পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ-উৎসবের মধ্যেও মানবিক দায়িত্ব পালনে থেমে থাকেনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর। ঈদের দিনেই অজ্ঞাতপরিচয়ের এক ভবঘুরে ব্যক্তির বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে সংগঠনটি। এ নিয়ে সংগঠনটির উদ্যোগে মোট ২৫৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফনের নজির তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বাদ আসর ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের পূর্ব মেড্ডা এলাকার তিতাস নদী সংলগ্ন বেওয়ারিশ লাশের কবরস্থানে লাশটি দাফন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা।
জানা গেছে, গত শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের উত্তর জগৎসার গ্রামের খোয়াজুদ্দিনের বাড়ির পাশের একটি পুকুরঘাট থেকে অজ্ঞাতপরিচয়ের এক ভবঘুরে ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৃত ব্যক্তি দীর্ঘদিন ভবঘুরে ও মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। তবে স্থানীয় কেউ তার পরিচয় শনাক্ত করতে পারেননি।
ধারণা করা হচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত কোনো এক সময়ে অসুস্থতাজনিত বা অজ্ঞাত কারণে তার মৃত্যু হয়। লাশ উদ্ধারের সময় তার মুখে দাঁড়ি-গোঁফ ছিল এবং তিনি জিন্স প্যান্ট পরিহিত ছিল।
পরিচয় শনাক্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) লাশের ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করলেও আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পরে ছয়দিন হাসপাতালের হিমাগারে সংরক্ষণ করে রাখা হলেও স্বজনদের কেউ খোঁজ নিতে আসেননি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো: আজহার উদ্দিন বলেন, ‘ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমেও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তারপরও আমরা ছয় দিন লাশটি হিমাগারে রেখেছিলাম, যদি কোনো স্বজন এসে পরিচয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ না আসায় ঈদের দিনেই লাশটি দাফন করা হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বেওয়ারিশের ওয়ারিশ হয়ে গত ছয় বছর ধরে আমরা এ মানবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। পরিচয়হীন মানুষগুলোর সম্মানজনক দাফন নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বড় কোনো উৎসব কোনো কিছুই মানবিক কাজকে থামাতে পারে না।’
পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বলেন, ‘পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। আমি নিজে উপস্থিত থেকে পুরো কার্যক্রম দেখেছি। অত্যন্ত সম্মানের সাথে তারা বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেন। এমন মানবিক কাজ সত্যিই বিরল। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভবিষ্যতেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরকে প্রয়োজনীয় আইনি সহযোগিতা দেয়া হবে।’
উল্লেখ্য, পবিত্র ঈদুল আজহার মতো উৎসবের দিনেও সংগঠনটির মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তারা বেওয়ারিশ লাশ দাফন ও অজ্ঞাতপরিচয় রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত সংগঠনটির উদ্যোগে ২৫৪টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন এবং দুই হাজারের বেশি অজ্ঞাতপরিচয় রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়। এছাড়াও রক্তদান, অক্সিজেন সেবা ও অসহায়-সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।