• আদি ঢাকার ১২০টি পুকুরের মধ্যে টিকে আছে মাত্র ২৪টি
  • মোট জলাশয় ৩২৭টি হলেও সঙ্কটে নগর পরিবেশ
  • অপরিকল্পিত ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে নদী-খাল বিলীন
  • বছরে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে কয়েক হাজার কোটি টাকা
  • ১৫টি খাল পুনরুদ্ধারেই ৮০% জলাবদ্ধতা সমাধানের সম্ভাবনা

১৬০৮ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘জাহাঙ্গীরনগর’। মোগল আমলে মীর জুমলা ও শায়েস্তা খানের শাসনামলে ঢাকা দ্রুত বিকশিত হয়ে বাণিজ্য, প্রশাসন ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে চার শতাব্দীর এই প্রাচীন নগরী আজ অপরিকল্পিত নগরায়নের ফলে বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও জলাবদ্ধ শহরে পরিণত হয়েছে। নগরীর প্রাকৃতিক নদী-খাল ও জলাধার হারিয়ে যাওয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

গবেষণা সংস্থা ‘রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার’-এর তথ্যানুযায়ী, স্বাধীনতার সময় ঢাকা জেলায় অন্তত ১৫টি নদী ছিল। এর মধ্যে আঁটি, কনাই, দোলাই, পান্ডো ও নড়াই নদী বর্তমানে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। একইভাবে ঢাকাকে ঘিরে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও টঙ্গী নদীর সাথে সংযুক্ত ১৭টি গুরুত্বপূর্ণ খালও হারিয়ে গেছে। মোগল আমলে এসব নদী-খাল রাজধানীকে প্রাকৃতিকভাবে সংযুক্ত করেছিল, যা এখন আর দৃশ্যমান নয়।

ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, নড়াই, পান্ডো ও সোনাভানসহ একাধিক নদী ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন অংশ দিয়ে প্রবাহিত হতো। ধানমন্ডি লেকের অংশবিশেষও এক সময় নড়াই নদীর প্রবাহপথ ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

নগরায়ন ও নদী-খাল ধ্বংসের কারণ ও বর্তমান অবস্থা

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ন, অপরিকল্পিত ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ এবং দখল-দূষণের কারণে এসব নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে গেছে।

অনেক ক্ষেত্রে নিচু কালভার্ট নির্মাণের ফলে নৌপথ বন্ধ হয়ে পলি জমে খাল ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে এক সময়কার নৌনির্ভর যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

বর্তমানে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীসহ আশপাশের বেশির ভাগ নদীই দখল ও দূষণে মারাত্মকভাবে সঙ্কুচিত। শুষ্ক মৌসুমে অনেক নদী প্রায় শুকিয়ে যায় বা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

গবেষণা অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে ঢাকার ছোট সীমানার মধ্যেই প্রায় ১২০টি পুকুর ছিল। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৪টিতে।

পুরো ঢাকা শহরে আদি ও নতুন অংশ মিলিয়ে বর্তমানে মোট পুকুরের সংখ্যা ২৪১টি। ধর্মীয় উপাসনালয়ের সাথে যুক্ত ৪৩টি জলাশয়সহ শহরে মোট ৩২৭টি জলাশয় (পুকুর, বিল ও লেক) বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

দখল ও অবকাঠামোগত ভুলের প্রভাব

একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বিআইডব্লিউটিএ নদীর সীমানা চিহ্নিত করতে হাজার হাজার পিলার স্থাপন করলেও এর বড় অংশই নদীর ভেতরে বসানো হয়েছে, যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহকে আরো সঙ্কুচিত করেছে।

এ ধরনের অবকাঠামোগত ভুল নদী রক্ষার পরিবর্তে উল্টো দখলদারদের সুবিধা করে দিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন।

গবেষকদের মতে, নদী ও খালভিত্তিক সাশ্রয়ী নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সড়ক ও রেলপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। এতে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয় তৈরি হচ্ছে, যা সরাসরি অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের গবেষক শুভাশিষ দাস শুভ বলেন, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার না হলে অভ্যন্তরীণ নৌপথ কার্যত অচল হয়ে পড়বে। তার মতে, শুধুমাত্র গুলশান-বনানী খাল পুনরুদ্ধার করলেই বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতি রোধ করা সম্ভব।

সম্ভাব্য সমাধান

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার অস্তিত্ব থাকা প্রায় ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধার করা গেলে রাজধানীর প্রায় ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধান সম্ভব। একই সাথে নৌপথ পুনরুজ্জীবিত হলে পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে ঢাকায় খালের সংখ্যা ৫৮টি। এর মধ্যে অন্তত ২৬টি এখনো সচল করা সম্ভব বলে মনে করছে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস)। তারা এই ২৬ খালকে ঢাকার চার নদীর সাথে যুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে এর জন্য খালগুলোকে দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে।

উপসংহার

ঢাকা শহরের নদী-খাল ও জলাশয় রক্ষা এখন শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক ও নগর ব্যবস্থাপনারও জরুরি বিষয়। পরিকল্পিত পুনরুদ্ধার ছাড়া রাজধানীর জলাবদ্ধতা ও পরিবহন সঙ্কট দীর্ঘমেয়াদে আরো জটিল আকার ধারণ করবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews