বিশ্বের মুসলমানরা এক আল্লাহর বান্দা ও রসুলের উম্মত হওয়া সত্ত্বেও অনৈক্য ও রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং মুফতিদের ঐকমত্যের পার্থক্যের কারণে একই দিনে রোজা ও ঈদ পালন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোজা শুরু ও ঈদ উদ্যাপিত হয় এক বা দুই দিনের ব্যবধানে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর রজ্জু মজবুত করে আঁকড়ে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না’ (সুরা আলে ইমরান-১০৩)। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনে ভিন্নতা অনৈক্য সৃষ্টি হচ্ছে। মুসলমানরা বিশ্বব্যাপী জুমার নামাজ শুক্রবার আদায় করে থাকেন। কোথাও এক দিন আগে বা এক দিন পরে জুমার নামাজ আদায় করা যেরূপ সঠিক হবে না, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এক/দুই দিন বিলম্বে রোজা কিংবা ঈদ পালন কি যুক্তিসংগত হবে? রসুল (সা.)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত যে, কিয়ামত ১০ মহররম শুক্রবার হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যদি শুক্রবার ১০ মহররম হয়, বাংলাদেশে সেদিন ৯ মহররম শুক্রবার। তাহলে বাংলাদেশ ও সৌদি আরবে ভিন্ন ভিন্ন দিনে কি কিয়ামত হবে? বাংলাদেশ থেকে কেউ রমজান মাসের যেকোনো দিন মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে ঈদ করলে তার রোজা হয় ২৮ বা ২৯টি। আবার মধ্যপ্রাচ্য থেকে কেউ রমজান মাসের যেকোনো দিন বাংলাদেশে এসে ঈদ করলে তার রোজা ৩০ বা ৩১টি হয়। ২৮ ও ৩১টি রোজা রাখার বিধান কি ইসলামে আছে? নামাজের ওয়াক্ত এবং সাহরি ও ইফতার হয় সূর্য অনুযায়ী, কিন্তু যে কোনো আরবি মাস শুরু হয় চাঁদ অনুযায়ী। সূর্য ও চাঁদের হিসাব আলাদা। আরবি মাস চাঁদের হিসাব অনুসারে হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনি ভোরের উন্মেষ ঘটান, তিনিই সৃষ্টি করেছেন বিশ্রামের জন্য রাত এবং গণনার জন্য সূর্য ও চন্দ্র। এ সবই পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নির্ধারণ’ (সুরা আনআম-৯৬)। চন্দ্র ও সূর্য আপন আপন কক্ষপথে বিচরণ করায় আরবি চান্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ দিনে, পক্ষান্তরে সূর্যবর্ষ ৩৬৫ দিনে পরিপূর্ণ হয়। সারা বিশ্বে সূর্যবর্ষ হিসেবে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখ একই রকম। কখনো ভিন্ন রকম হয় না। তাই পৃথিবীতে চাঁদের তারিখ একটি হওয়াই যুক্তিযুক্ত। বর্তমানে প্রচলিত জুলিয়ান বা খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি সূর্যভিত্তিক সময় গণনা পদ্ধতির একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ। হজরত ঈসা (আ.)-এর শুভ জন্মদিন ২৫ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী একই দিনে উদ্যাপিত হয়, কোথাও ২/১ দিনের তারতম্য হয় না। অনুরূপভাবে গণনাভিক্তিক চান্দ্রপঞ্জিকা অনুসরণের মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মানুষ্ঠান বিশ্বব্যাপী একই দিনে উদ্যাপন করা সম্ভব। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিদ্যমান স্থানীয় সময়ের পার্থক্যের জন্য যেমন জুমার নামাজের ওয়াক্তের তারতম্য হয়, কিন্তু বারের ক্ষেত্রে কোনো তারতম্য হয় না। চার মাজহাবের সমন্বিত ফিকহ ‘গ্রন্থ আল ফিকহ আলা মাজাহিবিল আরবায়া’ নামক গ্রন্থের প্রথম খণ্ড, ৪৪৩ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে, পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে চাঁদ দেখা প্রমাণিত হলে সব স্থানেই ওই দেখার দ্বারা রোজা ফরজ হবে। তাই চাঁদ নিকটবর্তী দেশে দেখা যাক বা দূরবর্তী দেশে দেখা যাক, এতে কোনো পার্থক্য নেই। তবে চাঁদ দেখার সংবাদ গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে অন্যদের নিকট পৌঁছতে হবে। তিন ইমাম তথা ইমাম আবু হানিফা (রহ.), ইমাম মালেক (রহ.) এবং ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ.)-এর মতে, চাঁদের উদয়স্থলের ভিন্নতা গ্রহণীয় নয়। অর্থাৎ প্রথম দিনের দেখার দ্বারাই সর্বত্র আমল ফরজ হয়ে যাবে। ‘ফাতওয়ায়ে-ই আলমগিরি’ প্রথম খণ্ড ৪২৫ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘(পৃথিবীর) পশ্চিম এলাকার লোকজনের চাঁদ দেখার পূর্ব এলাকার (পূর্ব প্রান্তের) লোকের ওপর রোজা রাখা ওয়াজিব।’ তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের ধর্ম মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১৯৭৮ সালের নভেম্বর মাসের ২৭-৩০ তারিখ পর্যন্ত ইসলামি ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রাচীন রাজধানী ইস্তাম্বুলে ‘চান্দ্রমাসের প্রারম্ভ ও পবিত্র দিনগুলো নির্ণয়’ ((Conference for Determing the beginning of lunar Months and Holidays) সম্বন্ধীয় এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুসলিম বিভিন্ন দেশের ৩৯ জন প্রতিনিধি একই দিনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের গুরুত্বের ওপর আলোচনা করেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসার পূর্বে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা চিন্তা করে দেখতে পারি, বাংলাদেশের মানুষ সারা বিশ্বের মানুষের সঙ্গে একই দিনে আমরা একসঙ্গে রোজা এবং ঈদ পালন করতে পারি কি না। আমার কাছে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খেয়েছে, আমরা দেখেছি খ্রিস্টান সম্প্রদায় সারা বিশ্বে তাদের বড়দিন একই দিনে পালন করে। আমি ওলামায়ে কেরামগণকে অনুরোধ করব, তাঁরা এ বিষয়ে চিন্তা করে দেখতে পারেন কি না।’ পরিশেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আমার আহ্বান থাকবে- সারা বিশ্বে একই দিনে ঈদ উদ্যাপনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারেন।
লেখক : গবেষক, কদর রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা