েল পাশ’ সিস্টেমের মাধ্যমে ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১৫ লিটার পেট্রোল বিক্রির কোটা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ভুটানে মজুতদারি রোধে জেরি ক্যানে তেল বিক্রি নিষিদ্ধ করাসহ জরুরি সেবাকে অগ্রাধিকার দিয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
ভিয়েতনামে যতটুকু সম্ভব প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত না থেকে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং নাগরিকদের গণপরিবহণ ব্যবহারের অনুরোধ জানানো হয়েছে। ফিলিপাইনে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু এবং অপ্রয়োজনীয় সরকারি ভ্রমণ সীমিত করা হয়। এমনকি টেলিভিশনের উপস্থাপকরা নিজ থেকে কোর্ট খুলে খবর প্রচার করেছে।
মিয়ানমারে তীব্র জ্বালানি সংকটে পেট্রোলপাম্পগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ব্যক্তিগত যানবাহনের জন্য নিবন্ধন নম্বরের ভিত্তিতে ‘জোড়-বিজোড়’ রেশনিং পদ্ধতি চালু হয়েছে। কম্বোডিয়ায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পেট্রোলপাম্প কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। লাওসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাসা থেকে কাজ বাধ্যতামূলক করাসহ যাতায়াত কমাতে পালাক্রমে দায়িত্ব পালনের নিয়ম চালু হয়েছে।
নিউজিল্যান্ডে ১৯৭৯ সালের নীতি অনুসরণ করে সপ্তাহে একদিন ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো বন্ধ রাখার ‘গাড়িমুক্ত দিবস’ চালুর কথা ভাবছে সরকার। এছাড়া জ্বালানি মজুত পর্যবেক্ষণে ‘অ্যাম্বার অ্যালার্ট’ জারি করা হয়েছে এবং উচ্চমূল্যের কারণে এয়ার নিউজিল্যান্ডের কয়েকশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
মিসরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৯টার মধ্যে বিপণিবিতান ও রেস্তোরাঁ এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে সরকারি ভবন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিলবোর্ডে বিজ্ঞাপনের আলোও বন্ধ রাখা হচ্ছে।
কেনিয়ায় জ্বালানি রপ্তানি নিষিদ্ধের পাশাপাশি রেশনিং চালু হয়েছে। দেশটির বর্তমান মজুত কেবল এপ্রিল পর্যন্ত চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় ডিজেল সংকট ও আতঙ্কিত হয়ে কেনাকাটা ঠেকাতে শিল্প খাতে নিয়ন্ত্রিত বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হয়েছে।